নতুন লোকটা কিন্তু চূড়ান্ত জয়ের মুখোমুখি এসে গেছে। আমরা বুঝতে পারি। এবং চারদিক থেকে হইহই করে উঠি। মতে ঘাবড়ে যায়। তারপর সত্তর বছর বয়সের পক্ষে অত্যন্ত সাদা এবং সুন্দর দাঁত দেখিয়ে সে হেসে ফেলে। বলে ঠিক আছে, মাঝে–মধ্যে বিড়িটা সিগারেটটা দিবেন, চা–পানির পয়সা দিবেন, বাথরুম খুলে দিচ্ছি।
দুদিন বাদে স্নান করে ডালিম খুব খুশি। হারুকে গা শুকিয়ে বলল –দ্যাখ তো, আর সেই চামসে গন্ধটা পাওয়া যাচ্ছে?
–না। হারু কে বলল ।
সবাই স্নান করলাম। ওপর থেকে ঝাঁঝরি দিয়ে কী মিঠে ঠান্ডা ঝিরঝিরে জল যে পড়ল! আহা! ঘুম পেয়ে গেল। স্নানের পর বেশ ভালোই দেখাতে লাগল আমাদের। তার সঙ্গে একটা লড়াই জেতার আনন্দ।
নতুন লোকটা আবার ডেক চেয়ারে বসেছে। পশ্চাদ্দেশ ঝুলে আছে ফুটো দিয়ে। টেবিলে আমরা চারজন। তাসগুলো আবার বাঁটা হচ্ছে। পিছন থেকেই তাসগুলো চেনা যায়। কিন্তু সামনে আরও অনেক দুপুর পড়ে আছে, আরও অনেক দিন। আমাদের কিছু করার নেই।
বাজে তাস পেয়ে আমি তাস ফেলে দিলাম। টিকটিকি কেন জল খায় না তা আবার গম্ভীরভাবে ভাবতে লাগলাম। আশ্চর্য এই যে, প্রতিদিনই এরকম নতুন কিছু না কিছু ভাববার। জিনিস ঠিক পাওয়া যায়।
প্রিয় মধুবন
মাথা অনেক শূন্য লাগছে আজকাল। অনেক বেশি শূন্য। যেন একখানা খোলামেলা ফাঁকা ঘর। মাঝে-মাঝে শুধু একটি কি দুটি শালিক কি চড়ুইয়ের আনাগোনা। এরকম ভালো। এরকম থাকা ভালো। আমি জানি।
কালকেও আমার কাছে একখানা বেনামি চিঠি এসেছে। তাতে লেখা ‘বিপ্লবের পথ কেবলই গার্হস্থ্যের দিকে বেঁকে যায়! বনের সন্ন্যাসী ফিরে আসে ঘরে!’ লাল কালিতে লেখা চিঠি। নাম সই নেই, তবু আমি হাতের লেখা চিনি। লিখেছে কুণাল মিত্র। আমার বন্ধু। এখনও বোধহয় ফেরারি। প্রায় দশ বছর তার খোঁজ জানি না।
আমাদের ডাকঘরগুলির কাজে বড় হেলাফেলা। চিঠির ওপর ঠিকঠাক মোহরের ছাপ পড়েনি। আমি কাল সারাদিন আতস কাঁচ নিয়ে চেষ্টা করে দেখলাম। না, কোথা থেকে যে চিঠিটা ডাকে দেওয়া হয়েছে তা পড়াই গেল না। জানি যেখান থেকেই দেওয়া হোক ডাকে, কুণাল আর সেখানে নেই। সে সরে গেছে অন্য জায়গায়। রমতা যোগীর মতো ফিরছে কুণাল, কোথা থেকে কোথায় যে চলে যাচ্ছে! তবু বড় ইচ্ছে করছিল কুণাল কোথায় আছে তা জানতে।
কাল বিকেলের দিকে আলো কমে এলে আমি আতস কাঁচ নামিয়ে রাখলাম। মাথা ধরে গিয়েছিল সারাদিন আতস কাঁচের ব্যবহারে। তাই চোখ ঢেকে বসেছিলাম অনেকক্ষণ! ভুল হয়েছিল। সে তো ঠিক চোখ-ঢাকা নয়! টের পেলাম দুটি হাতের আঙুলের ফাঁকে-ফাঁকে গড়িয়ে নামছে চোখের জল।
বিপ্লবের পথ কেবলই গাৰ্হস্থ্যের দিকে বেঁচে যায়! বনের সন্ন্যাসী ফিরে আসে ঘরে! এ আমারই কথা। কুণাল কেবল কথাটা ফিরিয়ে দিয়েছে। যেন ওর কথার আড়ালে উঁকি মারছে তার সকৌতুক দয়াহীন মুখ–রাস্তা তুমিই দেখিয়েছিলে, ঘর থেকে বের করে এনেছিলে তুমিই। তারপর সরে গেছ কোথায়! এখন কার এঁটো চেটে বেড়াচ্ছ মধুবন? তোমার ঘেন্না করে না?
