বাচ্চা একটা মেয়ে আমাদের হাত পাখায় বাতাস করছিল। অনিন্দ্য তাকে দেখিয়ে দিয়ে বলল –এই আমার ছোট বোন পুটলি। দিন–রাত বেড়ালছানা ছেনে বেড়ায়। কী বলে রে তোকে সবাই পুটলি।
–ষষ্ঠী ঠাকরুণ। বলেই জিভ কাটল।
উঠোনে অনেক কাচ্চা বাচ্চা বউ, দু-একজন মুনিশ। গৃহস্থের সংসার।
অনিন্দ্যর মা বলল –শান্তি পাই না বাবা। এই দুর্দিনে ছেলেটা রোগ বাঁধাল।
অনিন্দ্য হাসে-ধানের দাম পড়ে গেলে তোমাদের দুর্দিন, কিন্তু ওদের তো দুর্দিন নয়। ওসব বোলোনা, ওরা বুঝবে না।
–কী যে বলিস। বলেই অনিন্দ্যর মা হেসে প্রসঙ্গ পালটে নিলেন–তোমরা সবাই মাংস খাবে তো!
সুভাষ আমিষ খায় না। ছেলেবেলাতে বাবা মারা গিয়েছিল, তারপর থেকে বিধবা মায়ের আওতায় ও মানুষ। মাছ মাংসর স্বাদই জানে না। সেকথা জানাতে মাসিমা বললেন–তোমাকে ছানার ডালনা খাওয়াব।
ঠিক হল রাত সাতটা পঞ্চাশের গাড়িতেই সবাই একসঙ্গে ফিরে যাব। হাতে সময় ছিল। আমরা পাঁচজন কাছেপিঠে একটু ঘুরে এলাম। পুরোনো মন্দির, দিঘি, বটগাছ, কিংবদন্তির কবর –এইরকম কিছু-না-কিছু সব গ্রামেই থাকে। সেসব দেখা হল। ওদের বাড়ির পিছনেই পুকুর। তার বাঁধানো চাতালে বসলাম পাঁচজনে। অনিন্দ্য বলল –একটা সিগারেট খাওয়া। অসুখ হওয়ার পর খুব রেস্ট্রিকশন যাচ্ছে। খেতে দেয় না। সিগারেট ধরিয়েই বলল –বোধহয় জ্বর আসছে রে! গা–টা দেখ দেখি।
দেখে বললাম–একটু আছে। চল ঘরে যাই।
অনিন্দ্য মাথা নাড়ল, না থাক। একটু বসি।
গ্রীষ্মের সূর্য তখনও আকাশের প্রান্তে একটুখানি লেগে আছে। দীর্ঘ বেলা। অনিন্দ্যর রোগা মুখে আলো এসে পড়েছে। আমরা চেয়ে আছি। ও বলল –সায়েন্সের কথা কী যেন বলছিলি আশু? খুব এগিয়ে গেছে না কী যেন।
আশু হাসল–কেন শালা তুমি জান না?
–জানি, জানি আমার অসুখ সেরে যাবে, সায়েন্স আমার জন্য ওষুধ বের করেছে, সব অসুখের জন্যই করবে। তারপর হাসল অনিন্দ্য কিন্তু আমি শালা কোনও ওষুধ বের করিনি, কারও রোগ শোক দূর করবার কোনও যন্তর–মন্তর বের করিনি। এক নম্বরের স্বার্থপর, দাম্ভিক ঝগড়াটে এই আমাকে দ্যাখ আমি কিছুই করিনি এ-পর্যন্ত। আমার বাবা খেত খামার করে, জমি বাড়ায়, ধানের দাম কমলে হায়–হায় করে। আমি চাকরি করি, টাকা আনি, নিজের জন্য ভাবি। আমার বাবা বা আমি যে বংশ রেখে যাব তারাও অবিকল এরকমই কিছু করবে। সায়েন্স এগিয়ে গেল বলে আমার শালা গর্ব করার কিছু নেই। তাই না? পরের জন্য না ভাবলে সায়েন্স এগোয় না। আর আমি কেবল শালা নিজের কথা ভাবি। তোকে বলছিলাম না রমেন, নিজেকে ভালোবেসে কী হয়। দূর, নিজেকে ভালো করে দেখলে ভালোবাসাই যায় না। মাইরি, এ-রোগটা যখন আমার সত্যিই সেরে যাবে তখন বড় লজ্জা করবে আমার।
–কী বলছিস যা তা?
