[গল্পের নিয়মে গুহ সাহেবের স্ত্রী হতে পারত সেই পপি। জীবন তো অনেক সময় গল্পের মতোই হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, গুহ সাহেবের স্ত্রী পপি নয়। অন্য একজন।]
পল্টন বিলিয়ার্ড টেবিলে একা-একা বল চালাচালি করছিল। সাহেবরা কেউ আসেনি তখনও।
গুহ সাহেব হাত গুটিয়ে বললেন, হয়ে যাক এক হাত।
হল। হেরে ভূত হয়ে গেলেন গুহ। পল্টন গা লাগিয়েও খেলল না।
পরদিন গলফে সে গুহ সাহেবকে একদম বুরবক বানিয়ে ছাড়ল।
কিন্তু গুহ সাহেব বুরবক হতে পছন্দ করেন না। তিনি বিদেশে বিস্তর গলফ আর বিলিয়ার্ড খেলেছেন। কম্পিটিশানে শুটিং করেছেন। তাই ক্রমে–ক্রমে তাঁর পল্টনের সঙ্গে একটা অদেখা শত্রুতা গড়ে উঠতে থাকে।
শীতকালে জলায় বাঘ আসে। সেবারও এল। সাহেবরা বন্দুক কাঁধে বাঘ মারতে চললেন। সঙ্গে পল্টন।
জঙ্গল বিটিংহচ্ছে। জঙ্গলের বাইরে দু-সার বন্দুক তৈরি।
পল্টন দূরে একটা গাছতলা বেছে ছায়ায় বসে আছে। বসতে-বসতে ঢুলুনি এল। শুয়ে গেল সেইখানেই।
বাঘটা বেরোল বিদ্যুৎশিখার মতো। তারপর ঢেউ হয়ে ছুটতে লাগল খোলা মাঠ দিয়ে, আগুনের মতো উজ্জ্বল শরীরে।
মোট দশখানা বন্দুক গর্জে উঠল দুই সারি থেকে। তার পরেও গর্জাতে লাগল। ধোঁয়ায় ধোয়াক্কার, বারুদের গন্ধে বুক ছিঁড়ে যায়।
বাঘটা ঝাঁঝরা হয়ে পড়ে গেল ধানের খেতে। তার রক্তে মাটি উর্বর হতে লাগল। পল্টন শুয়ে ছিল টিলার মতো উঁচু জায়গায়। গাছতলায়। সবই ঠিক আছে তার শুধু তোলা হাঁটুর মাঝখানে একটা ছ্যাঁদা। তীর বেগে রক্ত বেরোচ্ছে।
যখন সবাই ঘিরে ধরল তাকে সে কাতর স্বরে বলল , শাবাশ। লেগেছে ঠিক। ঠিক লেগেছে। শাবাশ সাহেব।
কাকে বলল কেউ বুঝতে পারল না। তবে মাসখানেক বাদে গুহ সাহেবের স্ত্রী তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে ডিভোর্সের মামলা আনলেন আদালতে।
বন্ধুর অসুখ
অনিন্দ্যর অসুখ করেছে শুনে দেখতে গিয়েছিলাম।
এই প্রথম ওর বাড়িতে যাওয়া। কোনও নিমন্ত্রণ ছিল না। আমরা কেবল খবর পেয়েছিলাম যে, ওর অসুখ। অনিন্দ্য রোগা টিঙটিঙে, এক মাথা চুল, খুব সিগারেট খায়, আর খলবল করে কথা বলে। অফিসের আমরা সবাই অনিন্দ্যকে মোটামুটি পছন্দ করি, কারণ অনিন্দ্য ঝগড়া করেই ভাব করতে পারে, সকলের সঙ্গেই তার ভাব আর ঝগড়া লেগেই থাকে। রাজনীতিতে সে উগ্র, ভগবানকে সে কাছায় বাঁধে, তবু তার মন নরম, অল্পেই সে এলিয়ে পড়ে। তাকে নিজের দুঃখের কথা শুনিয়ে বড় আরাম।
তার অসুখের খবর পেয়ে আমরা চার সহকর্মী তার বাসায় যাব ঠিক করেছিলাম। আমি, সুভাষ, সমীর আর আশুতোষ। বড় দূরে অনিন্দ্যর বাসা। শিয়ালদহ থেকে রেলগাড়িতে এক ঘণ্টা তার পরেও মাইল খানেক হাঁটা পথ। রিকশাও যায়, তবে রাস্তা খারাপ বলে ঝাঁকুনি লাগে। তাই হেঁটেই আরাম। এসব আমাদের শোনা ছিল।
