সোনার ব্লাউজের বোতাম আর হুকগুলো আর-একবার লাগিয়ে দিতে হল আমাকে। তারপর সোনা টেবিলের ওপর থেকে চিঠিটা তুলে নিয়ে বলল , ‘লাল কালিতে লেখা এই দেড় লাইনের চিঠিটা নিয়ে এখন আমরা কী করব? বাঁধিয়ে রাখব?’
হেসে বললাম, ‘ঠাট্টাটা আমাকেই লাগল, সোনা। চিঠির ও কথাগুলো একদিন আমিই বলতাম। বহুদিন পর অনেক খুঁজে-খুঁজে আমার কাছে ফিরে এসেছে আমারই কথা।’
ও ভ্রূ কুঁচকে চিঠিটার দিকে চেয়ে থেকে বলল , ‘এটা কি তোমাকে ভয় দেখানোর জন্য?
‘না, না!’ আমি মাথা নেড়ে হেসে উঠি, ‘ওটা এমনিই, ঠাট্টার ছলেই আমার কথা আমাকে ফিরিয়ে দেওয়া।’
সামান্য দ্বিধা করে সোনা বলল , চিঠিটার নাম–সই নেই। তবু তোমার মুখ দেখে মনে হচ্ছে তুমি একে জানো। কে?’
একটু ভেবে বললাম, ‘ও বোধহয় আমারই এক সত্তা। অতীত থেকে লিখে পাঠাচ্ছে।’
‘কবিতা!’ সোনা হেসে ফেলল, ‘এ কবিতা হয়ে গেল, রাজা।’ হাসি থামিয়ে আস্তে-আস্তে বলল , ‘আমি তো তোমার কাছে শুনেছিলাম যে আমি তোমার এক সত্তা। তোমার এরকম আর ক’টা সত্তা আছে, রাজা?’
হিংসুক। সোনা ভীষণ হিংসুক। ঘরে ওর রাজতন্ত্র। আমি ওর রাজা। ওকে এখন কিছুতেই বোঝানো যায় না যে একদিন আমি কুণালের ছিলাম প্রিয় মধুবন।
না, কুণালের প্রিয় মধুবন হওয়ার জন্য আর-একবার পিছু–হাঁটার কোনও ইচ্ছেই নেই আমার। এখন আমি বেশ আছি। ফাঁকা, খোলামেলা শান্ত একটি ঘরের মতো শূন্য মাথা। মাঝে-মাঝে এক-আধটা শালিক কি চড়ুইয়ের আনাগোনা। এক-আধটা ভাবনা, এক-আধখানা স্মৃতি। তার চেয়ে বেশি কী দরকার। এখন আমার আলো বাতাস ভালো লাগে, ছুটির দিন ভালো লাগে, অবসর আমার বড় প্রিয়। আমার প্রিয় সেলাই–কলের আওয়াজ, আমার শিশুছেলের কান্না, আলমারিতে সাজিয়ে রাখা পুতুল কিংবা ফুলদানিতে ফুল। আর বুকের মধ্যে সেই টিকটিকির ডাক। যেয়ো না। যেয়োনা।
তবু মাঝে-মাঝে যখন ভিড়ের মধ্যে রাস্তায় চলি তখন হঠাৎ বড় দিশেহারা লাগে। কিংবা যখন মাঝরাতে হঠাৎ কখনও ঘুম ভেঙে যায় তখন লক্ষ করে দেখি পাথর হয়ে জমে আছে আমার অনেক আক্ষেপ। আয়নায় নিজের মুখ দেখে কখনও চমকে উঠি। মনে কয়েকটা কথা বৃষ্টির ফোঁটার মতো কোনও অলীক শূন্য থেকে এসে পড়ে। তুমি যে এসেছিলে কেউ তা জানলই না। হায়, মধুবন!