চমৎকার এইসব শব্দভেদী বাণ কুণালের। মেঘের আড়াল থেকে লড়াই। প্রতিদিন পালটে যাচ্ছে তার ঠিকানা। আর আমি মধুবন–আমি বাঁধা পড়েছি স্থায়ী ঠিকানায়। কুণাল হয়ে গেছে ছায়া কিংবা মায়া। আমি এখন কোথায় পাব তাকে? এ চিঠির তাই জবাব দেওয়ার দায় নেই।
কাল সন্ধেবেলায় আমি ঘরের আলো জ্বালিনি। কুণালের চিঠিটা হাতে নিয়ে চুপ করে বসেছিলাম। আমার বুকের মধ্যে টিকটিকির বাসা। ঘর ছাড়ার কথা মনে হলেই সে ডাক দেয় টিকটিক টিকটিক। যেয়ো না। যাব না তা আমি জানি। তবু চোখের জলে আমার দু-হাতের আঙুল ভিজে গিয়েছিল। নিজের জন্য নয়, আমি কুণালের জন্য কেঁদেছিলাম। তারপর ফাঁকা একখানা ঘরের মতোই শূন্য হয়ে গেল মাথা। মাঝে-মাঝে একটি দুটি শালিক কি চড়ুইয়ের মতো ভাবনা। ও স্মৃতি আনাগোনা করে গেল।
অনেকক্ষণ আমার বাইরের কোনও জ্ঞান ছিল না। তারপর আমার বউ সোনা আমাকে ডাকল, ‘রাজা, একটু এ-ঘরে এসো।’
গিয়ে দেখি সে কাপড় পালটাচ্ছে। বলল , ‘দেখো, আমি তোমাকে সারাদিন একটুও জ্বালাইনি। তবু এখখন জিজ্ঞাসা করছি ও চিঠিটা কার? সারাদিন তুমি ওটা নিয়ে বসে আছ?’ আমি চিঠিটা এনে তার হাতে দিলাম।
ও দেখল। তারপর অবহেলায় চিঠিটা টেবিলের ওপর ফেলে গিয়ে বলল , ‘দ্যাখো কী বিচ্ছিরি ব্লাউজ পরেছি। পিছন দিকে বোতাম ঘর। কিছুতেই আটকাতে পারছি না, তুমি একটু বোতাম এঁটে দাও না।’
তখন সোনার সাজ আমি লক্ষ করলাম। কনুই পর্যন্ত হাতাওয়ালা একটা ব্লাউজ পরেছে সে, গলায় আর হাতে পাতলা লেস-এর ফ্রিল দেওয়া। ব্লাউজটা আরও কয়েকদিন ধরে পরতে দেখেছি। কোনওদিনই বোতাম এঁটে দেওয়ার জন্য আমার ডাক পড়েনি। তাই মৃদু হেসে আমি ওর পিঠের দিকে বোতাম আর হুকগুলো লাগিয়ে দিলাম।
ও আস্তে করে বলল , ‘ইস, কী ঠান্ডা হাত!’
‘ঠান্ডা!’ আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘কই!’ বলে হাত দুটো ওর গালে রাখলাম।
মাথা ঝাঁকিয়ে সোনা বলল , ‘না সে ঠান্ডা নয়! নিস্পৃহতার কথা বলছিলাম।’
চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম আমি। সোনা ধীরে-ধীরে আঁচল তুলে দিচ্ছিল শরীরে। হঠাৎ মুখ এগিয়ে বলল , ‘আদর!’
তক্ষুনি কুণালের চিঠিটার কথা একদম ভুল হয়ে গেল।
