–কেন ধরাবে? ওর বাপের চিতা শা…?
বলতে-বলতে নেতাই বাবলাতলা থেকে উঠে খালের উঁচু পাড়ে দাঁড়িয়ে পেচ্ছাপ করে। আর বলে–আমার ঠাকুমার শালা পুণ্যি দেখ, চিতা নিভে যাবে ভয়ে বৃষ্টি থেমে গেছে। দেখেছিস কখনও অমনধারা শালা? বিড়ি ধরাচ্ছিস চিতা থেকে। আমার ঠাকুমার সম্মান নেই?
স্যাঙাত্রা খি–খি করে হাসছে।
নিশিকান্ত দেখে, নেতাইয়ের ঠাকুমার মুখখানা দেখা যাচ্ছে। এখনও সেখানে আগুনটা পৌঁছয়নি। চোখের পাতায় চন্দন, তাতে তুলসিপাতা সাঁটা। পোড়ার সময়টায় মানুষের কেমন লাগে তা বড় জানতে ইচ্ছে করে নিশিকান্তর। দু-কদম এগিয়ে এসে সে ছাতা আর বোতল হাতে দাঁড়িয়ে–দাঁড়িয়ে দেখে। কেউ কিছু বলে না। সব ব্যাটা বোতল টেনে যাচ্ছে। বেসামাল।
আর হঠাৎ যেন কেউ দেখছে না দেখে, ফাঁক বুঝে নেতাইয়ের ঠাকুমা টক করে চোখ চাইল। নিশিকান্তর কিছু মনে থাকে না। বড় বিস্মরণ। কিন্তু নেতাইয়ের ঠাকুমা চোখ খুলে ভালোমানুষের মতো তার দিকে তাকাতেই নিশিকান্তর ঝড়াক করে মনে পড়ে গেল, বহুকাল আগে, পেটব্যথায় বুড়ি কাতরাচ্ছিল একা ঘরে। তখন নিশিকান্ত বাবলার কচিপাতা থেঁতো করে রস খাইয়ে সারিয়ে ছিল ব্যথা। সেই বাবলা গাছের তলায় নিশিকান্ত দাঁড়িয়ে, আর চিতার আগুনের মধ্যে আধপোড়া নেতাইয়ের ঠাকুমা। চোখে চোখ পড়তেই যেন বলে ওঠে, কী বাবা মনে পড়ে?
মনে পড়ে? মনে পড়ে? বাদলা কেটে মনের মধ্যে একটা জোছনা যেন ভেসে ওঠে হঠাৎ। পড়ে বইকি! কত কী মনে পড়তে থাকে হঠাৎ। নিশিকান্ত টের পায় মনে পড়ার বেনো জল হঠাৎ বাঁধ ফাটিয়ে ধেয়ে আসে যে! নিশিকান্ত ছাতাটা সাপটে ধরে বোতল চেপে ধরে বুকে। একটা ‘আঁক’ চিৎকার পেড়ে আবার খালধারের রাস্তায় উঠে আসে।
কিন্তু তবু মনে পড়া কি ছাড়ে। আকাশ থেকে হঠাৎ টাপুর–টুপুর খসে পড়ে অতীতের জল। পড়তেই থাকে। নেতাইয়ের স্যাঙাৎ দু-পা এগিয়ে এসে তাকে ধরে–কী বাবা বোতলে? কোথায় নিয়ে যাচ্ছ বাবা নিশি!
–ছেড়ে দাও। বলে নিশিকান্ত একটা ঝটকা মারে। আর ওই ঝটকাতেই টর্চ বাতির আলোর মতো তার বর্তমানটা ছিটকে যায়। বাদলা দিনে ছোট পৃথিবীটা হঠাৎ যেন আদিগন্ত দেখা যায়। মনে পড়ে। মনে পড়ে।
তার নাম নিশিকান্ত নয়। সে নয় এদেশের লোক। নীলকুঠির ধারে একটা ছোট কুঠিবাড়ি ছিল। তাদের। মা ছিল মনোরমা, বাবা চন্দ্রনাথ। সুখের ছিল সংসার। জায়গাটা কী যেন! কী যেন! মনে পড়ে, বেঁটে লিচু গাছের বন ছিল সেখানে, থোকা থোকা ফল ধরত, পাকা সড়কের ওপর ছিল ইস্কুল বাড়ি, তার ঘণ্টা বাজত ঢং–ঢং, নিশিকান্তকে ডাকত।…মনে পড়ে, মনে পড়ে…
কিন্তু কী যে যন্ত্রণার ঝড় ওঠে বুকের মধ্যে! হাহাকার এক বাতাস বয়ে যায়। কী হয়েছিল তারপর? অতীতের বৃষ্টি মাতালের মতো টলে টলে পড়ে, দোল খায়, মারদাঙ্গা আগুন কী সব হয়েছিল, দাড়িওলা, কালি–মাখা মশাল হাতে কিছু লোক…তারা পায়খানার তলায় নোরায়। লুকিয়ে কাঁপছে! মনে পড়ে…রেল লাইন ইস্টিশান…লঙ্গরখানা…
নিশিকান্ত চিৎকার করে পিছলে পড়ে যায়। রাস্তা বেভুল। কোথায় যাচ্ছে সে? কার কাছে? জোছনায় দাঁড়িয়ে হাঁ করে চারধারে চায় নিশিকান্ত? এ সে কোথায়?
