‘খাওয়ালে?’ ‘খাওয়াব না কেন! চা আর বিস্কুট দিলাম।’
‘আর কিছু চাইল না?’
‘চাইল আট আনা পয়সা।
‘দিলে?’
‘দিলাম। গরিব মানুষ। বলল –রাস্তাখরচ নেই, হালতু থেকে এই উত্তরপাড়া পর্যন্ত এসেছে তোমার খোঁজ করতে। দিয়ে দিলাম আট আনা।’
দীপ্তিময় সামান্য অন্যমনস্ক থাকল, তারপর বলল , ‘সাবধানে থেকো। আমাদের চারপাশে অনেক ফুলকাকা। অচেনা লোককে হুট করে ঘরে ঢুকতে দিও না।’
রমাকে লোকটা ঠকিয়ে গেছে এমনটা রমার মনে হচ্ছিল না। সে বলল , ‘দ্যাখো লোকটা যে তোমার আত্মীয় নয় তা বোঝার কোনও উপায় ছিল না। সে তোমাদের বাড়ির অনেকের নাম জানে, চেনে। সেজভাশুরের সঙ্গে এক কলেজে পড়েছে, তখন তোমাদের ঢাকার বাড়িতেও গেছে অনেকবার। বলল তোমাকে ছোট্ট দেখেছিল। নানা কথার মধ্যে এও বলল যে তোমার কোমরে একটা ফোঁড়া অপারেশন হয়েছিল ছেলেবেলায়। সে সময়ে উনিই তোমাকে কোলে করেছিলেন, আর পুঁজে–রক্তে তার জামাকাপড় ভরে গিয়েছিল।’
ঘরে পরার পায়জামাটা কোমর পর্যন্ত টেনে দড়ি আটকাতে গিয়ে দীপ্তিময়ের হাত থেমে রইল, বলল , ‘আশ্চর্য! তবে কি আমারই ভুল হচ্ছে! ঢাকায় আমি জন্মের পর তেরো–চোদ্দো বছর কাটিয়েছি, কাজেই সব ভুলে যাওয়ার কথা নয় রমা। কিন্তু ফুলকাকা যে কে কিছুতেই মনে পড়ছে তো! সেই ফোঁড়াকাটার দাগ দ্যাখো না, এখনও কোমরে আছে।’
‘আমি তো জানি।’ রমা বলল ।
‘লোকটা ঠিকই বলেছে। অথচ আমার তো মনে পড়ছে না ওরকম কাউকে।’
রমা এবারে হাসল, ‘আমি খুব বোকাসোকা ভালোমানুষ তো নই। কাজেই যাকে তাকে বিশ্বাস করি না। এ লোকটা ঠিক জোচ্চর হতে পারে, তবে তোমাদের চেনে ঠিকই। বলে গেছে। আবার আসবে, যদি আসে তবে হয়তো সামনাসামনি দেখলে তুমি চিনতে পারবে।’
‘এসেছিল কেন?’
“ঠিক বুঝলাম না। হাবভাব দেখে মনে হল কোনও মুশকিলে পড়েছে। হয়তো তোমার কাছে। কিছু সাহায্য চাইতে পারে। আমার কাছে আট আনার বেশি চায়নি।’
দীপ্তিময় আবার ভ্রূ কোঁচকালো। সাহায্য করতে-করতে জীবন গেল। পথে ঘাটে অফিসে ঘরে সব জায়গায় কেবল হাত-পাতা মানুষ। ভালো লাগেনা!
‘তোমার আছে বলেই মানুষ চায়!’
