স্বপ্ন–পালঙ্ক এক আশ্চর্য প্রযুক্তির ফল। এই পালঙ্কে শুলেই একটা মৃদু কম্পন, শব্দ, সুর ও আবেশ মানুষকে আচ্ছন্ন আর শিথিল করে দেয়। তবু মেয়েটার ঘুম আসছে না কেন? রিক্তা ঘুমিয়ে অনেকক্ষণ ধরে একটা স্বপ্ন দেখল। পৃথিবীতে কেউ নেই। সে একা বেঁচে আছে। একদম একা। সে একটা নদীর ধারে মৃদু পায়চারি করছে। তার মাথার পিছনে পোকাটা। দেখছে, জরিপ করছে। হঠাৎ রিক্তা পোকাটার দিকে চেয়ে বলল , এখনও কেন আমাকে অনুসরণ করছ? কার জন্য? আমি তো একা…একা…একা…
পোকাটা তবু বিচলিত হল না।
রিক্তা তখন মিনতি করে বলল , এবার ছাড়ো আমাকে। একবারটি ছাড়ো। আমাকে সত্যিকারের একা হতে দাও। একবারটি…
পোকাটা নড়ল না। রাত দুটোয় ঘুমের চটকটা ভেঙে গেল রিক্তার। সে উঠে বসল। রোবট এগিয়ে এল সঙ্গে সঙ্গে।
রিক্তা বলল , শোনো, জবা নামে মেয়েটিকে ট্র্যাক করো। আমাকে ওর ঘরে প্রোজেক্ট করো।
দেওয়ালে ছবি ভেসে উঠল। জবা চুপ করে একটা চেয়ারে বসে আছে।
জবা! এই জবা!
আমি পূর্ণা।
আমি তোমার ঘরে একটু আসতে পারি?
এসো। আমার খুব অদ্ভুত লাগছে। আমি কি নতুন? জবা এবং পূর্ণা!
জবার ঘরে পৌঁছোতে বেশি সময় লাগল না তার। অবিকল তারই মতো একটা ফ্ল্যাটে থাকে জবা। সব কিছুই একরকম। দরজা খুলে দিল রোবট, কারণ এই দরজা তো রিক্তার কোডে খুলবে না।
আমি রিক্তা।
তুমি খুব সুন্দর।
তোমার ঘুম আসছে না?
না। আজ ঘুম আসছে না। আজ আমার আইডেন্টিটির প্রবলেম হচ্ছে। জানো, আমি পোকাটাকে মেরে ফেলেছি।
রিক্তা স্তম্ভিত হয়ে বলল , মেরে ফেলেছ? কী করে?
আমার কাছে একটা রে গান আছে। তাই দিয়ে।
ও মা! কেন মারলে?
আমাকে একটুও একা হতে দেয় না যে!
সর্বনাশ! এর শাস্তি কী জানো?
জানি ওরা আমাকে বদলে দেবে তো! দিক না। আমার আর এরকম থাকতে ভালো লাগছে না।
ওরা তোমাকে হাফ মেকানিক্যাল হাফ হিউমান ফর্ম দিয়ে পাঠাবে কায়িক শ্রমের জায়গায়। সেখানে অবিশ্রান্ত কাজ আর কাজ।
জানি। তাও ভালো।
রিক্তা হঠাৎ চুপ করে গেল। তার সব কথা ও প্রতিক্রিয়া রেকর্ড হয়ে যাচ্ছে। কাজটা ভালো হচ্ছে না। সে হঠাৎ বলল , তোমার অস্ত্রটা কোথায়?
