‘অসুখ আমার সারবে না বাবা। আমি জানি।’ কথাটা বলেই শান্তা আমার দিকে তাকাল। হাসল। আমার বুকের ভিতরটা পাক খাচ্ছে।
‘আমি জানি বাবা, আমি জানি।’ খুব হালকাভাবে একটুও না ভেবে কথাগুলোকে উচ্চারণ করল শান্তা। আমি আমার নিজের মুখটা দেখতে পাচ্ছি না। শান্তা দেখছে। ও হাত বাড়িয়ে আমাকে স্পর্শ করল, ‘বাবা, ডাক্তার সেনের কথাগুলো আমি শুনেছি। আমি নিজেও টের পাই যে, আমি বাঁচব না। তোমাকে আমি দিন–দিন শুকিয়ে যেতে দেখছি, বুড়ো হয়ে যেতে দেখছি। আমার জন্যে ভেবে ভেবেই তোমার এমনটা হচ্ছে। থাক বাবা, তুমি কষ্ট পাচ্ছ। থাক, আমি এই চুপ করলাম। দাও, আমাকে ওষুধ দাও।’
ওষুধ খেতে মুখটা বিকৃত হয়ে গেল ওর। তারপর চুপ করে রইল। এ কামরায় আর কেউ নেই। আমি ডাকলাম, ‘শানু, একটু শুয়ে থাকবি?
ও হাসল, বলল , ‘না।’
‘কার্শিয়াঙে আমাকে রেখে আসতে তোমার কষ্ট হবে বাবা?
আমি চুপ করে রইলাম। শান্তা হাঁটু দুটো বুকের কাছে জড়ো করে নিয়ে সকৌতুকে আমার দিকে তাকাল। ওর চোখ দুটো হাসছে। থিরথিরে, হালকা চপল হাসি। ওর থুতনিটা হাঁটুর ওপর। আমি কথা বলছি না। আমি অন্য দিকে চোখ ফিরিয়ে নিলাম। শান্তা এবার শব্দ করে হাসল, ‘তুমি যে আমাকে এত ভালোবাসো বাবা, অসুখ হওয়ার আগে কিন্তু বুঝতেই পারতাম না।’
এ-কামরায় আর কেউ নেই, থাকলে ওর কথা শুনে সে নিশ্চয়ই হেসে উঠল। আমি ওর দিকে তাকালাম। ওর সুন্দর ঠোঁটে একটা কোমল হাসি প্রজাপতির মতো কাঁপছে। আমি মনে-মনে বলছি, শানু, তুই ওভাবে হাসিস না। তুই ওভাবে হাসলে আমার ভয় করে। তোর হাসির অর্থ আমি বুঝি। তুই সব জেনে গেছিস। তোর অসুখের খবরটা আর তার শেষ পরিণতিটা তোর কাছে লুকোনো নেই। ওরকম হাসি হাসতে তোর কষ্ট হয় না? আমাকে দয়া কর শানু, তুই ঘুমিয়ে পড়। সবকিছু বুঝে কোনও সুখ নেই। সবকিছু বুঝে গেলে শুধু দুঃখ।
‘আমরা এখানে আসবার আগের দিন সুকুমারী শ্বশুরবাড়ি থেকে ফিরল।’ শান্তা আস্তে-আস্তে যেন আপনমনেই বলল , ‘কী মোটাসোটা আর ফরসা হয়েছে সুকুমারী, যেন আর চেনাই যায় না।’
‘সুকুমারী কে?’ আমি প্রশ্ন করলাম।
‘বাঃ রে, কলকাতায় আমাদের পাশের বাড়ির পরেশবাবুর মেয়ে! তুমি সব ভুলে যাও বাবা, সুকুমারী তোমাকে এসে প্রণাম করল না সেদিন।’
‘ওঃ হো, মনে পড়েছে, সেই রানাঘাটে যার বিয়ে হয়েছে, সেই তো?’
‘হ্যাঁ। কিন্তু তুমি তো ওর ছেলেটাকে দ্যাখোনি। কী মোটাসোটা আর সুন্দর ছেলেটা, এক গা গয়না, ঠিক ডল পুতুলের মতো। ছেলেটা খুব হাসে, শুধু হাসেই, কাঁদতে যেন জানেই না। আমার ইচ্ছে করছিল ছেলেটাকে একটু কোলে নিই, কিন্তু–’
আমি তাড়াতাড়ি বললাম, ‘এখন নিশ্চয়ই তোর খিদে পেয়েছে শানু, একটা আপেল কেটে দিই?
শান্তা করুণ চোখে আমার দিকে তাকাল। কথা বলল খুব ক্লান্ত, অবসন্ন কণ্ঠে, ‘না, খিদে পায়নি। খিদে আমার পায় না। বোধহয় জ্বরটা বাড়ছে, জিভটা তেতো–তেতো। আমাকে একটু মৌরি দাও। থার্মোমিটারটা দিয়ে জ্বরটা দেখবে একটু?