কথাটা বলেই রমা একটু হাসল। দীপ্তিময় তার শ্যামলা মিষ্টি চেহারার বউটির দিকে তাকিয়ে
একটু কিছু বলবে বলে ঠিক করেছিল, তখনই রমা ‘তোমার চা–টা নিয়ে আসি’ বলে চলে গেল।
তখন ইজিচেয়ারে গা এলিয়ে বসল দীপ্তিময়। রোজই বসে। তারপর চা খেয়ে হাতমুখ ধোয়, তারপর আবার চা খাবার খায়। বসে দীপ্তিময় রমার কথাটাই একটু-একটু ভাবল। তোমার আছে বলেই মানুষ চায়। অর্থাৎ রমা–তার বউ লক্ষ করছে যে তার অনেক আছে। ভেবে একটু শ্বাস ছাড়ে সে। আছে যে সেটা মিথ্যে নয়। আবার খুব বলার মতোও কিছু না। যা আছে তার সবটুকু কি সে উপার্জন করেনি? হাড়ভাঙা খাটুনি, একরোখা ধৈর্য। অধ্যবসায়–এসবের মূল্যেই সে যা কিছু অর্জন করেছে তাও সেটা খুব বেশি কিছু না। তবে একথা ঠিক যে, সে একটু তাড়াতাড়ি টাকা করেছে, যেটা পারেনি তার অন্য বন্ধুরা। আত্মীয়েরাও গরিব রয়ে গেছে। অথচ মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর বয়সেই সে উত্তরপাড়ায় একটি সুন্দর বাড়ির মালিক। কলকাতার ওপরে কিছু জমি কিনল কয়েকদিন আগে রমার নামে, নতুন একটা বিমাও করেছে সে। আরও অনেক কিছু করার স্থির একটা লক্ষও আছে তার। সময়ে সব হবে সে জানে। এসব নিশ্চয়ই রমারও স্বস্তির কারণ! তবে কেন রমা লক্ষ করেছে যে তার অনেক আছে!
দীপ্তিময় সহজে রাগে না, উত্তেজিত হয় না। তার স্বভাব ঠান্ডা, সে ধৈর্যশীল। তাদের স্বামী স্ত্রীর মধ্যে ঘোর যৌবনেও মান–অভিমানের খেলা খুব কম হয়েছে। কম হয়েছে দীপ্তিময়ের জন্যই। কেননা সুখে থাকা, আর সাফল্যের ব্যাপারটা নিয়েই তার সব ভাবনাচিন্তা। অনেক সময়েই রমার সূক্ষ্ম ভাবপ্রবণতাগুলো সে এড়িয়ে গেছে। আজও এড়াতে পারত। কিন্তু ফুলকাকা পরিচয় দিয়ে যে লোকটা আজ এসেছিল, তার বর্ণনা দিতে গিয়ে রমা বড় সহৃদয় হয়ে পড়েছিল। লোকটা নির্লজ্জের মতো চেয়ে চা খেয়েছে, পয়সা নিয়ে গেছে, তবু তার প্রতি একটু রাগ নেই কেন রমার?
তাই রমা চায়ে চামচ নাড়াতে–নাড়াতে যখন ঘরে ঢুকল তখন রমার দিকে স্থির চোখে চেয়ে রইল দীপ্তিময়। রমার মুখ নির্লিপ্ত, চায়ের কাপে মনোযোগী চোখ, সংসারের নানা কাজের চিন্তায় সে অন্যমনস্ক। চা দিয়ে চলে যাওয়ার সময়ে রমাকে সে ডাকল, ‘শুনে যাও একটা কথা।’
‘কী!’ বলে রমা চৌকাঠ থেকে ফিরে তাকায়!
‘তুমি কি কমিউনিস্ট?’
একটু থতমত খেয়ে রমা হেসে ফেলল। ‘ও কি কথা! কেন গো?’
দীপ্তিময় একটু সামলে গেল, বলল , ‘না! এমনিই, তুমি কাজে যাও।’
‘আচ্ছা মানুষ! আমি কমিউনিস্ট হতে যাব কেন! ওসব কি আমি বুঝি?’
‘ঠিক কথা! বড়লোকের বউয়ের ওসব হতে নেই।’ বলে দীপ্তিময় হাসে। সরল অকপট হাসি।
রমা দরজায় দাঁড়িয়ে একটু ইতস্তত করে, তারপর হঠাৎ বলে, ‘বাড়ির মঙ্গলের জন্য মানুষকে দিতে থুতে হয়। নইলে শাপ লাগে।’
রমা একথা বলেই চলে গেল।
দীপ্তিময় জানে রমা বুদ্ধিমতী। হয়তো রমা তার প্রশ্নটার নিহিত উদ্দেশ্য আন্দাজ করে নিয়েছে। চায়ে চুমুক দেওয়ার আগে চোখের সামনে কাপটা একটুক্ষণ ধরল দীপ্তিময়, ঠিক মাঝখানে ছোট্ট এক বিন্দু ফেনাকে ঘিরে একটু ঘূর্ণি। এক কণা সর ভাসছে। অন্যমনে দীপ্তিময় চেয়ে থাকে।
