কিন্তু ভোর তো হল!
পল্টন ভারী শহরে ঢুকে চারদিকে দেখে। বাবার সঙ্গে বহুবার এসেছে, তখন খারাপ লাগেনি। এখন মনে হল, ই বাবা, এখানে আবার না জানি কী হবে! কিন্তু ডরপোকের ইজ্জত নেই। সঙ্গে বন্দুক তো আছে এখনও। প্রথমে পল্টন তার আংটি বেচল। তারপর খেল পেট ভরে।
বাজারের কাছে বন্দুক হাতে ঘোরাঘুরি করার সময় বহু লোক তাকে ফিরে-ফিরে দেখতে থাকে। কয়েকটা বাচ্চা ছেলে পিছু নেয়। একটা ছেলের হাতে আধ খাওয়া জিলিপি। পল্টন তাকে বলল , জিলিপিটা ধরে দাঁড়া।
ছেলেটা দাঁড়ায়। বিশ হাত দূর থেকে পল্টন বন্দুক মারে, জিলিপি পড়ে যায়।
ছেলেটা কেঁদে ওঠে বটে, কিন্তু বহু লোক তাকে শাবাশদিতে থাকে।
তো পল্টনের পয়লা কাম সাফা, এ কাজটা হল সবচেয়ে শক্ত কাজ। ঢোকা। ঢুকে পড়া। পল্টন পয়লা গুলিতেই শহরে ঢোকার রাস্তা করে নিল।
সে জোগাড় করল আলপিন, ছুরি, টমেটো, আলু, সুতো আর যত সূক্ষ্ম–সূক্ষ্ম জিনিস আছে। ছুরির মাথায় টমেটো গেঁথে, সুতো ঝুলিয়ে, আলপিনের ডগা লক্ষ করে সে দমাদম বন্দুক মারে। একটা তাস দাঁড় করিয়ে যে-কোন ফোঁটায় গুলি লাগায় দশ-বিশ হাত দূর থেকে। গুলি ফসকায় না। মোমবাতির শিখা নিভিয়ে দেয়, উড়ন্ত মার্বেল ছটকে দেয়।
দিনে দেড়–দু-টাকা রোজগার দাঁড়াল। কোই পরোয়া নেই। একটা চালের আড়তে পাহারা দেওয়ার কাজ পেল, সেইখানেই মাথা গোঁজার জায়গা আর দু-বেলা খাওয়া। সারাদিন শহরের এখানে সেখানে বন্দুকবাজি। তবে ভুলেও সে আর মেয়েদের দিকে তাকায় না। ওপড়ানো জায়গায় ফের চুল গজাতে অনেক সময় লেগেছে।
তো বন্দুক আর পল্টন আছে। আর কী চাই?
আড়তের মালিক চেন্টুবাবুর আসলি বন্দুক আছে। দুটো নল দিয়ে আগুনে সিসে ছটকায়। চেন্টু বলে–চালাবি?
উদাস স্বরে পল্টন বলে–ও বড় ভারী জিনিস।
দূর ব্যাটা। অভ্যাস কর।
পল্টন আসল বন্দুকের খদ্দের নয়। সে কোনওদিন পাখি মারেনি, বাঘ মারেনি, বেড়াল পর্যন্ত নয়। জীবজন্তু মারতে বড় কষ্ট হয়। আসল বন্দুকে তার তবে কাজ কী?
কিছুদিন যায়। হাওয়া-বন্দুকের খেল শহরে পুরোনো হয়ে গেছে। নতুন আর কিছু না দেখালে লোকে তাকাবে কেন?
খুব ভাবে পল্টন। সে চিৎ হয়ে, উপুড় হয়ে, হেঁটমুন্ডু হয়ে বহু লক্ষ্যভেদ দেখিয়েছে। কিন্তু তাও তো সব দেখা হয়ে গেছে মানুষের। আর কী বাকি আছে? রাতের বেলা হাওয়া-বন্দুক কোলে নিয়ে পল্টন জেগে বসে আড়ত পাহারা দেয় আর ভাবে। ভাবতে-ভাবতে একদিন চেন্টুবাবুকে বলল –বন্দুক ছাড়া আর তো কিছু জানি না। তা বললেন যখন তো দিন আপনার মারণ কল। চালাই।
পারবি তো?
প্র্যাকটিস তো করি!
