লোকটা বলল –ক্রমশ বিশ্বের বৃহত্তম প্রকল্প রচনায় ভারত রেকর্ড সৃষ্টি করতে যাচ্ছে, বুঝলেন?
আমি মাথা নাড়ি।
লোকটা বলে–যখন একের পর এক জংশন শেষ হবে তখন আলটিমেটলি দেখবেন পশ্চিমের বৃহত্তম জংশন ছাড়া অন্য তিনটি জংশনই মাইনর স্টেশন হয়ে গেছে। এবং সে সব স্টেশনের ওয়েটিংরুমগুলো আমরা ক্রমে দখল করে নেব। ওয়েটিংরুম দখলের লড়াইয়ে আমরা জিতবই। অবশ্য ততদিনে আমাদের মতো শ্রেণিহীন সমাজের লোকও অনেক বেড়ে যাবে, আরও বেশি–বেশি ওয়েটিংরুম দরকার হবে তখন। সেই ওয়েটিংরুমগুলো হবে শ্রেণিহীন সমাজের মুক্তাঞ্চল।
থুথু ফেলায় ডালিমের কাছে হেরে গিয়ে বাদু দশটা কাঠি দিয়ে দিল, আর দশটা বাকি রাখল। কাল দিয়ে দেবে। মুখ ঘুরিয়ে নতুন লোকটাকে বলল –আপনি আমার ইয়ে জানেন।
লোকটা বলে–পরিষ্কার করে বলুন।
বাদু সবজান্তার মতো বলে–দক্ষিণে জংশন হবে ঠিকই। তবে উত্তরেরটার সঙ্গে দক্ষিণেরটার যোগাযোগ হবে আমাদের এই স্টেশনের ভিতর দিয়ে। তখন এই স্টেশন দিয়েও মেল ট্রেন যাবে। তিনটে স্টেশনই তখন ইম্পর্ট্যান্ট হয়ে উঠবে।
নিকলসন সাহেবের টুপির ভিতরের বোলতাটার মতোই আমার মাথার মধ্যে একটা সমস্যার চিন্তা বোঁ করে ডেকে চক্কর দিতে থাকে। আমি ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে বলি–তাহলে ওয়েটিংরুমটার কী হবে?
বাদু আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলে–আবার সেগুন বা মেহগনির চেয়ার টেবিল আসবে, সুইং ডোরটা সারানো হবে, মতের জায়গায় নতুন কেয়ারটেকার আসবে। তখন দেখবি, সুন্দর সুন্দর মানুষ আর মেয়েমানুষ গাড়ি থেকে নেমে আমাদের ওয়েটিংরুমে দু-দণ্ড জিরিয়ে যাবে।
লোকটা একটু হাসল। তারপর বলল –বাদুবাবু, তার চেয়ে বলুনন না, পৃথিবীটা আবার পিছিয়ে যাবে, ইংরেজরা ফিরে আসবে, নিকলসন মেমসাহেব নিয়ে ঘর করবে–
বাদু লোকটার দিকে তাকিয়ে থাকে। খুব রাগের চোখ।
লোকটা ঠান্ডা গলায় বলে–আপনি যা বলছেন তা হল পশ্চাদপসরণের কথা। আমি যা বলছি তা প্রগতির কথা। আমার কথাই ঠিক হবে কারণ ভারত এখন প্রগতির মেলট্রেনে উঠে পড়েছে, নামবার উপায় নেই, চেন টানলে আড়াই শো টাকা জরিমানা। তাকে যেতেই হবে। অতএব আগামী পাঁচ-ছ’বছরের মধ্যেই আমরা আরও তিন–তিনটে ওয়েটিংরুম পেয়ে যাচ্ছি।
মনে-মনে অমি নতুন লোকটাকেই সমর্থন করতে থাকি। আমার মনে হয়, লোকটাই ঠিক বলছে। মনে-মনে তাকে আমি ভীষণ সমর্থন করি, মনে-মনেই পিঠ চাপড়ে দিই। বাদুর ভয়ে মুখে কিছু বলি না।
বাদু জিগ্যেস করল–আপনি ইয়ার্কি করছেন? লোকটা প্ল্যাটফর্মের দিকে চেয়ে ছিল। প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চ–এ পাশাপাশি বসে হারু নিকলসনের সঙ্গে প্রাণপণে ইংরেজিতে কথা বলছে। দুজনেরই ঠোঁটের নীচে খৈনির টিপি। সেই দিকেই চেয়ে লোকটা বলল সাহেবটা একেবারে দ্বারাভাঙ্গা জিলার লোক হয়ে গেল, দেখেছেন? আজকাল খুব চ্যবনপ্রাশ খায়। কার কাছে শুনেছে, চব্যনপ্রাণে যৌবনোচিত শক্তি বাড়ে।
বাদু বলে–ওর মেম–বউকে নাকি রেল কোম্পানি এখনও ওর মাইনে থেকে কেটে মাসোহারা পাঠায়।
ডালিম অবাক হয়ে বলে–সে তো বিলেতে। বিলেতে কি ইন্ডিয়ান টাকা পাঠানো যায়? আইনত পারে না।
–বিলেত না আমার ইয়ে! বলে বাদু-ওর বউ কানপুরে এক সাহেব মুচিকে বিয়ে করে সেখানেই আছে। বিয়ে করলে মাসোহারা পায় না।
আমি অবাক হয়ে বলি–তাহলে সাহেব খৈনি খায় কেন?