–বিশ্বাস কর সত্যিই লজ্জা করবে। যার জন্য কিছু করিনি সে যদি হঠাৎ এসে আমার মস্ত উপকার করে তাহলে যেরকম লজ্জা করে ঠিক সেরকম। বুঝলি রমেন, শোধ দেওয়া না গেলে খুব লজ্জার কথা। আমি সারাদিন শুয়ে-শুয়ে ভাবি আর লজ্জায় মরে যাই। মনে-মনে লোকজনের কাছে ক্ষমা চাই বলি–দ্যাখো আমার ভিতরে বিজ্ঞান নেই, পরোপকার নেই, সেবা নেই, ভালোবাসা নেই, তবু এই আমাকে আমি সারাদিন ভেবে যাচ্ছি। আমাকে ক্ষমা করো।
আস্তে-আস্তে বললাম–আমরা সবাই ওরকম।
–হবে। বলে চুপ করে গেল অনিন্দ্য।
আমরা উঠলাম যখন তখন অনিন্দ্যর জ্বর বেড়েছে। একটু কাশছে ও।
রাত সাতটা নাগাদ আমরা গাড়ি ধরার জন্য বেরোলাম। তখন অনিন্দ্য শুয়ে আছে ঘরের মধ্যে। দরজা থেকেই ডেকে বললাম–চলি রে, অনিন্দ্য।
–আচ্ছা, ঘোলাটে চোখে চেয়ে ও হাসল–আবার বড় দল নিয়ে আসিস। মুরগি খাওয়াব। সবাইকে বলিস যে আমার ভালো হওয়ার ইচ্ছে নেই, তবু সকলের জোর জবরদস্তিতে লজ্জার সঙ্গে আমি ঠিক ভালো হয়ে যাব।
হাসলাম।
ওর কাকা লণ্ঠন ধরে আমাদের অনেক দূর এগিয়ে দিয়ে গেল। ফেরার পথে ফাঁকা রেলগাড়ির কামরায় আমরা চার সহকর্মী বন্ধু খুব বেশি কথাবার্তা বলছিলাম না। হয়তো বেশি খাওয়ার জন্য আমাদের ঝিমুনি আসছিল। হয়তো আমরা অনিন্দ্যর কথা ভেবে বিষণ্ণ ছিলাম। কিংবা কে জানে হয়তো নিজেদের কথা ভেবেই আমরা কেন যেন শান্তি পাচ্ছিলাম না।
বাঘ
এইখান দিয়ে একটু আগে একটা বাঘ হেঁটে গেছে। নরম মাটিতে এখনও টাটকা পায়ের দাগ। বাতাস শুকলে একটু বোঁটকা গন্ধও। বাঘটা শুধু যে বেড়াতে বেরিয়েছিল, এমন নয়। ফেরার পথে বাজারও করে নিয়ে গেছে। অর্থাৎ বুড়ো হরিচরণের একটা বাছুরও নিয়ে গেছে মাঠ থেকে। তাই কাদা মাটিতে বড়-বড় রক্তের চাপ পড়ে আছে। জেলির মতো জমে গেছে। হ্যাট মাথায় কয়েকজন হাফ প্যান্টপরা শিকারি ঘুরে বেড়াচ্ছে ঝোপে ঝাড়ে। বিটাররা নদীর ধারের জঙ্গলের ওপাশ থেকে টিন, ঘণ্টা আর যা পেয়েছে সব বাজাতে-বাজাতে আসছে। একজন পাইপ মুখে। শিকারি বন্দুকটা ধাঁ করে মাঝখানটায় ভেঙে কার্তুজ পরীক্ষা করে নিল, তারপর ফড়াক করে আবার সোজা করল বন্দুক। সবাই তৈরি।
বাঘটা সেবার বেরোয়নি। কিন্তু বহুকাল আগের দেখা এই দৃশ্যটা আজও ভুলতে পারে না জোনাকিকুমার।
বাঘটা বেরোয়নি বলে কি আজও এইরকম অপেক্ষা করছে সে?
মাঝদুপুরে আজ বৃষ্টি নামল। তারপরই হঠাৎ থেমে গেল। আবার নামল, আবার থেমে গেল। বৃষ্টির সঙ্গে-সঙ্গে তাল রেখে জোনাকিকুমারও এক-একবার এক-একটা বাড়ির সদরে বা লবিতে উঠে দাঁড়িয়েছে। এবং এইভাবে সে ময়দানের কাছে একটা আঠারো তলা অফিস বিল্ডিংয়ে পৌঁছেছে সীতানাথের সঙ্গে দেখা করবে বলে। দেখা হল না। সীতানাথ তেরোতলায় বসে। শুনল সে আজ ফুটবল খেলা দেখতে গেছে। জোনাকি একটু হতাশ আর নিঃসঙ্গ বোধ করে। সীতানাথকে পেলে কদমের মেস-এ গিয়ে তাস পেটানো যেত। হল না। কিন্তু তেরোতলা থেকে একঝলক ময়দান দেখে সে বড় অবাক হয়ে গেল। এ-বাড়িতে সীতানাথের অফিস সদ্য উঠে এসেছে, এই প্রথম সীতানাথের অফিসে এসেছে জোনাকি। তেরোতলা থেকে ময়দান সে আর কখনও দেখেনি। কী আশ্চর্য সবুজ! বিশ্বাস হয় না। কলকাতা নয়, ঠিক বিলেত বলে মনে হয়। ভিকটোরিয়া মেমোরিয়ালটা পর্যন্ত চেনা বলে মনে হয় না। নীচে চৌরঙ্গির রাস্তা, টিকিওলা ট্রাম যাচ্ছে, ভোঁতা ডবলডেকার গাড়ি—সবই অদ্ভুত সুন্দর দেখায়। ছিমছাম এক ইউরোপের শহর যেন। ময়দান এত সুন্দর জানা ছিল না তো!
