পরদিনটা ছুটি।
.
দীপ্তিময় তার সাত বছরের মেয়ে বুবুন আর ছয় বছরের ছেলে পিন্টুকে নিয়ে সকাল থেকেই বাগানের কাজে লাগল। প্রায় দশ কাঠা জমি নিয়ে বাড়ির ঘের। সবটাই পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। পাঁচিলের ধার ঘেঁষে ঋজু ঋজু নারিকেল আর সুপুরির চারা, চারটে আম, দুটো কাঁঠাল, একটা নিম দুটো পেয়ারার গাছ। তা ছাড়াও ছুটকো গাছ অনেক, আর আছে সুন্দর সবজির খেত। শীতকাল বলে মুলো, পালং, মটরশাক, কপি আর লাউয়ের মাচার চারপাশে উজ্জ্বল সবুজ আলো হয়ে আছে। এসব দেখাশোনা করার জন্য দুজন লোক আছে। তারা দীপ্তিময়ের বাগান দেখে, দুটো গরুর দেখাশোনা করে, গোয়াল পরিষ্কার রাখে। দীপ্তিময়রা বাগানের সবজি খায়। বারোমাস, ঘরের গরুর দুধ খায়। এর জন্য দীপ্তিময়ের বড় তৃপ্তি।
বুবুন আর পিন্টু ইচ্ছেমতো চারাগাছ লাগাল খানিকক্ষণ, এখানে ওখানে মাটি খুঁড়ল, জল দিল, তারপর দুজনে চোর-চোর খেলতে গাছপালার মধ্যে চলে গেল কোথায়। দীপ্তিময় তার দুজন মাইনে করা লোকের সঙ্গে দেখল ঘুরে-ঘুরে। দেখল গোয়ালঘরের চালের ওপর এই শীতে লকলকিয়ে উঠেছে সতেজ লাউডগা। সবুজ পদ্মফুলের মতো পাতাগুলো উত্তুরে হাওয়ায় দোল খাচ্ছে। দীপ্তিময় দেখল বড় বেশি বাড়ন হয়েছে গাছটার, ফলন ভালো হবে না। দা হাতে দীপ্তিময় ডগা কাটবার জন্য চালের ওপর উঠল। তারপর মুগ্ধ হয়ে চেয়ে রইল তার দশ কাঠা জমিওয়ালা সুন্দর বাড়িটার দিকে। দক্ষিণমুখো বাড়ি তার, সামনের বারান্দা লোহার গ্রিল দিয়ে ঘেরা, বড় জানালাও চারখানা মাঝারি ঘর, দোতলা হবে বলে ছাদের ওপর উঁচু হয়ে আছে লোহার শিকের গুচ্ছ। একদিন দোতলা হবে যখন তার সংসারে লোক বাড়বে। অবশ্য আপাতত লোক বাড়বার সম্ভাবনা নেই, দুটো বাচ্চা আর রমা, আর বুড়ি বিধবা মা। রমা আর ছেলেমেয়ে চায় না। দোতলাটা এখনও অনিশ্চিত। বয়স যখন বাড়বে তখন ওখানে দুটো ঘর করবে দীপ্তিময়। আর থাকবে অনেকখানি খোলা জায়গা। ইজিচেয়ারে শুয়ে দীপ্তিময় অনেকদূরে চেয়ে থাকবে। দীপ্তিময় বাগানের দিকে চোখ ফেরাল। গাছগাছালিতে কেমন নিবিড় ছায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে তার বাগান, পাখিপাখালির ডাক শোনা যায়, আর পোকা ওড়ার শব্দ। নিমগাছের উঁচু ডালে চাক গড়ছে মৌমাছি। গোয়াল ঘরের চালে সতেজ লাউডগা আর পাতার মধ্যে বসে দীপ্তিময় এক রহস্যময় আনন্দকে টের পেল। বাইরের দিকে দেওয়ালের পাশ ঘেঁষেই রাস্তা। সেদিকে চোখ ফেরালে দেখা যায় লোকজন হেঁটে যাচ্ছে, মানুষজনের চোখের আড়ালে দেওয়ালঘেরা তার সুন্দর বাড়ি আর বাগান। বড় তৃপ্তি। বাইরের পৃথিবী থেকে সে আলাদা করে নিয়েছে নিজের ছোট্ট একটু আলাদা পৃথিবী। এ সবই তার। তার নিজের। ওই বাড়ি, ওই গাছগাছালি, ওই পাখি কিংবা মৌমাছি এরা সবাই তার আপন, নিজস্ব। দেওয়ালের ওপাশে মানুষেরা হেঁটে যাচ্ছে। ওরা বাইরের মানুষ, দূরের। দীপ্তিময় চেয়ে–চেয়ে দেখল অনেকক্ষণ। তারপর পিন্টু ছুটে এসে নীচে থেকে দু-হাত বাড়িয়ে চিৎকার করে বলল , ‘বাবা, আমি চালে উঠবও-ও। আমাকে তুলে নাও।’ দীপ্তিময় হেসে ডগাপাতা কেটে তার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল , ‘মায়ের কাছে রান্নাঘরে নিয়ে যাও। মাকে বলল বাবা বলেছে মুগের ডাল ছড়িয়ে রান্না করতে।’
কাঁঠাল গাছের তলায় পরিষ্কার জায়গায় একখানা চেয়ার পাতা। তার ওপর খবরের কাগজ। দীপ্তিময় বসে কাগজ খুলল। কিন্তু পড়ল না। চেয়ে রইল। বাড়িখানা আর একটু বড় হলে একটা পুকুর কাটত দীপ্তিময়, মাছ ছেড়ে দিত। আরও গোটা দুই ছেলেমেয়ে হলে বাড়িটা আরও একটু জমজমে হত। কত কিছু চিন্তা যে মাথার মধ্যে সারাদিন আসে যায়! দীপ্তিময় স্বপ্ন দেখে। কলতলার পাশে বাঁধানো গোলচত্বরে থালায় বড়ি শুকোতে দিয়ে ঘর রোদে জবুথুবু হয়ে মা বসে আছে। সাদা ঘোমটায় মুখ ঢাকা। মায়ের সঙ্গে আজকাল আর ভালো করে দেখাসাক্ষাৎ হয়ই না, কথাবার্তাও হয় খুবই কম। বয়সের সঙ্গে-সঙ্গে মার স্মৃতিভ্রংশ হয়েছে অনেক, কথাবার্তারও তাল থাকে না। মাকে দেখছিল দীপ্তিময়। সারা শরীর সাদা থানে ঢাকা। মুখ দেখা যায় না। হঠাৎ তার খেয়াল হল মাকে একবার জিগ্যেস করলে হয় ফুলকাকা নামে কাউকে মা চিনত কিনা। যদিও দীপ্তিময় জানে যে মা চিনবেন না। তার বড় দাদা মঙ্গলময় কাঁচড়াপাড়ায় থাকে, মাঝে-মাঝে এসে দেখা করে যায়, মা তাকেও প্রথমটায় ভালো চিনতে পারে না। এমন সুন্দর সাজানো বাড়ি তার, কিন্তু মা বাড়ির কোনকিছুই ভালো করে দেখে না। ভ্যাবলা চোখে চেয়ে থাকে।
বুবুন এসে চা দিয়ে গেল। দীপ্তিময় চা খেতে-খেতে ভাবল, ফুলকাকা যদি তাদের পরিবারের চেনা কেউই হবে তবে সে এসে মায়ের খোঁজ করেনি কেন? তাদের দেশের লোকেরা এটাই পুরোনো স্বভাব, সকলের খোঁজ নেওয়া, চেনাজানা আত্মীয়দের খুঁজে বের করা। লোকটা মার খোঁজ নেয়নি, নিলে রমা তাকে বলত। তার মানে খোঁজখবর সে পছন্দ করে না। রমা হয়তো ভাবে যে, সে অসম্ভব হিসেবি, লোভী কিংবা কৃপণ। কিন্তু দীপ্তিময় জানে যে, সে অদয়ালুও নয়। সে সাধ্যমতো ভিক্ষে দেয়, লোকে বিপদে–আপদে পড়লে দেখে, অনেক চেনাজানা লোক এবং ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আত্মীয়দের খোঁজখবর নেয়। কিন্তু সে কখনও ঠকে যেতে চায় না। রমাকে বাইরের জগতের সঙ্গে লড়াই করতে হয় না বলেই বোধহয় এসব সে ঠিক বোঝে না।
