নতুন লোকটা ডেক চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে চোখ বুজল। ডেক চেয়ারের বেতের বুনুনি কবে ছিঁড়ে গেছে। সেই ছেঁড়া জায়গা দিয়ে লোকটার পশ্চাদ্দেশ ঝুলে আছে। কিন্তু বসবার ভঙ্গি দেখে কোনও অসুবিধা হচ্ছে বলে মনে হয় না। অভ্যাস হয়ে গেছে। চোখ বুজেই বলল –যখন পয়সার খেলা চালু ছিল তখন হারুবাবু কী দিতেন?
ঠিক প্রশ্ন নয়, যেন অনেকক্ষণ বাদে একটা ভাববার মতো বিষয় পাওয়া গেছে বলে লোকটা গম্ভীরভাবে ভাবতে লাগল চোখ বুজে!
বাদু অবাক হয়ে বলল –মাইরি হারু, এ যে কেষ্টনগরের কারিগরদের কাজ। সেবার মাসতুতো বোন চিনেবাদাম খেতে দিয়েছিল, ধরতেই পারিনি, কামড়ে দেখি মাটি! তুই শালা তো মাটির দেশলাইয়ের কারবার খুললে লাখোপতি হয়ে যাবি!
এসব কথায় আমার কান নেই, ভারী তো দেশলাইয়ের কাঠি! টিকটিকি জল খায় না-এ ব্যাপারটা আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল।
নতুন লোকটার দিকে চেয়ে বললাম টিকটিকি জল খায় না, এ কথাটা ঠিকই। আমিও ভেবে দেখলাম।
লোকটা শ্বাস ফেলে বলল –যখন আপনাদের পয়সার খেলা চালু ছিল তখন হারুবাবু কী দিতেন বলুন তো!
একটু ভাবতে হলো। বললাম–কী জানি! সেই কবে আমরা পয়সা দিয়ে খেলতাম তা কি আর মনে আছে! এখন পয়সা পেলেই সিগারেট কিনে ফেলি। খেলি না।
লোকটা বুঝদারের মতো মাথা নাড়ে!
কাঠের সুইং ডোরটা নষ্ট হয়ে গেছে। এখন আর আপনা থেকে বন্ধ হয় না, হাঁ হয়ে থাকে। ইঁদুরের ডাকের মতো শব্দ করে সেটা ঠেলে মতে ঘরে এল। হাতে ঝাড়ু আর ফিনাইলের টিন, তার পরনে নীল হাফশার্ট আর নীল হাফপ্যান্ট। বলল –আজ ন’টার ট্রেনে প্যাসেঞ্জার আসছে। ঘর খালি রাখবেন।
ট্রেনের এখনও দেরি আছে। আমরা কেউ নড়লাম না। বাথরুমে মতের ঝাঁটার শব্দ হতে লাগল, আর ফিনাইলের ঝাঁঝালো গন্ধ পাওয়া গেল। গন্ধটা আমার বেশ লাগে। আগে জামাকাপড় যখন বাক্স থেকে বের করে পরতাম তখন ন্যাপথলিনের গন্ধ ভুরভুর করত। সে গন্ধটা এরকমই। আজকাল আর বাক্সে রাখার মতো জামা–কাপড় নেই, সেই গন্ধটা আর পাই না, জামা প্যান্ট ময়লা হলে এক-একদিন রাতে ফিরে বাংলা সাবান দিয়ে কেচে দিই। সকালের মধ্যে শুকোয় না। একটু ভেজা-ভেজা থাকে। তাই পরে বেরিয়ে পড়ি, গায়ে-গায়ে শুকিয়ে যায় ঠিক।
মতে বাথরুমে তালা দিয়ে আবার বেরিয়ে যাওয়ার সময় বলে গেল–প্যাসেঞ্জার আসছে। মনে থাকে যেন।
প্যাসেঞ্জার অবশ্য খুব কমই আসে। উত্তরে একটা নতুন জংশন হওয়ার পর পাহাড় লাইনের যাত্রীরা ওই জংশন থেকেই হিল–স্টেশনে চলে যায়। এদিকে কেউ বড় একটা উজিয়ে আসে না। সেইটে লক্ষ্য করেই আমরা কিছুদিন হল স্টেশনের প্রথম শ্রেণির ওয়েটিং রুমটা দখল করে আছি। স্টেশন মাস্টারও কিছু বলেন না। তাঁর মেয়েদের আমরা কখনও হুড়ো দিই না। তিনি মেয়ের বিয়ে দিতে কলকাতায় গেলে আমরা তাঁর কোয়ার্টার্সের পেঁপে কাঁঠাল আর নারকেল গাছ পাহারা দিয়েছি। তিনি বলে গিয়েছিলেন বাবা, তোমরা দেখো। আমরা দেখেছিলাম। তিনি ফিরে এসে গাছে বোঁটাসুদ্ধ ফল দেখে ভারী খুশি। অবশ্য তাঁর ফিরে আসার দিন রাতেই আমরা
সব পেড়ে নিই, আর মঙ্গলবারে হাটে বেচে দিয়ে সিনেমা দেখি। তবু তিনি আমাদের ওয়েটিং রুমের ব্যাপারে কিছু বলেন না। ঘরের বাইরে থাকলে আমাদের মাথায় অনেক বদখেয়াল আসে যে!
