মদন একটু হাসল এতক্ষণে, বলল –সেই নিজের শ্রেণিকে ফিরে পাওয়ার জন্যই তো আমাদের লড়াই…বলতে-বলতে ভুল বুঝতে পেরে মদন একটু থমকে গেল, তারপর আবার বলল –আসলে আমাদের লড়াই শ্রেণিমুক্ত, শ্রেণিহীন সমাজের জন্য, আমাদের লড়াই–
ডালিম জিগ্যেস করল–কার সঙ্গে?
–কার সঙ্গে! ভারী অবাক হয় মদন, তারপর কনুই চুলকোতে–চুলকোতে বলে–আমলা আর শ্রেণিশত্রুর বিরুদ্ধে।
হারু শ্বাস ফেলে জিগ্যেস করল–তারা কারা? কে আমলা, কে শ্রেণিশত্রু?
মদন রেল–ইয়ার্ডের দিকে অন্যমনস্কভাবে চেয়ে বলল –বাবা।
আমরা চমকে উঠি। জিগ্যেস করি–তোর বাবা শ্রেণিশত্রু? আমলা?
মদন মাথা নেড়ে বলল –না। ওই দেখ বাবা বাজার করে ফিরছে।
আমরা চেয়ে দেখি, মদনের বাবা হরিবাবু বাজারের ব্যাগ হাতে লাইন পার হয়ে ফিরছেন। দূর থেকে তাঁকে একটা কাঁকড়ার মতো দেখাচ্ছে।
মদন সেদিকে চেয়ে থেকে বলল –দু-বছর বাদে বাবাকে দেখলাম। কী রোগা হয়ে গেছে দেখেছিস!
আমাদের মন নরম হয়ে যাচ্ছিল। চুপ করে রইলাম।
মদন একটা শ্বাস ফেলে মুখ তুলে আমাদের দিকে চেয়ে বলল –ততারা এখনও এইভাবে সময় নষ্ট করিস! ওয়েটিংরুম আর ওভারব্রিজ ঘুরে-ঘুরে জীবনটা কাটিয়ে দিলি। কত কিছু করার ছিল তোদের। বলে আমাদের মুখে সে একটু ভর্ৎসনার চোখে তাকাল, বলল –আমি জেল খেটে এলাম, দ্যাখ, কত কষ্ট পেয়েছি, কিন্তু এখানেই থামছি না। আবার যাব জেল–এ। তারপরও আবার যাব। এই ভাবে একদিন জেলখানার দেওয়াল ভেঙে পড়বে। ওরা যত মারবে, আমাদের লড়াই তত ছড়িয়ে পড়বে….
বাধা দিয়ে ডালিম বলল –খুব কষ্ট দেয় জেল–এ?
বড়-বড় চোখে চেয়ে মদন বলল –দেবে না! চুল ছাঁটিনি কত দিন, মাথায় উকুনের বাসা, গায়ে চামড়ার নীচে একরকমের পোকা হয়েছে, ভীষণ চুলকোয় চাম পোকা বলে। গাঁটে গাঁটে। ব্যাথা।
–খুব মারত?
–জেল–এ মারধর নিষেধ। কিন্তু আমরা ফার্স্ট ক্লাস প্রিজনারশিপের জন্য আন্দোলন করায় মারে, তারপর এনকোয়ারির সময়ে ওপরওয়ালা এলে ওরা রিপোর্ট দিল যে আমরা জেল থেকে। পালানোর চেষ্টা করেছিলাম বলে মেরেছে। উঃ যাই এখন স্নান করব। বহরমপুর থেকে টানা এসেছি, রাতে ঘুম হয়নি। কতদিন দাঁত মাজি না রে। বলে মদন নেমে গেল।
গাড়ি চলে গেছে। প্ল্যাটফর্ম আবার ফাঁকা। আমি ভাবছিলাম, যদি মদনদের কুয়োটাও বোম ফাটা কুয়ো হয়ে থাকে আর ওর বাবা যদি জল মেপে থাকে তবে মদনের আজ স্নান হবে কি না! আমি খুব গম্ভীরভাবে ব্যাপারটা ভাবতে থাকি। সবসময়েই আমার মাথায় অদ্ভুত সব সমস্যার চিন্তা আসে।
হারু অনির্দিষ্টভাবে জিগ্যেস করল–সিগারেট আছে?
