বলতে কি, এই ব্যাপারটা আমাদের বিশেষত আমার মাথায় কোনওদিনই আসেনি। ওয়েটিংরুমে বসবার অধিকার পেয়ে আমরা আনন্দে এতই আত্মহারা হয়ে যাই যে, বাথরুমটার তালার কথা মনেই হয়নি। আমরা যা পেয়েছি সেটার বিস্ময়ের ঘোরই এখনো কাটেনি। কিন্তু লোকটার কথায় আমার বুকের মধ্যে একটা বিদ্যুৎ ছুঁয়ে গেল। বস্তুত একটু আগে জেল–ফেরত মদনের কাছে সংগ্রাম এবং লড়াইয়ের কথা শুনে আমার ভিতরটা তেতেই ছিল। আমি ঝাঁকি দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। বললাম–মতের এটা ভারী অন্যায়।
নতুন লোকটা হাসল। ঠান্ডা গলায় নিকলসনের মতো ইংরেজিতে বলল –দ্যাটস দা স্পিরিট।
আমি সিঁড়ি ভেঙে উত্তেজিতভাবে নেমে যাচ্ছিলাম। ডালিম ডেকে বলল –রন্টে, বেশি মেজাজ দেখাসনি মতের সঙ্গে। বের করে দেবে। আজকাল দুপুরে কাঁঠাল–পাকানো গরম পড়ে, শহরের আর কোথাও অমন মাগনা বসতে দেবে না-এ সব মনে রাখিস।
মতে ওয়েটিংরুমের দরজার সামনেই বশংবদ দাঁড়িয়ে। আমাকে দেখে চোখের ইশারায় ধমকাল দূর থেকে। অর্থাৎ ভিতরে এখনও মেহমান আছে তারপর কাছে এসে নীচু গলায় বলল –এখন চলে যান।
আমি ভয়ে-ভয়ে বললাম–কারা এসেছে?
–চা–বাগানের বড়-বড় সাহেব সব। বাগান থেকে গাড়ি এসে নিয়ে যাবে, তাই ইনতেজার করছে। চলে গেলে আমি আপনাদের ডেকে দেব।
আমার ভিতরের সংগ্রামী মনোভাব তখন অর্ধেক হয়ে এসেছে। কাছে পিঠে যদি এমন লোক থাকে যে খুব বড় অফিসার, কিংবা খুব শিক্ষিত বা খুব বড়লোক, তা হলেই আমার ভিতরটা কেমন যেন ভয়-ভয় ভাবে ভরে ওঠে।
তবু আমি সাহস করে বললাম–মতে, তুমি আমাদের বাথরুমটা খুলে দাও না কেন?
–বাথরুম! বলে মতে কিছুক্ষণ অবাক হয়ে দেখে আমাকে। তারপর বলে বাথরুম দিয়ে কী হবে?
আমি রাগ করে বলি–বাথরুম দিয়ে কী হয় তুমি জানো না?
মতে বুঝদারের মতো মাথা নেড়ে বলে–পেসাপ করবেন তো? সে তো অ্যানেক জায়গা আছে। স্টেশনভর তো পেসাপেরই জায়গা, কত লোক করে যায়। বেগ পেলে লাইনের ধারে এসে ছেড়ে দেবেন। পিলাট ফরম থেকে নামতেও হবে না। মালগুদামের পিছনে টাট্টি ভি করতে পারেন। ওদিকের পুখুরে জল ভি আছে।
আমি পয়েন্ট খুঁজে পাই না। তার কথায় প্রায় সায় দিয়ে ফেলি আর কি! তবু কাঁইমাই করে একটা পয়েন্ট খুঁজে পেয়ে বললাম–পুকুরটার জল তো নোংরা।
মতে উদার গলায় বলল –নোংরা আবার কি! কয়েকটা ভৈষ বসে থাকে বলে একটু ঘোলা। জল–খরচে ওর চেয়ে ভাল জল দিয়ে কী হবে?
হতাশ হয়ে আমি ফিরে আসি।
–কী হল? ডালিম জিগ্যেস করে।
–বাথরুম খুলে দেবে না।
–ঘরটা?
