ধোঁয়ার মতো কুয়াশা জানলার কাছে পিঠ ঘষছে। আলো আর অন্ধকার আমাদের ঘিরে–ঘিরে খেলছে। শান্তা আমার দিকে তাকাল।
‘তুমি কাঁদছ বাবা?’
‘না, না তো। ও এমনিই।’
‘আমি তোমাকে কষ্ট দিলাম বাবা? সবাইকেই আমি কষ্ট দিই।’
‘দূর পাগলি!”
শান্তা নিশ্বাস ফেলল। শব্দটা ছোট্ট একটা পাখির মতো ডানা দিয়ে বাতাস তাড়াতে-তাড়াতে আস্তে-আস্তে মিলিয়ে গেল। শান্তা, তোর নিজেকে ঘিরে একটা অদৃশ্য বৃত্ত আছে। সেই বৃত্তের পরিসরে তোর দুঃখটা তোকে ঘিরে–ঘিরে পাখির মতো ওড়ে। তুই নিজের দুঃখে কাঁদিস, তুই নিজের সুখে হাসিস। রজতশুভ্র, সুকুমারী, আমি, আমরা সবাই রংচং–এ পুতুলের মতো সেই অদৃশ্য বৃত্তটার বাইরে থেকে তোকে দেখি। আমাদের জন্যে তোর ক্রোধ, ঘৃণা, প্রেম, স্নেহ কিছুই নেই। আমরা পুতুলের মতো মিথ্যে। তোর কান্নাটা, তোর আনন্দটা তোর আপন। আমরা সবাই এইরকম শানু। আমাদের অনুভূতিগুলো সব একরকম, সব অদ্ভুত।
বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। আকাশের রং ছাইয়ের মতো। সুদীর্ঘ, সরল পাইনের বনে গম্ভীর নির্জনতা। শানু তোর শেষ কথাটা শোনবার জন্য আমি উদগ্রীব হয়ে আছি। তুই কি কাঁদতে ভুলে গেছিস?
‘কার্শিয়াং আর কতদূর বাবা?’
‘এখনও দেরি আছে। এবার কিন্তু তোর কিছু খাওয়া উচিত শানু।’
‘কী দেবে দাও।’ ও ডান হাতটা আমার দিকে প্রসারিত করে দিয়ে ছেলেমানুষের মতো একটু হাসল।
কার্শিয়াং এসে গেল প্রায়। আর দুটো বাঁক ঘুরলেই কার্শিয়াং। আমি অপেক্ষা করে আছি শান্তার সেই কথাটা শোনবার জন্য। ও বলবে, বাবা, আমার বাঁচতে ইচ্ছে করছে। রজতশুভ্র আমার ভালোবাসাটাকে চুরি করে নিয়ে পালিয়ে গেল। শেষ হয়ে গেল। সুকুমারীকে আমি ঘৃণা করি সেই কারণেই। অথচ ওর কী দোষ! রজতশুভ্র মরে গেল, আমি রইলাম। সুকুমারীও বেঁচে রইল, অথচ ওর কিছুই হারাল না। ওর ছেলেটা মোটাসোটা, সুন্দর–ওর মুখের মতো সুন্দর, ওর ভবিষ্যতের মতো সুন্দর। সুকুমারীর সবটুকু দেখবার জন্য আমার বাঁচতে ইচ্ছে করছে। এই তীব্র ইচ্ছাশক্তি আমাকে বাঁচিয়ে তুলবে।
‘শানু, কী দেখছিস?’ ‘যা চোখে পড়ছে তাই। বাবা, আমি সবকিছুকে দেখতে চাই।’
আমি হাসলাম। তারপর চুপিচুপি হাসিটাকে গিলে ফেললাম। আমি অপেক্ষা করে থাকব। কিন্তু শান্তা সেই কথাটা বলবে না। আমি জানি, ও বলবে না। এসব কথা বলতে নেই। কিন্তু আমি
তবু অপেক্ষা করে থাকব।
শানু, তোকে একটা গল্প বলতে ইচ্ছে করছে। জানলার ঠান্ডা কাঁচে গালটা চেপে তুই বাইরের দিকে তাকিয়ে আছিস। তোর চোখে গাম্ভীর্যের গভীরতা। গল্পটা তুই শুনবি না। আমার ইচ্ছে করছে, তবু আমি কোনওদিন তোকে গল্পটা বলব না। শুধু মনে-মনে ভাবব, তুই বড় হয়ে গেছিস। মস্ত বড়। একপাল ছেলেমেয়ে ঘরভতি। সংসারটা উপচে পড়ছে সম্পদের আধিক্যে।
