হঠাৎ খেয়াল হল, হাপুকে দেখা যাচ্ছে না কোথাও। ভিড়ের মধ্যে এক সেকেন্ড আগেও ওর নীল রঙের শার্টটা আমি দেখেছি। তক্ষুনি সেটা টুপ করে আড়াল হয়ে গেল। হাপু–উ বলে ডাক দিয়ে আমি ছুটে গেলাম….
হ্যাঁ মশাই, আপনারা কেউ দেখেছেন নীল জামা পরা চার বছর বয়সের একটা ছেলেকে? তার নাম হাপু, বড় দুরন্ত ছেলে! দ্যাখেননি? ঝাঁকড়া–ঝাঁকড়া চুল, জ্বলজ্বলে দুটো দুষ্টু চোখ…না, না, ওই পুতুলের দোকানের সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে সে নয়–যদিও অনেকটা একইরকম দেখতে। না, তার চেহারার কোনও বিশেষ কিছু চিহ্ন আমার মনে পড়ছে না-খুবই সাধারণ চেহারা, অনেকটা আমার মতোই। কেবল বলতে পারি যে, তার বয়স চার বছর। আর গায়ে নীল জামা। তা নীল জামা পরা অনেক ছেলে এখানে রয়েছে, চার বছর বয়সেরও অনেক। না মশাই, আমার পক্ষে ঠিকঠাক বলা সম্ভব নয় এত–এই হাজার–হাজার ছেলেমেয়ের মধ্যে ঠিক কোন জন–ঠিক কোন জন আমার হাপু–আর বোধহয় হাপুর পক্ষেও বলা সম্ভব নয় এত জনের মধ্যে কোন জন–ঠিক কোন জন বুঝলেন না, ওর মা-ও একবার ঠিক করতে পারেনি। যদি আপুকে দেখতে পান তবে ওকে একবার দয়া করে বলে দেবেন যে এই যে, আমি–এই আমিই ওর বাবা–। এই আমাকে একটু দেখে রাখুন দয়া করে কাইন্ডলি, ভুলে যাবেন না—
আমার মেয়ের পুতুল
গাড়িটা থেমে আসছে।
আমরা যেন ঘুম থেকে জেগে উঠলাম। এতক্ষণ ক্লান্ত একটানা শব্দের তালে–তালে অলস নাচের ছন্দে গাড়িটা কোমর দোলাচ্ছিল। নাচের ছন্দটা ছড়িয়ে পড়ছিল আমার রক্তের মধ্যে। আমি জেগে ছিলাম। শুধু আমার মনটা নেশার ঘোরে থিতিয়ে যাচ্ছিল।
গাড়িটা থেমে আসছে। শান্তা আমার দিকে তাকাল। অনেকক্ষণ পর ও চোখ মেলল। খুব ক্লান্ত অবসন্ন কণ্ঠে বলল , ‘জানালাটা বন্ধ করে দাও না।’
আমি হাত বাড়িয়ে জানালাটা বন্ধ করে দিয়ে ওর কাছে বসলাম। বললাম, ‘শীত করছে। তোর?
‘না, শীত করছে না। আমি একটু বসব এবার। বাবা, তুমি আমার মুখোমুখি বসছ না কেন!
আমি ওর গায়ে কম্বলটা ভালো করে জড়িয়ে দিতে দিতে একটু হাসলাম। ওর চুলগুলো রুক্ষ লালচে। আমি ওর মাথায় হাত রাখলাম। গরম। উত্তাপটা আমার হাতটাকে কাঁপিয়ে দিল, আমার। বুকটা ধড়াস করে উঠল। আমি ওর মুখোমুখি বসলাম।
‘এটা কী স্টেশন বাবা? গাড়িটা থেমে আসছে যে!’
আমি জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখে বললাম, ‘রংটং।’
‘বাঃ, কী মজার নাম। রংটং, রংটং’ ও টেনে–টেনে বলল , ‘ঠিক যেন মনে হয় ঢং ঢং ঢং ঢং’।
শব্দ হচ্ছে ঢং ঢং। ঘণ্টার শব্দ। নিস্তব্ধ, জংলি স্টেশনটার চারপাশে পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা খেয়ে শব্দটা ফিরে এল। আবার পিছিয়ে গেল। গাড়ি ছাড়বার সংকেত। বিদায়ের সংকেত। শান্তা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমার হাসি পাচ্ছে না। রজতশুভ্রর কথা আমার মনে পড়ছে।
‘কার্সিয়াং আর কতদূর বাবা?’