বাদু একটা সিগারেট আদ্দেক খেয়ে ডালিমকে দিল। চার টানের পর হারু পাবে। হারু চেয়ে আছে। আবার তাস বাঁটছে বাদু। খুব আস্তে ধোঁয়া ছাড়ছে। আমার ভাগে একটা তিন আর নলা পড়েছে। দেখে চোখ ঘুরিয়ে নিলাম। শেষ তাসটা পড়ার পর একপলক চেয়ে দেখলাম, ডায়মন্ডসের গোলাম।
তাসটা বড় তাসে রেখে দিয়ে বললাম–টিকটিকি তাহলে পেচ্ছাপ করে কী করে? অ্যাঁ!
লোকটা চোখ বুজেই বলল –ট্রেনটা কি রাইট টাইমে আসছে?
–তাই কখনও আসে?
–একটু খবর নিন তো। সকালবেলাটায় জ্বালালে! এ গরমে আর কোথায় যাব!
–ওভারব্রিজ আছে। আমি বললাম।
–দূর। ওখানে বড্ড ভিখিরির ভিড়।
লাইন ক্লিয়ারের ঘন্টার শব্দ শুনে আমরা তাস গুটিয়ে বড় গোল টেবিল থেকে নেমে পড়লাম। নতুন লোকটাও উঠল।
ওভারব্রিজের সিঁড়ির তলায় ভিখিরিরা কাঠের উনুনে খাসির নাড়িভুড়ি সেদ্ধ করছে। ধোঁয়ায় চোখ জ্বালা করে। ব্রিজের ওপরের দিকে কয়েকটা সিঁড়ি নেই। সেই গর্তগুলো সাবধানে আমরা পার হলাম। ছাউনি দেওয়া ব্রিজের ওপরের টিন তেতে আছে। ধুলোর ঝাঁপটা মারছে গরম বাতাস। পশ্চিমা কুলি আর বুড়ো ভিখিরিরা গামছা পেতে টান–টান হয়ে শুয়ে। আমরা ফুঁ দিয়ে ধুলো উড়িয়ে এক জায়গায় বসলাম। হারু বলল –ডালিম তুই স্নান করিস না? গা থেকে চামসে গন্ধ আসছে।
–কুয়ো শুকিয়ে আসছে। বাবা পরশু সকালে জল মেপে আমাদের দু ভাইয়ের, যাদের চাকরিবাকরি নেই, তাদের স্নান বারণ করে দিল।
–জল মাপে কী করে? বাদু জিগ্যেস করে।
–দড়িতে গিঁট দেওয়া আছে। সেই গিঁট না ডুবলেই আমাদের স্নান বারণ হয়ে যায়। ডালিম বলে।
নতুন লোকটা বিজ্ঞের মতো বলল –কুয়ো দু-রকমের আছে, ঝরণা–কুয়ো আর বোম–ফাটা কুয়ো, আপনাদেরটা কোনরকমের?
ডালিম বলল –আমাদেরটা বোম–ফাটা। কাটতে কাটতে হঠাৎ চড়াক করে একজায়গা থেকে তোড়ে জল বেরিয়েছিল।
লোকটা বলল –ওই কুয়োই খারাপ, জল শুকিয়ে যায়। ঝরনা-কুয়ো কাটলে খুব ডিপ হয়, আর চারধার থেকে ঝিরঝির করে জল এসে কুয়ো ভরে ওঠে। তার জল শুকোয় না।