‘না,‘ আমি বললাম, ‘না থাক। জ্বর আসছে না নিশ্চয়ই। অনেকক্ষণ বসে আছিস কিনা। এবার একটু শুয়ে থাক।’
শান্তা হাসল। বেড়ালের মতো গুটিসুটি হয়ে শুল। গাড়িটা থামল। আবার চলল। গাড়িটা একঘেয়ে। বাইরে নিস্তব্ধ, নির্জন পাহাড়ের ধূসর অনড় শরীর। শীত আর কুয়াশা। ঠান্ডা বাড়ছে। গাড়িটা ঘুরে-ঘুরে আপনমনে ওপর দিকে উঠছে।
‘বাবা, ছেলেবেলায় আমি খুব পুতুল খেলতে ভালোবাসতাম।’ শান্তা বলছে। যেন স্বপ্নের ঘোরে কথা বলছে ও, ‘তুমি আমাকে কত পুতুল কিনে দিয়েছ যে তার হিসেব নেই। আমার কাঠের বাক্সে পুতুলগুলো সাজানো আছে, কিছু আমি চন্দ্রাকে দিয়ে দিয়েছি। কিন্তু একটা পুতুলের কথা আমার প্রায়ই মনে পড়ে। তুমি জন্মদিনে আমাকে দিয়েছিলেন। পুতুলটা মস্ত বড়, ঠিক সুকুমারীর ছেলেটার মতো বড়। সেই পুতুলটাকে তোমার বোধহয় মনে নেই বাবা?
‘কোন পুতুলটা? শোওয়ার ঘরের আলমারিতে যে ডল–পুতুলটা আছে, সেইটে?’
‘হ্যাঁ, সেইটেই। বড় হয়ে আমি আর পুতুল খেলি না। কিন্তু মাঝে-মাঝে খেলতে ইচ্ছে করে। তোমাকে বলতে লজ্জা নেই, সুকুমারীর ছেলেটাকে আমি আদর করতে পারিনি। কিন্তু তার বদলে সেই পুতুলটাকে নিয়ে আমার বিকেলটা কেটেছিল।’
বাঁ-দিকের পাহাড় মুছে গিয়েছে। ট্রেনটা এখন অনেক ওপরে। পাহাড়গুলো মাথা নীচু করে আছে। কালো মেঘে আকাশ ঢাকা। ধূসর সমতলটা কী বিষণ্ণ! ট্রেনটার গতি শ্লথ। শান্তা আস্তে আস্তে উঠে বসল। ওর মুখের কাছে জানালাটাকে ঘষা কাঁচের মতো অস্বচ্ছ মনে হচ্ছে। ওর নিশ্বাস কাচটার ওপর বারবার একটা বাষ্পের বৃত্ত এঁকে দিয়ে মুছে দিচ্ছে। ওর মুখটা অন্ধকার।
আমার মনে পড়ছে খুব ছোটবেলায় যখন সবেমাত্র একটু-একটু লিখতে শিখছে শান্তা, তখন ওই পুতুলটার কপালে পেনসিল দিয়ে আঁকাবাঁকা অক্ষরে লিখে রেখেছিল–’আমার ছেলে।’ সেই কথাটা এখন আর নেই। বড় হয়ে ও নিজেই সেটা মুছে ফেলেছে। আমার চোখের সামনে পাতলা একটা জলের পরদা দুলছে . কামরাটাকে আঁকাবাঁকা বন্ধুর মনে হচ্ছে। আমি মনে-মনে শান্তাকে যেন বলছি, তোর পুতুলগুলোকে তুই ফেলে এসেছিল, কিন্তু পুতুলখেলাকে ফেলে আসিসনি। শানু, আমরা সবাই অমনিভাবে পুতুল খেলি। তোর পুতুলগুলোকে আমি চিনি। রজতশুভ্র তেমনি পুতুল। তাকে তুই মেরে ফেলেছিস। কলকাতা ছাড়বার পর গাড়িতে তুই গম্ভীর দৃষ্টিতে অ্যালার্ম চেনটাকে দেখেছিলি। ওটা টানলেই গাড়িটা থেমে যাবে। রজতশুভ্র নিজেকে অমনিভাবে থামিয়ে দিয়েছিল, অমনিভাবে চেনটার মতো দুলতে–দুলতে, তোর আঙুলগুলো বেঁকে যাচ্ছিল, তোর মুখটায় জলরঙের কতকগুলো রেখা খেলা করে গেল। আমি জানি, ওরকমই হয়। রজতশুভ্ররা মরবার জন্যেই জন্মায়। রজতশুভ্র আর সুকুমারী–অনেক তফাত। একজনের জন্য প্রেম, আর একজনের জন্য ঘৃণা। একজনকে সাজিয়ে গুছিয়ে আলমারিতে তুলে রাখিস, আর একজনকে তীব্র ঘৃণায় দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিস। কিন্তু তোর ভাগ্য তাকে কুড়িয়ে এনে তোর সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। আলমারির পুতুলটা বারবার চুরি হয়ে যায়।