চেন্টুবাবু বন্দুক দিলেন। বললেন–গুলির বড় দাম। সাবধান, বেশি খরচ করিসনি।
খুবই ভারী বন্দুক, হাওয়া-বন্দুকের পাঁচগুণ। চেন্টুবাবু তাকে নিয়ে এক ছুটির দিনে শহরের বাইরে গেলেন বন্দুক শেখাতে।
সারাদিন দমাদম চাঁদমারি হল। দিনের শেষে চেন্টুবাবু হাঁপাতে-হাঁপাতে বললেন–তুই শালা একলব্যের বংশ।
মিথ্যেও নয়। আসলি চিজ পয়লা দিন ধরেই পল্টন খেল দেখিয়েছে। পিসবোর্ডে আঁকা গোল টার্গেটের ঠিক মাঝখানে একটা-পর-একটা গুলি পাম্প করে দিয়েছে; এদিক-ওদিক হয়নি চেন্টুবাবু শূন্যে ঢিল ছুঁড়েছেন, আর পল্টন সেই ঢিল ছাতু করেছে। তারপর নারকোল পেড়েছে বন্দুকে, বটের ফল পেড়েছে, সর্বশেষে একটা ওল্টানো কাঁচের গ্লাসের ওপর রাখা একটা কমলালেবু ছ্যাঁদা করেছে, গ্লাসটার চোট হয়নি।
শহরে শখের শিকারি কিছু কম নেই। পল্টনের বন্দুকের হাত সবাই জেনে গেল। সেই থেকে সে শিকারি পার্টির সঙ্গী। ছুটির দিনে কেউ-না-কেউ এসে বলবেই, চল রে পল্টন।
পল্টন যায়। নিজের হাতে জীবজন্তু সে মারে না। তবে বন্দুক বয়। গুলি ভরে দেয়। সঙ্গে থাকে। কথা কম বলে সে। কেউ চাইলে বন্দুকের নানা ভেলকি দেখায়। চলন্ত জিপগাড়ি থেকে টার্গেট মারে, ঘোড়ার পিঠ থেকে পিছন ফিরে লক্ষ্যভেদ করে, হেঁটমুণ্ডু হয়ে নিশানায় গুলি চালায়।
বিশ্বাসবাবু বললেন–তা পাখি মারিস না কেন?
কষ্ট হয় বাবু। পাখির তো বন্দুক নেই। সে উঠে কী চালাবে?
ব্যাটা ফিলজফার!
পল্টন জানে মারাটা উভয় পক্ষেই হওয়াটা হক্কের। এক তরফা ভালো নয়। পাখি বন্দুক চালালে সে-ও উলটে চালাতে পারত।
চৌধুরি সাহেব বললেন–কিন্তু বাঘ?
–বাঘেরও বন্দুক নেই। তা ছাড়া সে তো আমার ঘরে গিয়ে হামলা করেনি। বরং তার জায়গায় এসে আমিই ঝামেলা চালাচ্ছি।
–তোর কপালে কষ্ট আছে।
সে জানে পল্টন। কপালে কষ্ট তার নেই তো কার আছে!
অফিসারদের ক্লাবে পল্টন চাকরি পেয়েছে। টেনিস বল কুড়িয়ে দেয়, ঘাস ছাঁটে, গলফের ব্যাগ নিয়ে যায়, মদ ঢেলে দেয়।
একদিন খেয়ালবশে গলফ স্টিক চালিয়ে বহু দূরের গর্তে বল ফেলল।
মিত্র সাহেব বিয়ারের জাগ হাতে রঙিন ছাতার তলায় বসেছিলেন। দেখে বললেন–হোল ইন ওয়ান! আবার মারো তো!
আবার মরে পল্টন এবং এবারও গর্তে বল ফেলে।
সেই থেকে পল্টন একনম্বর গলফ খেলোয়াড়। সেই থেকে সে বিলিয়ার্ডেও সবচেয়ে চৌখস। পল্টন ছাড়া সাহেবদের চলে না। পল্টন ছাড়া ক্লাব অচল।
কাছাকাছি বউ বা প্রেমিকা থাকলে কোনও সাহেবই পল্টনের সঙ্গে বড় একটা বিলিয়ার্ড বা গলফ খেলে না।
গুহ সাহেব নতুন এসেছেন। সুন্দরী স্ত্রী।