ওই যে। টেবিলে পড়ে আছে।
রিক্তা হঠাৎ কিছু না ভেবে–চিন্তে অস্ত্রটা তুলে নিল হাতে। তারপর ঘুরে হঠাৎ ট্রিগার টিপে দিল। একটা ঝলকানি। নীলচে বিদ্যুৎ। পরমুহূর্তেই পোকাটা যেন বিস্ফোরিত হয়ে গেল। রিক্তা অবাক হয়ে দেখল, আর নেই। কোথাও নেই। দশ বছর ধরে ছিল। এখন নেই।
রিক্তা জবার দিকে চেয়ে হঠাৎ একটু হাসল।
জবাও হাসল।
তারপর দুজনেই বহু-বহু বছর পর খুব হাসতে লাগল। ভীষণভাবে।
প্রতীক্ষার ঘর
প্রতীক্ষার ঘর
টিকটিকিরা জল খায় না। বলে নতুন লোকটা খুব গম্ভীর চিন্তায় ডুবে গেল।
আমরা ক’জন দেশলাই কাঠি দিয়ে জুয়ো খেলছিলাম। তাসটা খুব পুরোনো হয়ে গেছে। চলে। ইস্কাপনের টেক্কা কি হরতনের গোলাম সবই ঘেঁড়ার দাগ দেখে পিছন থেকেই চেনা যায়, টেক্কাটা ছিঁড়েছে পাশ থেকে মাঝখান অবধি, গোলামটার দুটো কোণা নেই, এরকম সব তাসই একটু খেয়াল করলেই চেনা যায় আজকাল। বাদু তাস বাঁটতে–বাঁটতেই বলে–রন্টে, তোর ঘরে টেক্কা সাহেব গেছে, দেখ যদি বিবিটা পাস। শেষ তাসটা পেছন থেকে দেখেই মন বিগড়ে গেল। চিড়ের দুরি।
ব্লাইন্ড দিবি না? হারু জিগ্যেস করে।
বিস্বাদ মুখে বললাম–প্যাক। তাস ফেলে নতুন লোকটার দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করি–টিকটিকিরা জল খায় না?
লোকটা মুখ ফিরিয়ে আমার মুখটা একটু দেখল, বলল –জল খেতে কখনও দেখেছেন?
–না।
–তবে?
–শুনেছি টিকটিকি পেচ্ছাব করে, জল না খেলে…
লোকটা শ্বাস ফেলে বলে–ওসব আন–কথা কান–কথা। দেওয়াল জুড়ে মরুভূমি, জল পাবে কোথায়?
একটু ভাবতে থাকি, নতুন লোকটার মাথায় এত কথাও আসে!
ডালিম রাজার জোড়া পেয়ে দুটো কাঠি ব্লাইন্ড দিল। তাস সবই চেনা। দেখেও যা, না দেখেও তাই। তবু ব্লাইন্ড আর সীন চালু আছে নিয়ম মাফিক। ব্লাইন্ড দিয়ে সে হারুকে বলল –কাল তেরোটা কাঠি জিতেছিলাম, তার মধ্যে সাতটা জ্বলেনি, ঠুকতেই বারুদ খসে গেল।
হারু উত্তর দিল না। সে আমাদের একটা বুদ্ধি শিখিয়েছিল, দেশলাই কিনে কাঠিগুলো। লম্বালম্বি ব্লেড দিয়ে চিরে ফেলে সে। তাতে কাঠিটা দু-ভাগ হয়, বারুদও দু-ভাগে হয়ে যায়। ঠিকমতো বুকে জ্বালতে পারলে দু-ভাগই জ্বলে। একটা কাঠিতে দুটো কাঠি পেয়ে যাই আমরা। দেশলাই সম্পর্কে হারুকে আমরা এক্সপার্ট বলে মানি।
হারু উত্তর দিল না, কিন্তু নতুন লোকটা বলল –জ্বলবে কী করে? ওই সাতটা কাঠিতে যে বারুদের বদলে মাটি লাগানো ছিল। আমিও কাল তিনটে কাঠি জ্বালতে পারিনি। কিন্তু আমার স্বভাব সবকিছু খুঁটিয়ে দেখা, বারুদ খুঁটে দেখলাম কাঠির মাথায় পোড়া দাগ। বারুদগুলো পিষে দেখি মাটি।
ডালিম অবাক হয়ে বলে–তাই বটে? কাজটা কার?
–হারুবাবুর ছাড়া আর কার! দেশলাই উনি ভাল চেনেন। হারু রুখে উঠল না। কেমন ঠাণ্ডা চোখে নতুন লোকটার দিকে চেয়ে বলল কাঠিতে আমার নাম সই করা ছিল?
–না। ভেবেচিন্তে বের করলাম।
ডালিম হাত বাড়িয়ে বলল দেখি তোর কাঠিগুলো।
হারু তার কাঠি সরিয়ে বলল –মাটি নয় রে। দেশলাইটা ড্যাম্প ছিল হয়তো। ডালিম তবু হাত বাড়িয়ে দুটো কাঠি ছিনিয়ে নিয়ে আঙুলে পিষে দেখল। মাটিই।
