ভীম পুজোর মণ্ডপ থেকে পুরোপাক্কা তিন ক্রোশটাক হটিয়ে তাকে নিয়ে গিয়েছিল মেয়ে দেখাবে বলে। আর ততক্ষণে নিশিকান্তর চুরি করে জমানো পয়সা ফাঁক করেছিল বিস্তর। বিয়ের আশায় নিশিকান্ত ‘না’ করেনি। লোকটা ফুলুরির দোকানে দাঁড়িয়ে যায়, সিগারেট কেনে, দু-চারটে বাজারহাট সারে, নিশিকান্ত সঙ্গে-সঙ্গে ঘুরে হয়রান। তার ওপর ধার বলে পয়সা নিয়ে–নিয়ে নিশিকান্তের ট্যাঁক ফাঁক করেছিল লোকটা। একটা অচিন গাঁয়ে নিয়ে গিয়ে একটা কোটাবাড়ির সামনে দাঁড় করিয়ে বলল –এই হচ্ছে আমার বাড়ি। নিজের বাড়ি বলে মনে করে নাও। যাও ওই বাইরের ঘরে গিয়ে বোসো, আমি আটু বাজার ঘুরে সেরটাক মাংস নিয়ে আসি, মস্ত একটা খাসি কেটেছে শুনলাম। খাসির তেলের বড়া খাও তো?
খুব খায় নিশিকান্ত। তাই ঘাড় নেড়েছিল। তখন বেশ দুপুর হয়ে গেছে। লোকটা বলে–আজ এবেলা থেকেই যেতে হবে তোমাকে, ওবেলা মেয়ে দেখিয়ে দেব, তারপর পাকা কথা বলে যেও।
নিশিকান্ত খুব রাজি। লোকটা চলে যেতে সে দিব্যি কোঠাবাড়ির বাইরের ঘরে গিয়ে বসল। চেয়ার–টেয়ার পাতা ভালো বন্দোবস্ত। বসে থাকতে কিছু বাদে সেখানে এক খিটকেলে বুড়ো এসে হাজির। কি চাই, কাকে চাই প্রশ্নে বিরক্ত করে তুলল। খ্যাঁচাকল আর বলে কাকে। জোচ্চোরটার নামও মনে রাখেনি নিশিকান্ত, কেবল বলে–এ বাড়ির কর্তাই আমাকে বসতে বলে গেছে গো! বুড়োটা খ্যাঁকশিয়ালের মতো হুয়া-হুয়া শব্দ করে বলে বাড়ির কর্তা তো আমি, নিত্যহরি গোঁসাই। নিশিকান্ত তখন গম্ভীর হয়ে বলে–তাহলে তোমার ছেলেই হবে, আমাকে বসিয়ে রেখে বাজারে গেল মাংস আনতে, খাসির তেলের বড়াও খাওয়াবে বলেছে দুপুরে। বুড়ো তখন তেড়ে মারতে আসে-বৈষ্ণবের বাড়িতে খাসির মাংস! বেরোও, বেরিয়ে যাও।
কোথায় একটা ধন্ধ থেকে গিয়েছিল, তাই সবটা না বুঝেই বেরিয়ে এসেছিল নিশিকান্ত। কোঠাবাড়ির বারান্দায় ছাতাখানা দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড় করানো। কার ছাতা, কোথা থেকে এসেছে এতসব জানার দরকার মনে হয়নি তার। হাতটানের স্বভাবের দরুন অভ্যাসমতোই নিশিকান্ত ছাতা বগলে করে বেরিয়ে এসেছিল।
জগৎসংসারে এই ছাতাখানার বাবুগিরি ছাড়া তার আর বেশি কিছু নেই। যক্ষীর মতো সে ছাতা আগলে থাকে। রোদে জলে খোলবার জন্য নয়, কেবলমাত্র বাবুগিরিরই জন্যই বয়ে বেড়ায়। ছাতার ইজ্জতই আলাদা।
–শুনতে পাই, তোমার ছাতার সঙ্গে নাকি তোমার কথাবার্তা হয় নিশি! মহেন্দ্র একখানা পায়জামার পা টানা সেলাই করতে-করতে বলে।
নিশিকান্ত লজ্জা পেয়ে যায়। মুখে বলে–দূর, বিপিনদার যতো বানানো কথা।
–না গো, বানানো হবে কেন। বিপিন নিজে কানে শুনেছে, নিশুতরাতে উঠে বসে তুমি নাকি ছাতাকে তোমার দুঃখের কথা বলো, আর নাকি ছাতাও তোমার কথার সব জাবাব–টবাব দেয়! ছাতার গলার স্বর নাকি একটু খোনা-খোনা, কিন্তু কথা ভারি পরিষ্কার!