‘এখনও অনেক দূর।’ আমি আস্তে-আস্তে ভেঙে–ভেঙে বললাম। আমার গলার স্বরটা কাঁপল। জানালায় কাঠের ওপর আমার হাতটা শক্ত। আমি মনে-মনে কথা বলছি। সে-কথা কেউ শুনছে না। আমি মনে-মনে বলছি, শান্তা, তুই ঘুমো। এই স্টেশনগুলোকে পার হয়ে যেতে দেখিস না, এই জঙ্গলকেও না, এই পাহাড়কেও না। বড় বিস্বাদ আজকের দিনটা। তোর জ্বর বেড়েছে। আরও বাড়বে। তুই ঘুমিয়ে পড়। খুব শান্ত ছোট্ট পুতুলের মুখের মতো তোর মুখটা কম্বলের ওপর জেগে থাক। তুই ঘুমিয়ে পড়। আমি জেগে থাকি।
‘লুডোটা একটু বার করো না বাবা। একটু খেলব।’
আমি চমকে উঠলাম। তাকালাম। হাসলাম। শান্তা কাঁচের সার্সির বাইরে তাকিয়ে আছে। আমার হাসিটাকেও ও দেখল না।
আমি উঠে বাস্কেট থেকে লুডোটা বের করলাম। গাড়ির দেওয়ালের আয়নায় আমার ছায়া পড়ল। অতি প্রবীণ একটি মুখ। এই মুখটা আমার। আমি কী আশ্চর্যভাবে বুড়ো হয়ে গিয়েছি। একটা নিশ্বাসকে চেপে রাখি বুকের ভিতর। আমার সতেরো বছরের মেয়ে এই নিশ্বাসটার শব্দ শুনলে চমকে উঠবে। কিন্তু নিশ্বাসটা আছে। প্রতি মুহূর্তেই সেটা বেরিয়ে আসতে চায়। আমি তাকে যত অনুভব করি, তত যন্ত্রণার ছাপ আমার মুখে বার্ধক্যের চাবুক মেরে কতগুলো নতুন রেখা এঁকে দেয়। শান্তার মতো আমিও রজতশুভ্রকে ভুলতে চেষ্টা করি।
আমরা লুডো খেলতে শুরু করেছি। আমি হারছি। শান্তার চোখ দুটো আনন্দে জ্বলজ্বল করছে। ও হাসছে, ‘বাবা, তুমি হেরে যাচ্ছ যে। ওমা, এক ছয়–তিন দিয়ে তুমি আমার গুটিটা খেতে পারতে না?’
আমি কিছু শুনছি না, কিছু দেখছি না। অলস নাচের ছন্দে গাড়িটা কোমর দোলাচ্ছে, টাল খাচ্ছে, বেঁকে যাচ্ছে, আবার সোজা হচ্ছে। শান্তা হাসছে। আমার বুকে নির্জন যন্ত্রণা। একক, অসহনীয়।
‘থাক বাবা, খেলতে ভালো লাগছে না। এসো, একটু গল্প করি।’ শান্তা বলল । ওর মুখটা আমি দেখছি। সুন্দর, কোমল, কিন্তু শুষ্ক। শুধু চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে।
আমি বললাম, ‘কেন, বেশ তো খেলছিলি।’
‘কিন্তু তুমি মন দিয়ে খেলছ না। তার চেয়ে আমাকে গল্প বলো। ভালো গল্প বলো, সুন্দর গল্প, যে গল্প শুনে মন খারাপ হয়ে যায় না।’
আমি একটু হাসলাম, ‘কিন্তু এখন যে তোর ওষুধ খাওয়ার সময় হল শানু।’
‘ওষুধ থাক বাবা। আর ভালো লাগে না ওষুধ খেতে।’
‘কিন্তু যেখানে যাচ্ছ, সেখানে যে তোমাকে আরও নিয়মে থাকতে হবে মা, ছেলেমানুষি করলে অসুখ সারবে কী করে?
