মানুষ একা থাকে। কারও সঙ্গে কোনও সম্পর্ক রচিত হয় না। বিয়ে নেই। তবে নরনারীর মিলন অবাধ ও ইচ্ছাধীন। প্রয়োজনে সন্তান হয় বটে, কিন্তু সন্তানের সঙ্গে মায়ের কোনও সম্পর্ক নেই। সন্তান বড় হয় ক্ৰেশে এবং পরবর্তীকালে শিশু নিকেতনে। মা বা বাবার পরিচয় বলে তার কিছু থাকে না। রিক্তার গাড়ি ছাদে নেমে এল। দরজা খুলে গেল। অবসন্ন রিক্তা নেমে এল। পাশেই আর-একটা গাড়ি থেকে দুটি মানুষ নেমেছে। একজন পুরুষ, অন্যজন মেয়ে। তারা কথা বলছে না। নেমে সিঁড়ির দিকে হেঁটে চলে গেল। ওরা হয়তো রাতে একসঙ্গে থাকবে। কেউ কারও নাম বা পরিচয়ও হয়তো জানতে চাইবে না। সকালেই যে যার নিজের জায়গায় চলে যাবে। জীবনে হয়তো আর দেখাও হবে না।
বাড়ির গঠন সাধারণ। যেমনটা হয় আজকাল। একটা চত্বরঘিরে বাড়িটা চৌকোনো গড়ে ওঠে। মাঝখানটা ফাঁকা। অনেকখানি জায়গা মাঝখানে। ওপর থেকে নীচ অবধি দেখা যায়। এই ফাঁকা জায়গাটার মাঝখানে কয়েকটা লিফট বিদ্যুৎগতিতে ওঠানামা করছে। লিফট পর্যন্ত যাওয়ার জন্য আছে সরু ক্যাটওয়ে। ক্যাটওয়েগুলো কাঁচের টিউবের মতো, ওপর–নীচ–আশপাশ সব স্পষ্ট দেখা যায়। আশিতলা থেকে নীচের দিকে তাকালে একটু ভয়-ভয় করে রিক্তার। হাতে সময় থাকলে সে চলন্ত সিঁড়ি দিয়েই নামে। আজ তার শরীরে বড় অবসাদ। সে ক্যাটওয়ে দিয়ে হেঁটে লিফটের কাছে এল। কাঁচের স্বচ্ছ লিফট। রিক্তার ভয়-ভয় করে।
লিফট জানে সে পঁচিশ তলায় যাবে। তার বশংবদ পোকাটা সম্পূর্ণ কোডেড। ওই পোকার কোড বুঝে নিয়ে লিফট নামতে লাগল অনেকটা পতনের মতো দ্রুতবেগে।
তারপর থামল। ক্যাটওয়ে ধরে এসে চলন্ত করিডোরে রাখল সে। নিজের ফ্ল্যাটের সামনে এসে করিডোর থেকে প্ল্যাটফর্মে উঠল।
দরজায় তালা চাবি কিছু নেই। এখানেও কোড। সে দরজার সামনে দাঁড়াতেই দরজা খুলে গেল।
একখানা ছোট বসবার ঘর। একখানা আরও ছোট শোওয়ার ঘর। খেলাঘরের মতো ছোটো একটু রান্নার জায়গা। টয়লেট। কাঁচের শার্সি দিয়ে একটা দেওয়াল তৈরি হয়েছে। পরদার ব্যবস্থা নেই, কিন্তু সুইচ টিপলেই স্বচ্ছ কাঁচ সম্পূর্ণ অস্বচ্ছ হয়ে যায়। ঘরে ঢুকতেই একটা রোবট এগিয়ে এসে তার পোশাক খুলে দিল। পরিয়ে দিল ঘরের সংক্ষিপ্ত পোশাক। চায়ের জল চড়িয়ে দিল রান্নাঘরের আগুনবিহীন উনুনে। আজকাল আগুনের চল নেই। রান্না হয় একটা ইথারিয় কম্পনে।
রিক্তা দু-চুমুক চা খেল। রোবট বাথরুমে গিয়ে টাবে তার জন্য সঠিক তাপমাত্রায় স্নানের জল তৈরি করল। চালু করল গানের ক্যাসেট। তারপর তার গা ম্যাসাজ করে দিতে লাগল। রোবটের হাতে প্যাড লাগানো। ম্যাসাজটা চমৎকার। ম্যাসাজটা নানারকম হয়। সেইভাবে প্রোগ্রাম করে দিতে হয় রোবটকে।
ম্যাসাজের মাঝপথে হঠাৎ প্রোজেক্ট কোনও সঙ্কেত দিল, টুং, দেওয়ালের গায়ে হঠাৎ একটা চৌখুপি আলোকিত হল। একটা মেয়ের মুখ। একে চেনে না রিক্তা।
মেয়েটা তার দিকে চেয়ে হঠাৎ ধমকের স্বরে বলল , আমি কে?
