গ্রামের আবহাওয়ায় এলেই আমাদের ছেলেবেলায় কথা মনে পড়ে। বিশেষত আমার। ছেলেবেলার কথা আমিই প্রথম শুরু করলাম। তারপর আর কারও কথাই থামছিল না। মা-বাবার গল্প, দাদু ঠাকুরমার গল্প, আদর শাসন, সস্তার দিন আর দাঙ্গা যুদ্ধ দেশভাগের আগেকার সব কথা এসে পড়ল, দূর পথ টের পেলাম না। চারদিকে কচুবন, মাঝখানে পায়ে হাঁটা পথ, আর অদূরে বাঁশের হেঁচা–বেড়ার ঘের–দেওয়া একটা টিনের চালওলা বাড়ির সামনে একটা লোক দেখিয়ে দিল… এই বাড়ি।
উঠোনে এসে দাঁড়াতেই গ্রাম্য চেহারার দু একজন লোক আর বউ–ঝি নানাদিক থেকে উঁকি দিল। খালি গায়ে কালো মতো একজন আধবুড়ো লোক এসে বলল –আসুন, কলকাতা থেকে আসছেন তো?
সম্মতি জানাতেই বলল –অনু ওই ঘরে আছে।
উঠোনের চারদিকে আলাদা আলাদা ঘর, যেন শরিকানার বাড়ি। সব ঘরেরই এক-ইটের দেওয়াল, দাওয়া, আর টিনের চাল। অদূরে খড়ের গাদা, গোয়াল পেঁকি ঘর একটা। টিউব ওয়েলের হাতলের ওপর শরীরের সমস্ত চাপ দিয়ে পাম্প করতে গিয়ে একটা বাচ্চা ছেলে শূন্যে উঠে হাত পা ছড়িয়ে নেমে আসছে। দেখতে-দেখতে আমরা দাওয়ায় উঠলাম। ঘরের দরজা থেকেই দেখা গেল অনিন্দ্যর রোগা মুখে শেষবেলার লাল আলো এসে পড়েছে। চোখ বুজে ছিল সে। লোকটা গিয়ে তাকে ডাকল। আমরা খবর দিয়ে আসিনি, তাই আমাদের দেখে ধড়মড় করে উঠে পড়ল অনিন্দ্য, মুখে অবিশ্বাসের হাসি, চোখ উজ্জ্বল। উঠে বসে বলল –আয় রে।
বিছানায় দুজন, আর টিনের চেয়ারে দুজন বসলাম। একথা ঠিক যে এরকম পরিবেশে অনিন্দ্যকে মানায় না। অনিন্দ্য পুরোপুরি শহুরে মেজাজের, যে টেরিলিন পরে, অল্পেই ধৈর্য হারায়, চালাক, সপ্রতিভভাবে চলাফেরা করে। তাকে দেখে আন্দাজ করা শক্ত যে তাদের বাড়িতে টেকি–ঘর আছে, কিংবা খড়ের গাদা। যে লোকটা আমাদের ওর কাছে নিয়ে এল তার মুখের আর চেহারার আদলের সঙ্গে অনিন্দ্যর মিল আছে। সম্ভবত ওর বাবা। সত্যি বলতে কি ওরকম বাবাও অনিন্দ্যকে মানায় না।
ঘরের আসবাবপত্র ভালো নয়। যে খাটে অনিন্দ্য শুয়ে আছে একমাত্র সেই খাটটার গায়েই কিছু সেকেলে কারুকার্য, আর যা আছে তার কোনওটাকেই লোক দেখানো বলা চলে না। সস্তা একটা আলমারিতে ঠাসা বই, একটা টেবিলের ওপর পাতা খবরের কাগজের ঢাকনা, ঘরের ওধারে আর একটা চৌকিতে বিছানা গুটিয়ে রাখা, মাদুর পাতা রয়েছে, ঘরের কোণে মেটে হাঁড়ি কলসি চাল থেকে দড়িতে ঝুলছে শীতে ব্যবহার্য লেপ কাঁথার পুঁটলি। ইঁদুরের ভয়ে ঝুলন্ত দড়িতে উপুড় করা মালসা লাগানো হয়েছে। ঢুকতে–না-ঢুকতেই এত সব লক্ষ্য করা গেল।
অনিন্দ্য ফুল আর ফলের বাহার দেখে বলল –তোরা যে আমাকে রোমান্টিক হিরো বানিয়ে দিলি। আহা, গাড়ির ভিড়ে ফুলগুলো ডলা খেয়ে গেছে রে!