কেউ উত্তর দিল না, জানা কথা নেই।
গাড়ি চলে যাওয়ার পর নিকলসন প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চিতে বসে টুপি খুলে ঘাড় গলার ঘাম মোছে। তারপর একটু ঝিমোয়। আজও ঝিমোচ্ছে।
হারু উঠে বলল –যাই, নিকলসনের কাছে একটা বিড়ি পাই কি না দেখি।
আস্ত এবং খাঁটি একটা সাহেব কাছে পিঠে থাকলে অনেক সুবিধে। বিশেষ করে ইংরিজির ব্যাপারে। হারু এখনও এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের কার্ড রিনিউ করে। দু-একটা ইন্টারভিউও পায়। সেইজন্য ইংরিজিটা ঝালিয়ে রাখে। নিকলসনের সঙ্গে সে সব সময়ে ইংরিজিই বলে। অবশ্য এমনিতে দরকার হয় না, সাহেব ভাঙা বাংলা, হিন্দি, নেপালি দিব্যি বলে।
হারু দূর থেকেই বলল –গট বিড়ি হেঃ নিকলসন?
নিকলসন চোখ খুলে ফোকলা হাসি হাসল, তারপর বলল –ন্যাও, গট খৈনি অ্যান্ড চুনা। ট্রাই?
হারু একটু অবাক হয়ে বলে–খৈনি কবে থেকে সাহেব? বলেই আবার ইংরিজি করে বলে–খৈনি ফ্রম হোয়েন নিকলসন?
–অঃ ও! বলে নিকলসন একটা শ্বাস ফেলে পকেট থেকে লম্বা দু-মুখো কৌটো বার করে। তার এক মুখে চুন, অন্য মুখে তামাক পাতা। পাতা ছিড়তে–ছিড়তে বলে–রিসেন্টলি, ট্রাই? ভেরি চিপ। আই গাটেন এ হানচ ফর ইট সিনস লঙ, ডিডনট ট্রাই। বাট ইটস নাইস।
হারু খৈনির জন্য হাত বাড়ায়।
ডালিম আর বাদু উত্তর দিকে মুখ করে সবচেয়ে দূরে কে থুথু ফেলতে পারে তার কমপিটিশন দিচ্ছে। বাজি কুড়িটা কাঠি। নতুন লোকটা চোখ বুজে রেলিঙে হেলান দিয়ে বসে। আমি হারুর খৈনি–খাওয়া দেখতে-দেখতে চেঁচিয়ে বললাম–আমার জন্য একটু আনিস হারু। সে কথার শব্দে নতুন লোকটা চোখ খুলে বলল –একটা কথা শুনেছেন?
–কী?
–উত্তরের মতো দক্ষিণেও একটা জংশন হবে।
–জানি।
লোকটা শ্বাস ফেলে বলল –দক্ষিণের জংশন উত্তরের চেয়ে পাঁচগুণ বড় হবে। আর তখন উত্তরের জংশনটা আমাদের এই স্টেশনের মতোই ফাঁকা পড়ে থাকবে।
–জানি
–ছাই জানেন! লোকটা ধমকায়। তারপর আবার আপনমনে বলল –দক্ষিণের জংশনটা হবে পৃথিবীর চতুর্দশ বৃহত্তম জংশন, ভারতের বৃহত্তম। কিন্তু রেলমন্ত্রী বলেছেন যে, ভারত ওখানেই থেমে থাকবে না। এরপর পুর্বদিকে যে জংশনটা হবে সেটা হবে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম, তারপর তাঁরা প্ল্যান পালটাবেন। তখন পশ্চিমে হবে বিশ্বের বৃহত্তম জংশন। এইভাবে ভারত তার পুরোনো প্রকল্প ছেড়ে বৃহত্তর নতুন প্রকল্প, এবং ক্রমে বৃহত্তম প্রকল্পগুলির দিকে এগিয়ে। যাচ্ছে।
আমি বললাম–যাঃ!
লোকটা চোখ ছোট করে আমার দিকে চেয়ে বলল –যাঃ বলবেন না। আপনি অনেক কিছুই জানেন না। যেমন আজ সকাল পর্যন্ত আপনি জানতেন না যে টিকটিকি জল খায় না।
খুব লজ্জিত হয়ে পড়ি। বাস্তবিক, আমার জ্ঞান কত সীমাবদ্ধ!