রিক্তা বলল , তার আমি কী জানি! আই ডি–কে জিগ্যেস করো।
আই ডি হল আইডেন্টিটি ডিপার্টমেন্ট। মানুষ একা থাকতে–থাকতে মাঝে-মাঝে একটু নিজেকে হারিয়ে ফেলে। আজকাল প্রায়ই এটা হয়। আই ডি তখন তার পরিচয় ধরিয়ে দেয়।
মেয়েটা রাগের গলায় বলল , ওরা ভুল বলছে।
কী বলছে? বলছে আমি জবা।
তা হলে তাই।
না। আমি জবা নই। আমি পূর্ণা। আমার সেক্টর ফোর। আই ডি বলছে থ্রি। ওরা ভুল বলছে।
ওরা যা বলছে তাই ঠিক। মেনে নাও।
কী করে মানব? আমি তো পূর্ণা।
না, তুমি জবা।
কিছুতেই না। তুমি দেখতে বেশ সুন্দর তো!
রিক্তা জঁ কোঁচকাল, সুন্দর! সুন্দর দিয়ে আজকাল কিছু হয় না।
কেন হবে না? তুমি সুন্দর।
তুমিও সুন্দর। আজকাল সবাই সুন্দর। যারা সুন্দর নয়, তারাও কসমেটিক সার্জারি করে সুন্দর হয়ে যায়।
না, তুমি অন্যরকম সুন্দর। আমার ঘরে আসবে? একাত্তর তলায়, ফ্ল্যাট বি ফোর। চার নম্বর ক্যাটওয়ে।
আমি খুব টায়ার্ড।
আমি যে জবানই, কী মুশকিল!
না হলেও বা। যা-ই হও, কিছু যায় আসে না।
তুমি কে?
আমি রিক্তা।
আমি তোমার কাছে একটু আসতে পারি?
না। আমি ক্লান্ত। আমি এখন স্নান করব। তারপর ঘুমোব।
ঘুমোবে? কী আশ্চর্য, আমি ঘুমুতে পারি না।
ঘুমোনো তো সোজা। স্বপ্ন–পালঙ্কে শুয়ে পড়লেই ঘুম আসবে।
কত শুয়েছি, তবু ঘুমোতে পারি না।
হতেই পারে না। স্বপ্ন পালঙ্ক অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি। ঘুম হবেই।
আমার হয় না।
তাহলে হাসপাতালে যাও।
ভয় করে।
ভয়! ভয় কীসের?
মন্দিরা তো হাসপাতালে গিয়েছিল। ওরা ওকে পাঁচ বছরের জন্য ঘুম পাড়িয়ে দিল। বলল , ওর যা সব নার্ভের কমপ্লিকেশন তা পাঁচশো বছর ঘুমোলে তবে ঠিক হবে।
আমাকেও যদি তাই করে?
করুক না। ভালোই তো।
আমি অতদিন ঘুমোতে চাই না। ওটা তো মৃত্যু। পাঁচশো বছর পর কি আমার মনে থাকবে আমি কে?
তোমার তো এখনও মনে নেই তুমি কে।
আমি পূর্ণা।
আই ডি তো তা বলছে না।
ওরা ভুল বলছে।
রিক্তা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রোবটকে বলল , ফোনটা অফ করে দাও।
ফোনটা অফ হয়ে গেল।
মাঝে-মাঝে সমস্যাটা রিক্তারও হয়। দিনের পর দিন কেউ তার নাম ধরে ডাকে না। কেউ কথা বলে না। মুখের দিকে তাকায় না। তখন মাঝে-মাঝে হঠাৎ মনে হয়, আরে, আমি কে?
রিক্তা স্নান করল। রোবট তার খাবার তৈরি করে সাজিয়ে দিল টেবিলে। একটু স্যুপ, একটু সবজি সেদ্ধ। খাওয়ার পর রিক্তা তার স্বপ্ন–পালঙ্কে শুয়ে পড়ল। ঘুমের আগে দেখে নিল, পোকাটা তার ব্রহ্মতালুর ঠিক দু-ফুট পিছনে ভেসে আছে।
