আর কী খাবে?
–কিছু না…কিছু না…
–আচ্ছা সে আমি বুঝব। কলকাতার তোক না খেয়ে-খেয়ে পেটে চড়া পড়ে গেছে। এখানে ‘কিছুনা’ চলে না।
স্পষ্টই বোঝা যায় অনিন্দ্য তার বাবার চেয়ে মায়েরই বেশি ভক্ত। অনিন্দ্য যখন তার মায়ের দিকে তাকায় তখন তার নিজের মুখ শিশুর মতো হয়ে যায়। ওর মা চলে গেলে ঘরে একটু নিস্তব্ধতা রইল। তখন শোনা যাচ্ছিল অজস্র পাখির কিচমিচ, খড়মের শব্দ, হুঁকো টানার শব্দ, গরুর হাম্বা। কলকাতায় ঠিক ওইরকম শব্দ হামেশা শোনা যায় না। আশুতোষ সিগারেট ধরাতে খস করে দেশলাই জ্বালল, জ্বেলেই বলল –অনিন্দ্য, সিনিয়াররা কেউ এসে পড়বে না তো রে! দরজাটা ভেজিয়ে দেব।
দূর! খা না। আমিও তো মার সামনেই খাই। বাবা বড় একটা আমার ঘরে আসে না। বলে হাসল বুড়ো আমাকে খুব সমীহ করে চলে। বোধহয় ছেলেকে খুব লায়েক ভাবে।
সমীর বলল –মাসিমাকে বলে দে যে আমরা রাতে সত্যিই খাব না। আমাকে তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে।
অনিন্দ্য চোখ ছোট করে বলল –টগর রানীর হুকুম নয় তো!
–নারে। ছোট ভাইটার টাইফয়েড।
অনিন্দ্য কনুইয়ে ভর দিয়ে টপ করে সোজা হয়ে বসল, বলল আর, আমার যে টি বি!
আমরা সত্যিই জানতাম না। শুনে ভয়ঙ্কর চমকে গেলাম। টি বি! পর মুহূর্তে মনে পড়ল আজকাল ওষুধ আছে। টি বি এখন আর তেমন কিছু অসুখ নয়। তবু কোথাও একটু সংস্কার রয়ে গেছে। চমকে উঠি! ওর বিছানাতেই আমি বসেছিলাম। কেমন যেন অস্বস্তি লাগতে লাগল। আশ্চর্য! ও কিংবা ওর বাবা মা কেউই ওর বিছানায় বসতে আমাদের নিষেধ করেনি। অথচ করা উচিত ছিল। এখন স্বেচ্ছায় ওর বিছানা ছেড়ে অন্যত্র বসাটাও কেমন খারাপ দেখায়। তাই অস্বস্তি নিয়েই বসে রইলাম।
অনিন্দ্য হাসল–দুর! দুম করে বলে দিলাম। ইচ্ছে ছিল অনেকক্ষণ তা দিয়ে দিয়ে জমজমাটি একটা নাটুকে সিচুয়েশন তৈরি করে তারপর রক্তাক্ত সংলাপের মতো করে কথাটা বলব। হল না। দুর!
সবাই হাসলাম। আশুতোষ বলল –এটা কবে ধরা পড়ল?
অনিন্দ্য বলল –দিন দশেক আগে, যেদিন রিপোর্ট পেলাম সেদিন থেকেই আর অফিসে যাই না।
সুভাষ বলল –চিকিৎসা কেমন চলছে?
–ওই যেমন চলে। ঘড়ি বেঁধে খাওয়া। সকাল বিকেল হাঁটা। গুচ্ছের ফলমূল গিলতে হচ্ছে। ঠাকুর দেবতা প্রণাম করতে হচ্ছে। সকালে এসে পুরুত ঠাকুর কপালে মঙ্গল টিপনা ঘোড়ার ডিম কী পরিয়ে যান। মাইরি অসুখ–বিসুখ হলে আর ব্যক্তি স্বাধীনতা বলে কিছু থাকে না।
সুভাষ বলল –এ রোগ তো আজকাল জলভাত। আমার বোনের দেওর ভুগে উঠল কিছুদিন। আগে তোর মতোই রোগা পটকা ছিল, বিয়ে হত না চেহারার জন্য। এখন তাগড়া চেহারা হয়েছে…মন–মেজাজ ভালো হয়েছে, শিগগিরই বিয়ে হয়ে যাবে।
আশুতোষ বলল –দেখিস, দু-দশ বছরের মধ্যে ক্যানসারেরও ওষুধ বেরিয়ে যাবে। সায়েন্স সব পারে। তুই তো অনেকটা সেরেই গেছিস অনিন্দ্য, তোর চোখে–মুখে রোগের খুব একটা ছাপ নেই।
দূর শালা! অনিন্দ্য হাসে-আমি সুস্থ থাকলেও লোকে রোগের ছাপ দেখে আমার মুখে, আর এখন তো সত্যিকারের রোগ আমার। গ্যাস দিস না। আমি খুব রোগা হয়ে গেছি, না রে রমেন?