এর অসুখের দশ দিনের দিন এক শনিবার পড়ল। আগে থেকেই ঠিক করা ছিল পাঁচজন যাব। কিন্তু শনিবার মানু এল না বলে হলাম চারজন। হাঁটা পথে বউবাজার থেকে চাঁদা করে আপেল কিনলাম, কয়েকটা দামি কমলা, আশুতোষ কিছু ফল কিনল নিজের পয়সায়, তারপর ঘামতে–ঘামতে দুর্জয় গরমে চারজন গিয়ে রেলগাড়িতে উঠলাম। ভিড়, গরম, ধাক্কাধাক্কি। তার মধ্যেও চারজন দলা পাকিয়ে রইলাম। মনে হচ্ছে অসুখটা ভালোই পাকিয়েছে অনিন্দ্য। নইলে দশ দিনে তার হাঁপিয়ে ওঠার কথা। জ্বর–জারি তার লেগেই থাকে, গলায় সাত-আট মাস গলাবন্ধ জড়ানো আর ফ্যরিনজাইটিসের জন্য, তবু সে বাধা মানে না। অফিসে আসে, বলে–দূর, ওই অজ পাড়াগাঁয়ে কথা বলার লোক পাই না। আমি তো রবিবারেও এসে কফি হাউসে আড্ডা মেরে যাই।
কতবার তার বাড়িতে যেতে বলেছে অনিন্দ্য। যাওয়া হয়নি। শহরে আছি বারো মাস, মাঝে মাঝে বাইরে কোথাও একটু যেতে ইচ্ছে করে। জলজঙ্গল গাঁ–গ্রামের টান। অনিন্দ্যর অসুখ হল বলেই যাওয়াটা ঘটে গেল। নইলে যাব–চ্ছি করে আরও সময় কেটে যেত।
তখন প্রায় পৌনে চারটে। ঘামে ভেজা জামা কাপড় নিয়ে প্ল্যাটফর্মে নামতেই শরীর জুড়িয়ে বাতাস দিল। প্ল্যাটফর্ম থেকে মনে হচ্ছিল জায়গাটার ভাবসাব শহুরে। সেটা কিন্তু বেশিক্ষণ রইল না। স্টেশনের যে দিকটায় শহরের ভাব, আমাদের যেতে হল তার উলটোদিকে, রেল লাইন পেরিয়ে। ইটের এবড়ো–খেবড়ো রাস্তা, গাছপালার ছায়ায় আচ্ছন্ন, গরুর গাড়ি আর মন্থর রিকশা একটা দুটো চলছে। রিকশার ওপর ঝুড়ির পাহাড়, তার ওপর ঠ্যাং মেলে চিৎ হয়ে আছে গ্রামীণ চাষাভুসো লোক, বিড়ি টানছে। রিকশাওয়ালারা পায়ে হেঁটে গাড়ি টেনে নিচ্ছে। বোঝা যায়, স্টেশনের এপাশে শৌখিন সওয়ারি নেই, রিকশাও মাল পরিবহণে কাজ লাগে।
যেন অসুখ উপলক্ষ্যে নয়, বেড়াতেই এসেছি আমরা। চেঁচামেচি করে চারজন হাঁটছিলাম, হোহো হাসি আর কলকাতার গল্প। কলকাতার বাইরে ঠিক কলকাতার মতো কিছু নেই, তাই বাইরে এলে কলকাতার লোক কেবল কলকাতার গল্প করে। গাছের নীচু ডাল থেকে লাফিয়ে পাতা ছিঁড়ে, এটা–ওটা দেখার জন্য মাঝে-মাঝে থেমে, পথের হদিস জিগ্যেস করে আমরা হাঁটছিলাম। ফেরার খুব তাড়া ছিল না। শুনেছি দশটায় শেষ ট্রেন যায় কলকাতায়। ইচ্ছে করলে সেটাও ধরা যাবে। বাগড়া দিচ্ছিল সুভাষ, ওর একটা বিয়ের নিমন্ত্রণ, আর নিম–অরাজি ছিল সমীর। আমাদের মধ্যে একমাত্র সমীরই প্রেম করে। ত্রিশ বছরে প্রেমে পড়েছিল, এখন একত্রিশ চলছে। আমরা ভেবেছিলাম হয়তো টগরের জন্যই ফেরার তাড়া। সমীর বলল যে তা নয়, ওর ভাইয়ের অসুখ। এক অসুখ রেখে আর এক অসুখ দেখতে এসেছে।