জিগ্যেস করলাম–তোর কী হয়েছে?
–সে অনেক কথা। শুনবি। আগে একটু মা বাবাকে ডাকি, আলাপ পরিচয় কর, তারপর।
অনিন্দ্যর বাবা সে লোকটা নয়। তার চেহারার ধরনটা একই। আরও বুড়ো, লম্বা, রোগা, ঠোঁটে শ্বেতীর দাগ আছে একটু। প্রণাম করতে গিয়ে দেখি ঘোর গ্রীষ্মেও তাঁর পায়ে মোজা। সম্ভবত পায়েও শ্বেতী আছে। খুব কুণ্ঠিতভাবে বিড়বিড় করে কী একটু বললেন। সামান্যক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন, বললেন–গাড়িতে কষ্ট হয় নাই তো!…আইচ্ছা তোমরা বসো, অনুর লগে গল্প কর…আইচ্ছা বেশ… বলতে-বলতে ভ ভদ্রলোক পালিয়ে বাঁচলেন। অনিন্দ্য হেসে বলল –একদম গাঁইয়া রে বাবাটা।
অনুর মা উলটোরকম। গিন্নিবান্নির মতোই মোটাসোটা চেহারা; অল্প ঘোমটা দিয়ে এসে দাঁড়িয়েই হাসলেন, পরিষ্কার কলকাতার টানে বললেন–তোমাদের তো অনেকদিন আগেই আসার কথা ছিল। আসোনি কেন?
প্রায় সমস্বরে বললাম–আসা হয় না। কত কাজ বাকি থাকে আমাদের। অফিস আমাদের যে কীভাবে গ্রাস করে বসে আছে।
–রাত্রে তোমরা খেয়ে যেও। আমি রান্না করছি।
সমস্বরে বললাম–তা হয় না। বাসায় আমাদের জন্য রান্না করা থাকবে, খাবার নষ্ট হবে।
হেসে বললেন–কলকাতার লোক তো রাত্রে রুটি খায়। আমরা ভাত খাওয়াব। যত ইচ্ছে। তারপর ছেলের দিকে চেয়ে বললেন–দ্যাখো তো, এই দুর্দিনে কী একটা রোগ বাঁধিয়ে বসে আছে। হবে না কেন! এই কটা মাত্র খায়, মরে গেলেও এক মুঠো বেশি খাবে না। জোয়ান বয়েস, এখন তেমন খোরাক না হলে কি শরীর টেকে! বড্ড পিটপিটে, কালো মাছ খাবে না, দুধ খেলে বমি আসে, শাকপাতা নাকি জঞ্জাল, চিঁড়ে–মুড়ি ছোঁবে না, খালি পেটে কেবল অমৃত আছে ওর চা। যত দাও খাবে। একে আমি কী করে বাঁচাব বলো তো? মাঝখানে ধুয়ো তুলেছিল যে কলকাতায় গিয়ে মেসে থাকবে। বলো তো তাহলে ও আর বাঁচাত? যাতায়াতের অসুবিধে হয় তা বুঝি, কিন্তু লোকে তো যাচ্ছে। তা ছাড়া এখানকার স্কুলে ওর জন্য একটা মাস্টারিও জুটিয়েছিল ওর বাবা। অনেক বলেকয়ে। ঘরের খেয়ে চাকরি, কিন্তু ওতে ওর পোষাল না। এখানে নাকি লাইফ নেই, কেবল নাকি ঘোঁট পাকায় লোকেরা।
অনিন্দ্য ভ্রূ কুঁচকে বলল –মা, তুমি এবার কেটে পড়ো।
উনি হাসলেন–তা তো বলবিই। বন্ধুদের কাছে সব ফাঁস হয়ে যাচ্ছে কিনা। তারপর একটু শ্বাস ফেলে বললেন–যেদিন সত্যিই কেটে পড়ব সেদিন আর কুল পাবি না…বলতে-বলতে সামলে গেলেন, আমাদের দিকে চেয়ে হেসে বললেন, তোমরা বোসো, আমি চা পাঠিয়ে দিই গে।