মাথা নাড়লাম–খুব না। তারপর তো একটু খুঁতখুঁতে আছিস, একে রোগা তার চেয়ে বেশিই রোগা ভাবিস নিজেকে। কাজেই তোকে বলে লাভ নেই।
অনিন্দ্য হাসে-ঠিক। আমি শালা নিজেকে নিয়ে খুব ভাবি। সারাদিনই ভাবি। নারসিসাস যাকে বলে। বোধহয় সেইজন্যই ভোগানি আমাকে ছাড়ে না। সারা বছর বারোমাস কোলের পোষা বেড়ালের মতো আমার অসুখ লেগে আছে। একটু গলা ব্যথা করলেই ভাবি ক্যানসার, পেট ব্যথা করলেই মনে ভাবি আলসার, খুক খুক কেশেই ভয় হয় টি বি হল না তো! দ্যাখ শেষকালে সেই টি বি তো হলই। নিজেকে নিয়ে ভাবতে নেই, কী বলিস।
হাসলাম–নিজেকে নিয়ে আমরা সবাই ভাবি।
–কেন ভাবিস?
বোধহয় নিজেকে ভালোবাসি বলে।
অনিন্দ্য চোখ বন্ধ করে ভ্রূ কুঁচকে বলে নিজেকে ভালোবেসে কী হয়! দ্যাখ আমিও অনিন্দ্য চাটুজ্জেকে ভালোবাসি। কিন্তু ভেবে দেখলে সে শালা ভালোবাসার উপযুক্তই নয়। স্বার্থপর, রগচটা, দাম্ভিক, অস্থিরচিত্ত–দূর, এ শালাকে ভালোবেসে হবে কী! ঠিক আমার মতোই যদি আর একটা লোকের সঙ্গে আমার দেখা হত, তবে দু-কথাতেই ঝগড়া লাগত, মারামারি হয়ে। যেত, মুখ দেখাদেখি বন্ধ করে দিতুম। তবে কেন নিজেকে ভালোবাসি!
–নিজেকে ভালোবেসে তোর এ অসুখ হয়নি। ভালো না বেসে হয়েছে। মাসিমা যে বলে গেল তুই খেতে চাস না। খালি পেটে চা খাস, অনিয়ম করিস–এগুলো নিজেকে ভালোবাসার লক্ষণ নয়।
–নীতিকথা বলছিস! বলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে অনিন্দ্য–আসলে কীভাবে যে ভালো থাকি তো জানিই না।
অনিন্দ্যর মা এসে বললেন–রুগির ঘরে খেতে নেই। বারান্দায় তোমাদের জলখাবার দেওয়া হয়েছে। এসো।
গিয়ে দেখি বারান্দায় পিঁড়ি পাতা, জামবাটিতে দুধ, বেতের ধামায় মুড়ি, প্লেটে কাটা আম, কলা আর কাঁঠালের কোয়া। অনিন্দ্য ঘর থেকে চেঁচিয়ে বলল –আমাকে একটা চেয়ার দাও। আমি ওদের খাওয়া দেখব।
সমীর আর একবার বলতে চেষ্টা করল–আমাকে কিন্তু তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে মাসিমা। আমার ভাইয়ের অসুখ, ওরা বরং একটু থাকুক, আমি ফিরে যাই।
–কী অসুখ?
–টাইফয়েড?
–আ হা! তবে ওতো আজকাল তাড়াতাড়িতেই সেরে যায়। কত ওষুধ বেরিয়েছে। আমাদের আমলের সান্নিপাতিক সারতই না। ঠিক আছে, আমি তোমাকে সাতটার মধ্যে খাইয়ে দেব। সাতটা পঞ্চাশে একটা গাড়ি আছে না রে অনু? সেই গাড়িতে ফিরে যেও।