–বাগানের সাহেবরা আছে, তারা গেলে ডেকে দেবে।
সবাই অপেক্ষা করতে থাকি। এগারোটা বাজতে চলল। বাতাস তেতে উঠছে, ধুলো উড়ছে। সিঁড়ির নীচে ভিখিরিরা নাড়িভুঁড়ি সেদ্ধ করে নামিয়ে একগাদা তরকারির খোসা সেদ্ধ চাপিয়েছে। প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চ–এ ঘুমিয়ে পড়েছে নিকলসন সাহেব, হাঁ–মুখ থেকে একটা বড় নীল মাছি বেরিয়ে এল। হারু অনেকটা তামাক–পাতা নিয়ে এসেছে, আর চুন।
সকলের পকেটেই একটা দুটো লুকোনো সিগারেট আছে। কেউ তো বের করে না। যে বের করবে সে পাবে প্রথম পাঁচ টান, বাকি সবাই তিন টান করে। তাই সবাই চেপে যায়। আমি হাত বাড়িয়ে খৈনি নিই। ঠোঁটে টিপে থুথু ফেলতে থাকি। নতুন লোকটা চোখ বুজে আছে। নতুন কিছু ভাবছে নিশ্চয়ই। লোকটা জানে অনেক।
ডালিম বলল –বাথরুমটা পেলে দুদিন বাদে স্নানটা হত।
লোকটা আবার চোখ খোলে। আমি উৎসুকভাবে তাকাই।
লোকটা বলে–রন্টেবাবু কোনও কাজের নয়। বাথরুমটা আমরা পাবই। পেতেই হবে।
আমি একটু অপমানিত বোধ করলেও চেপে গেলাম। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে যদি আরও তিনটে ওয়েটিংরুম আমাদের দখলে আসে তবে কি তখনও বাথরুম তালা দেওয়া। থাকবে? এই সমস্যাটা আমাকে ভাবিয়ে তোলে।
অনেকক্ষণ বাদে মতে এসে নীচে থেকে ডাকল–যান সব। ঘর খালাস হয়েছে। বকশিশ যেন মনে থাকে।
নতুন লোকটা গা ঝাড়া দিয়ে উঠেই আমাদের সংগ্রামে ডাক দেয়–উঠুন, ওকে ছেড়ে দেওয়া যায় না। সরকারি ওয়েটিং রুমে বসতে দেয়, তাতে তো ওর বাবার টাকা খরচা হয় না। ওসব সামান্য খাতিরে আমদের ভুলে গেলে চলবে না। বাথরুম ওকে খুলে দিতেই হবে।
আমরা গিয়ে মতেকে ধরি।
–বাথরুম খুলে দাও। দিতেই হবে।
আমাদের মারমুখো মুখের দিকে চেয়ে মতে একটু থতিয়ে যায়। বলে–বাথরুম খুলে দিলে তা আপনারা নোংরা করবেন। আমি বুড়ো হয়েছি, হাতে বাত, ধোলাই করতে আমার জান বেরিয়ে যায়।
আমরা অনেক পয়েন্ট পেয়ে যাই। নতুন লোকটা বলে–ধরো যদি এই স্টেশন আগের মতোই হত, রোজ প্যাসেঞ্জার নামত, তাহলে তো রোজই তোমাকে ভোলাই করতে হত! তখন কী করতে?
মতে গম্ভীর এবং করুণ মুখে বলে–সেদিন তো এখুন নাই। এখন একটু সুখে আছি, আপনারা দিবেন না?
লোকটা সরকারি কর্মচারীদের গাফিলতির কথা তোলে। নেহরুর একটা কোটেশন দেয়, এবং ভবিষ্যতে স্টেশনগুলোর ওয়েটিংরুম দখলে শ্রেণিহীন সমাজের সংগ্রামী ভূমিকার ভয়ও দেখায়। মতে ক্রমশ পয়েন্ট লুজ করতে থাকে। শেষদিকে কেবল নিজের বুড়ো বয়সের অক্ষমতার উল্লেখ ছাড়া আর কোনও জোরালো পয়েন্ট দিতে পারে না। তখন মোক্ষম অস্ত্রটি ছাড়ে লোকটা, বলে–তোমার বয়স কম করেও সত্তর।
মতে ভয় পেয়ে গিয়ে বলে–না না, ওই নিকলসন সাহেবের উমর কেবল পঁচাত্তর। ওই চোট্টা সাহেবটা ছাড়া আর আমরা কেউ, এই স্টেশনের কোনও গভরমিন্টের লোক উমর ছিপাইনি!