বাদু আমাকে পাগল দেখার মতো দেখে বলে–খৈনির সঙ্গে ওর মেম–বউয়ের কী সম্পর্ক?
আমার এইটাই হচ্ছে মুশকিল। মনের মধ্যে এমন সব চিন্তা আসে, এমনই জটিল সে সব চিন্তা যে হঠাৎ সেই চিন্তার কথা বলে ফেললে লোকে ঠিক বুঝতে পারে না। পাগল কিংবা বোকা। ভাবে। আসলে আমি ভাবছিলাম, বউকে মাসোহারা পাঠাতে না হলে নিকলসনের বেশ কিছু টাকা নিশ্চয়ই বেঁচে যায়। এবং সে ক্ষেত্রে খৈনি না খেলেও ওর চলে। অন্তত বিড়িটা তো ম্যানেজ হয়ই।
একমাত্র নতুন লোকটাই আমার কথা বুঝতে পারল বলে মনে হল। সে আমার দিকে চেয়ে বলে ঠিকই বলেছেন রন্টেবাবু। ব্রিটিশ আমলে যখন ও কম মাইনে পেত তখন ও মেমবউ পুষত, গোল্ডফ্লেক সিগারেটও খেত। গত পঁচিশ বছর ধরে একটানা চেকারের চাকরি, মাইনে নিশ্চয়ই ওর আন্দাজ ভালোই এবং ব্রিটিশ আমলের চেয়ে বেশিই পায়, তবু ক্রমে ব্র্যান্ড পালটে বিড়ি হয়ে খৈনিতে পৌঁছে গেছে। কিন্তু খৈনির পর কী? হোয়াট নেকস্ট সেইটাই সমস্যা! বলে। লোকটা গভীর চিন্তা করতে থাকে।
আমি লোকটাকে ভাবতে দিয়ে আবার টিকটিকিদের কথা ভাবি। জল খায় না? টিকটিকি সত্যিই জল খায় না?
ডালিম হাই তুলে বলে–হেঁদো কথায় কী হবে? মোটে সাড়ে দশটা বাজে, লম্বা দুপুর পড়ে আছে। রন্টে, ওয়েটিংরুমটার কী হবে? একবার মতের কছে খোঁজ নিয়ে আয় না!
ওয়েটিংরুমের কথায় নতুন লোকটা ধ্যান ভেঙে তাকায়। তারপর আমাকে চুড়ান্ত সম্মান দিয়ে আমাকেই বলে রন্টেবাবু, একটা জিনিস লক্ষ করেছেন?
লোকটার জ্ঞানের কাছে আমি ক্রমেই বিকিয়ে যাচ্ছি। সঙ্গে-সঙ্গে উৎসুক হয়ে বলি–কী?
–ওয়েটিংরুমটা আমরা পেয়েছি বটে, কিন্তু বাথরুমটা পাইনি। ওটা এখনো মতে তালা দিয়ে রাখে।
আমি সত্যটা উপলব্ধি করতে থাকি। মাঝখানে বাদু বলে–মতে খুলে দেয় না যে, কী করব? লোকটা চোখ ছোট করে বলে–তা হলে বলতেই হয় যে, আপনাদের জয় সম্পূর্ণ হয়নি। বাথরুমটা তালা দিয়ে রাখা কিন্তু চূড়ান্ত অপমান।
