নিশিকান্ত ক্ষেপে গিয়ে বলে–দিয়ে দাও বলছি।
গুপে বলে–তোমার ছাতারও স্বভাবের বলিহারি। কোন আক্কেলে তোমার মতো ভালো মানুষটাকে ছেড়ে না বলে কয়ে চলে গেল!
ভারী রেগে যায় নিশিকান্ত। ডাক হাঁক করে গাল পাড়ে তোমরা দুটো চোরের ব্যাটা, গর্ভস্রাব…
গুপে গম্ভীর মুখে বলে–তা মুখ খারাপ করলে কী হবে! লোকে যে বলে তুমি ছাতা চোর। আমি অতশত জানি না বটে, কিন্তু শুনেছি ওই ছাতা মেয়েছেলেটাকে তুমি মায়াচরের কোনও গেরস্তর ঘর থেকে ভাগিয়ে এনেছ!
নিশিকান্তর মাথার মধ্যেটা ভারী বেসামাল হয়ে যায়, বলে, কোন রাঁড়ির ব্যাটা বলে, কোন…ইত্যাদি।
মহেন্দ্র বিরক্ত হয়ে বলে–মুখ খারাপ করবে না বলছি। দিয়ে দে গুপে ওর ছাতাখানা। খিস্তির চোটে জল গরম করে দিল।
রেগে গেলে নিশিকান্ত এরকম। হাট মাঠ ঘুরে যা গাল শোনে তার কিছু মনে রাখে সে। কারণ, ওই হচ্ছে তার অস্ত্রশস্ত্র। লোকে তাকে দিক করলে তাকেও তো কিছু করতে হয় তখন!
গুপে উঠে চৌকির তলা থেকে ছাতা বের করে দিল। তারপর আচমকা পিছনে একটা লাথি দিয়ে বলল –বেরো শালা!
লাথিটা খেয়ে দরজাটা ধরে সামলে নেয় নিশিকান্ত।
–এ-ই-ই…বলে মহেন্দ্র চেঁচিয়ে ওঠে–মারিস না। আর একটু হলে বোতলটা হাত থেকে পড়ে ভাঙত।
–শালার বড় মুখ। গুপে বলে রেগে।
নিশিকান্ত তখন গুপের মা বাবা তুলে নোংরা খিস্তি দিয়ে বেরিয়ে আসে। গুপে অবশ্য ছাড়ে না। দৌড়ে এসে ঠাঁই করে মাথায় একটা কী দিয়ে মারে। ঝিমঝিম করে ওঠে নিশিকান্তর মাথা। সে বোতলটা অবশ্য চেপে রাখে বুকে। ভাঙলে বউমণি আর বিপিন তো আর গুপের সঙ্গে বো ঝাঁপড়া করতে আসবে না। মেরে তারই গা–গতর ব্যথা করে দেবে। নিশিকান্ত রাগে অন্ধকার হয়ে বৃষ্টির মধ্যে ঠায় দাঁড়িয়ে চেঁচায়–গু খা, গু খা রাঁড়ির ছেলে…
গুপে আবার বেরিয়ে আসে। দূর থেকে একটা মাটির ভাঁড়ই বুঝি ছুঁড়ে মারে তাকে।
নিশিকান্তর বুকে এসে লাগে সেটা। নিশিকান্ত দাঁড়িয়ে–দাঁড়িয়ে গাল দিতেই থাকে আমার পা খা, বাঁ-হাত খাঁ, হেগো খা….
অনেকক্ষণ ধরে বকে–বকে নিশিকান্তর মাথা ফরসা হয়ে গেল। আসলে কাকে বকছে সেটাই ভুলে গেল সে। কী হয়েছিল তাও মনে পড়ে না আর। তখন নিশিকান্ত ভারী অবাক হয়ে চুপ করে যায়। কার ওপর রেগে গিয়েছিল, কেন গাল দিচ্ছিল কিছুই তেমন মনে পড়ে না।
এদিকে বৃষ্টি থেমে চাঁদ উঠে গেছে কখন। দোকানে দোকানে ঝাঁপ পড়ে যাচ্ছে। অবাক নিশিকান্তর ভিতরে একটা সুতোর টান লাগে। লাটাই বউমণির হাতে। নিশিকান্ত ঘুড়ি তাই চমকে ওঠে, লাট খায়। বউমণি নিশ্চয়ই ডাকছে–নিশি-ই!