গুপে ছুঁচ হাতে চেপে কলারটা পাট করতে-করতে বলে–হ্যাঁগো, নিশিদা, তোমার ছাতাটা মেয়ে না ছেলে!
–আমি ওসব জানি না বাবু। তোমরা বড় দিক করো। জিনিসটা দিয়ে দাও চলে যাই।
–কথাটা চেপে যাচ্ছ নিশিদা, কিন্তু সেই পলতাবেড়ে থেকে বাগনান তক সবাই জানে যে তোমার ছাতাটা মেয়েছেলে।
–যাঃ।
–মাইরি। গুহ্য কথা আমাদের না হয় না বললে, কিন্তু ভাব ভালোবাসার কথা হচ্ছে আতর এসেন্সের মতো, চেপে রাখা যায় না। ছড়াবেই।
মহেন্দ্র পায়জামার পাখানা সরিয়ে রেখে আর একখানা পায়ের পট্টি মারতে লাগে, বলে–কথা আরও আছে। শুনি ওই ছাতাখানার সঙ্গেই তোমার বিয়ে হবে।
–যদি হয় তো নেমন্তন্নটা কোরো বাপু। বলে গুপে।
নিশিকান্ত তেতে উঠে বলে–পেছুতে লাগবে তো চ লোম বলছি। গিয়ে বিপিনদাকেই পাঠিয়ে দেবখন।
মহেন্দ্র গুপেকে একটা ধমক দেয়–তোর যত ইয়ার্কি কথা। বসো নিশি, রাগ করো না।
নিশিকান্ত বসে। দেরি হচ্ছে। একটা হাই তোলে সে। মহেন্দ্রর কলখানা দেখতে তার বড় ভালো লাগে। কলকবজা এক আশ্চর্য জিনিস। কোথাও কিছু না, পায়ের নীচে একখানা পাটা নড়ছে আর ওপর খাপে চুঁচখানা বৃষ্টির ফোঁটার মতো কপাকপ নেমে এসে সেলাই ফেলে যাচ্ছে।
বড় আশ্চর্য কাণ্ডকারখানা! কলখানা যতবার দেখে ততবারই তার ভিতর একটা কী যেন মনে পড়ি–পড়ি করে। পড়ে না অবিশ্যি। ওটাই তো তার রোগ। বড় বিস্মরণ। তার মনখানা বাদলা দিনের মতো, টর্চ বাতির আলোর মতো। কতকটা দেখা যায়, বাদবাকি সব বিস্মরণের বাদলায়, কালিঢালা অন্ধকারে ঢাকা।
বসে থাকতে–থাকতে ঢুলুনি এসে গিয়েছিল তার। গুপে ডেকে তোলে তাকে। চুয়ার বোতলটা হাতে দিয়ে বলে–দিনক্ষণ দেখে বিয়েটা সেরে ফ্যালো বাপু। আইবুড়ো মেয়েছেলে নিয়ে রাত বিরোতে বসে থাকো, এ ভালো কথায়। ছাতারও তো সমাজ অছে।
বোতল নিয়ে নিশিকান্ত উঠে পড়ে। দরজার কোণে ছাতাটার জন্যে হাত বাড়িয়ে দেখে, নেই।
–ইকী! নিশিকান্ত বলে ওঠে।
মহেন্দ্র গম্ভীর মুখ তুলে বলে–কী হল!
–ছাতাখানা!
–নেই?
–না। তোমরা লুকিয়েছ।
–আমরা! গুপে হাঁ করে চেয়ে থেকে বলে–পরের মেয়েছেলে লুকোব আমাদের তেমন ভাব নাকি!
–ছাতাটা কী হল রে গুপে? মহেন্দ্র নিরীহ মুখে জিগ্যেস করে।
–হবে আর কী! একটু আগে কতগুলো লোধা মেয়েছেলে বৃষ্টির মধ্যে হুড়মুড়িয়ে এসে উঠেছিল। এ ঠিক তাদের কাজ। নিশিদা চুলছিল তখন খেয়াল করেনি।