সত্য বটে এ সবই আবেগের কথা। নইলে আমার মনে স্পষ্ট কোনও আক্ষেপ নেই। না আছে। পিছু–হাঁটার টান। খুব একটা স্মৃতিচারণও নেই আমার। মাঝে-মাঝে সোনা যখন আমাদের ছেলেটাকে নিয়ে কোথাও বেড়াতে যায়, বা বাপের বাড়িতে থেকে আসে একটি দুটি দিন, তখন কখনও-সখনও সন্ধেবেলায় বা রাত্রে আমি ঘরের আলো নিবিয়ে দিয়ে চুপচাপ বসে থাকি। একটি-দুটি কথা অন্ধকারে মশা ওড়ার শব্দের মতো অন্ধকারে গুনগুন করে যায়। আমি তৎক্ষণাৎ
আমার বাচ্চা ছেলেটার কান্নার শব্দ মনে-মনে ডেকে আনি, সোনার গলার স্বরের জন্য নিস্তব্ধতার কাছে কান পেতে রাখি। আস্তে-আস্তে সব আবার ঠিক হয়ে যায়। যদি কখনও হঠাৎ মনে হয় যে এরকম শান্ত জীবন হওয়ার কথা ছিল না আমার, আরও দূরতর, ভিন্ন অনিশ্চয় এক জীবন আমার হতে পারত, তখন সঙ্গে-সঙ্গে আমি হাতের কাছে যা পাই হয়তো ওষুধের শিশি, ফাউন্টেন পেন। কিংবা অন্য কিছু না পেলে হাতের আংটির পাথরের দিকে চেয়ে থেকে আস্তে-আস্তে মনকে একটা বিন্দুতে নিয়ে আসি। অতীত এবং ভবিষ্যৎ থেকে ফিরিয়ে নিই আমার মুখ। আস্তে-আস্তে বলি, এরকমই ভালো। এরকম থাকাই আমাদের ভালো। তখন মাথা অনেক শূন্য লাগে। অনেক বেশি শূন্য। যেন একখানা খোলামেলা ফাঁকা ঘর।
অনেকদিন আগে কুণালের সঙ্গে আমার জীবন শেষ হওয়ার কিছু পরে ওইরকম লাল কালিতে লেখা বেনামি আর-একখানা চিঠি এসেছিল আমার সঠিক ঠিকানায়। তাতে লেখা ‘জীবনে সৎ হওয়াই সব হওয়া নয়! আদর্শই সব! আদর্শ না থাকলে পুরোপুরি সৎ হওয়াও যায় না!’ প্রতিটি বাক্যের পর একটি করে বিস্ময়ের চিহ্ন। আসলে ওগুলো সকথিত জিজ্ঞাসা। ছুঁচের মুখের মতো ওই চিহ্নগুলো আমাকে বিঁধেছিল। আমারই বলা কথা আমাকে ফিরিয়ে দেওয়া। সেই তার প্রথম বেনামা চিঠি। তারপর আমার বিয়ের কিছু পরে আরও একখানা। এইরকম : ‘বৃষ্টি হলেই মিছিল ভেঙে যাবে! দৌড়ে গিয়ে দাঁড়াতে হবে গাছতলায়। মাথা বাঁচাতে।’ কি জানি। সে গাছতলায় বলতে এ ক্ষেত্রে ছাদনাতলায় বুঝিয়েছিল কি না। চিঠিটা আমি সোনাকে দেখাইনি। শুধু মনে-মনে বুঝতে পেরেছিলাম, সে আমার সব খবর রাখে, হদিস রাখে সঠিক ঠিকানার। সে আমাকে ভোলেনি। সামান্য ভয় আমাকে পেয়ে বসেছিল। কী জানি, আমি তাকে আরও তো কত কী শিখিয়েছিলাম। সে যদি সব মনে রেখে থাকে। তারপর ক্রমে বুঝতে পেরেছিলাম যে তা নয়। এ তার আমাকে নিয়ে খেলা। আসলে পুরোনো পুতুলের মতো ভেঙে সে আমাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে তার জীবন থেকে। মাঝে-মাঝে সে কেবল দূর থেকে আমাকে ওইভাবে স্পর্শ করে দেখতে চায় আমি কতটা চমকে উঠি।
বলতেই হয় খেলাটা চমৎকার শিখেছে কুণাল। সে খেলতে জানে। গতকাল আমি সামান্য অন্যরকম হয়ে গেলাম। আজ সকালে তাই আমার মুখের দিকে ঘুমচোখে চেয়ে সোনা প্রথম প্রশ্ন করল, ‘আজও তুমি ওই ভূতুড়ে চিঠিটার কথা ভাবছ।’ চমকে উঠলাম। বস্তুত তা নয়। চিঠিটার কথা আমি ভাবছিলাম না, কুণালের কথাও না।