মাঠের মাঝখানে ছাতা আর বোতল হাতে সে দাঁড়িয়ে আকাশ–জোড়া পৃথিবীটা দেখে। কী প্রকাণ্ড! সে একা! হারিয়ে গেছে!
ভূতুড়ে জোছনার হাহাকার চারদিকে। তার ঘর নেই, বাড়ি নেই, কেউ নেই।
–আঁ—আঁ–আঁ বাক্যহারা চিৎকার দিতে থাকে নিশিকান্ত। চোখে জল আসে। সে উপুড় হয়ে পড়ে মাঠের কাদায় জলে। কোমর সমান ডুবে যায়। মাথা চেপে ধরে বিড়বিড় করে বলতে থাকে–ভুলিয়ে দাও, ভুলিয়ে দাও…
ঠিক সময়ে একটা সুতো কে যে গুটিয়ে নেয় লাটাইয়ে, হাত্তা মারে। টান লাগে। ঘুড়ি টাল খায়। বউমণি বুঝি ডাকে–নিশি–ই…
যাই। বলে কাদাজল থেকে ওঠে নিশিকান্ত। ছাতাটা আর বোতলটা চেপে ধরে বুকে। পিরানের হাতায় চোখ মুছে নেয়। ঘুড়ির সুতো গুটিয়ে নিচ্ছে বউমণি। বড় টান। চাকর বলো চাকর, জন বলোজন, টান একটা আছেই।
বেশ আছি বাবা, বেশ আছি। বিড়বিড় করে বলে নিশিকান্ত। পৃথিবীটা আবার বাদলা দিনের মতো ছোট হয়ে এসেছে। টর্চ বাতির আলোর চৌহদ্দিতে বাঁধা জীবন। আগুপিছু আর কিছুই দেখা যায় না। এই বেশ আছে নিশিকান্ত। এবার নিশ্চিন্তে সে হাঁটে।
ভাগের অংশ
ছাইদানিতে একটা বিড়ির টুকরো দেখে দীপ্তিময় তার বউ রমাকে ডেকে জিগ্যেস করল–‘কে এসেছিল বলো তো! বিড়ি খায় এমন লোক কে!’
রমা বলল , ‘তোমার ফুলকাকা। তুমি অফিসে যাওয়ার একটু পরেই এসেছিল, বলে গেছে আবার আসবে কয়েকদিন পর।’
‘ফুলকাকা!’ ভ্রূ কুঁচকে ফুলপ্যান্টের বোতাম খুলতে–খুলতে দীপ্তিময় বলল , ‘কই, ফুলকাকা বলে কেউ ছিল এমন তো মনে পড়ছে না! কেমন লোক?
রমা একটু মুশকিলে পড়ল, ইতস্তত করে বলে, ‘বলল তো আমি দীপুর ফুলকাকা’ তোমার ওরকম কাউকে মনে পড়ছে না?’
মাথা নাড়ে দীপ্তিময়, ‘ফুলকাকা বলে কেউ ছিলই না। লোকটাকে কেমন দেখলে?’
‘রোগা, বুড়ো, গরিব। মনে রাখার মতো চেহারা নয়, রাস্তার ভিড়ে আবার দেখলে চিনতেই পারব না।’
‘আশ্চর্য! কিছু নিয়ে টিয়ে যায়নি তো! লোকটা চলে যাওয়ার পর ঘরটর ভালো করে দেখেছ?’
রমা বলে, ‘বাইরের ঘরে নিয়ে যাওয়ার মতো জিনিস আর কিই বা আছে! মিনিট কুড়ি ছিল মাত্র, তাও ওই ঘরেই। বলল বউমা চা খাওয়াও।’