খাডুবেড়ের মোড়ে যখন নামল নিশিকান্ত তখন পৃথিবীটা বড্ড অদ্ভুত হয়ে আছে। কী এক ভুতুড়ে চাঁদ উঠেছে আজ আকাশে। চারধারে মেঘের কালি তার মাঝখানে ফ্যাকাসে একটা ডুম। বারবার মেঘ ডাকছে পাথর ঘষা শব্দে। তিনদিন বাদে বৃষ্টি এই ধরল। জাড়ের মাস নয়, তবু কেমন শীত ঝরিয়ে দিচ্ছে আকাশঠাকুর। জলে জলময় পৃথিবীটা সাদাটে হয়ে পড়ে আছে অলক্ষুণে জোছনায়।
যেমন ভয় ভূত প্রেত বেহ্মদৈত্যকে, তেমনি ভয় বিপিনবিহারী আর বউমণিকে। খালধারে পিছল মাটি ধরে প্রাণপণে হাঁটে নিশিকান্ত। মাথায় একটা টাটানো ব্যথা! মাজায় ব্যথা। কখন কোথায় লাগল ঠিক খেয়াল করতে পারে না সে।
তিনদিন ধরে লক্ষ হাত দিয়ে মাটিকে মেখেছে আকাশ। মাখাজোখা হয়ে তাই ভুতুড়ে জোছনায় সিটোনো পৃথিবীটা পড়ে আছে। মেখেছিল বিপিনবিহারীও বউমণিকে। বর্ষা বাদলায় কাজকর্মে বড় সংক্ষেপ। হাঁড়িকুড়ি ছাড়া আর কিছু সকড়ি করেনি বউমণি। কলাপাতা কেটে হড়হড়ে খিচুড়ি ঢেলে খাওয়া। ঘাটলার কাজ ছিল না, কাঁচাকুচি ছিল না, রোদে দেওয়া জিনিস টানাটানি করা ছিল না। ঘরমোছা ছিল না। বউমণি তেপহর বিছানায় পড়ে থাকত। বিপিন মাঠে একটু চাষের কাজ দেখে এসেই দরজায় হুড়কো তুলে দিত। ভিতরে কী হত তা কি আর বোঝে নিশিকান্ত। সেও ওই মাখামাখিরই ব্যাপার। বিকেলে আমতেল দিয়ে মাখা মুড়ি কাঁচালঙ্কা কামড়ে খেয়ে বিপিন যেত বাজানিদের বাড়িতে, ধর্মকথা শুনতে।
কিন্তু ধর্মকথার আগেও কথা থাকে পরেও কথা থাকে। বৃষ্টি বাদলায় সেইসব কথাই কলঙ্কের কথার মতো ছড়িয়ে গেল। চারধার ফিসফাস গুজগুজ। নিশিকান্ত একা-একা হাসে।
খালধারে একটা আগুন জ্বলছে বিশাল। আগুনের ধারে কালো-কালো লোকজন। বাবলাগাছের আড়ালে বড়-বড় সব ছায়া নড়াচড়া করছে! নিশিকান্ত থমকে দাঁড়িয়ে যায়। দূর থেকে কাণ্ডটা দেখে আর তখন একটা পোড়াঘিয়ের বদ গন্ধ উড়ে আসে। আর আসে চামড়া পোড়া চিমসে মতো গন্ধ।
নিশিকান্ত মাথা নেড়ে আবার হাঁটে। নেতাইয়ের ঠাকুমাটা মরল বোধহয়। জোর কদমে হেঁটে চলে আসে আগুনটার কাছে। বাঁধা শ্মশান বলতে কিছু নেই এখানে, যে যেখানে পারে মড়া পোড়ায়। বাবলাতলায় একটু উঁচু জমি পেয়ে ওরা ওখানেই কাজ সেরে নিচ্ছে।
নেতাই মাল খেয়ে চেল্লাচ্ছিল। স্যাঙাৎদের মধ্যে কে যেন চিতা থেকে চ্যালাকাঠ টেনে বিড়ি ধরিয়েছে, তাতে অপমান হয়েছে নেতাইয়ের। চোঁচিয়ে বলে–কোনও শালা চিতা থেকে বিড়ি ধরাবে না বলে দিচ্ছি। আমার ঠাকুরমার চিতা শালা, কারও বাপের নয় বলে দিচ্ছি।
স্যাঙাৎদের একজন সান্ত্বনা দিয়ে বলে–বিড়ি নয় রে, সিগারেট…