শানু, কার্শিয়াং আর কয়েক মিনিটের পথ। তোর মুখের পাশে জানলার কাঁচে তোর নিশ্বাস বারবার একটা বাষ্পের বৃত্ত এঁকে দিয়ে মুছে দিচ্ছে। তোর মুখটা অন্ধকার। করুণ, গভীর অন্ধকার।
আমি সুমন
আমি জানি ভিনি আমাকে ভালোবাসে। ভালোবাসে বলেই তিনি বারবার আমার কাছে ধরা পড়ে যায়; নাকি ইচ্ছে করেই ধরা দেয় কে জানে। তার সঙ্গে প্রথম দ্যাখা সেই শিশুবয়সে। তখন ও ফ্রক পরে, লালচে আভার এক ঢল চুল আর ঠোঁটের ওপরে বাঁ-ধারে একটা আঁচিল, খুব ফরসারং
–ব্যস, আর কিছু মনে নেই।
প্রথম দিন, পনেরো–ষোলো বছর পর প্রথম দিন ভিনি আমার দিকে তাকালই না। কিংবা তাকিয়ে এক পলকেই সব দেখে এবং জেনে নিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে ভালোমানুষ সেজে গেল নিজের মার সামনে, কে জানে। বসল খাটের ওপর জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে আমার কাছ থেকে অনেক দূরে।
সুমন, এই হচ্ছে ভিনি। ওর মা বললেন, তাঁর চোখেমুখে অহঙ্কার ঝলমল করছিল, আরও অনেক নিঃশব্দ কথা ছিল তাঁর মুখে যা তিনি বললেন না, আমি বুঝে নিলুম–দ্যাখো তো আমার ভিনি কী সুন্দর হয়েছে। দ্যাখো ওর আঙুল, ওর চুল, ওর মুখের ছাঁদ, কথা বলে দ্যাখো কী সুন্দর মিষ্টি ওর গলার স্বর, রাজপুত্রের যুগ্যি আমার ভিনি।
এইসব কথা ভিনির মায়ের মুখে লেখা ছিল কিংবা বলা ছিল। আমি বুঝে নিলুম। সঙ্গে-সঙ্গে মনে-মনে নিজের জন্য লজ্জা হচ্ছিল আমার। আমি তেমন কিছু হলুম না কেন। ভিনির বয়স হয়েছে বিয়ের, তবু কোনওদিন ওর অভিভাবকেরা আমার কথা ভাববে না-আমি বুঝে গেলুম প্রথমদিনের প্রথম কয়েক মিনিটেই। মনে-মনে বললুম–পালা সুমন, মনে-মনে যোগী ঋষি হয়ে যা। ছেলেবেলায় তুই যে সুন্দর ছিলি একথা অনেকেই ভুলে গেছে। এখন কাঠুরের মতো চেহারা তোর, গুন্ডাদের মতো ছোট করে ছাঁটা চুল, মুখের ভাব চোর-চোর, কাঠ হয়ে বসে আছিস।
কতদিন দেখা নেই! ভিনির মা বলে কী করে আমাদের ঠিকানা পেলে?
সেটা আমার গুপ্ত কথা। তাই বললুম না, হেসে এড়িয়ে গেলুম। বুঝলুম ভিনি যে আমাকে তিনটে চিঠি লিখেছিল পরপর তার কথা ওর বাড়ির কেউ জানে না। তার প্রতিটিতেই লেখা ছিল –একবার আসবেন। আপনাকে বড় দরকার আমার। আমারও প্রশ্ন–আমার ঠিকানা ভিনি পেল কোথায়!
দরকারটা আমি বুঝতে পারছিলুম না, কেন না তিনি জানালার বাইরে মুখ ঘুরিয়ে ছিল। অথচ পনেরো–ষোলো বছর পর দেখা, তারও আগে দরকারের চিঠি দেওয়া!
চা খেয়ে আমি উঠে পড়লুম–চলি।
আবার আসবে ত? ভিনির মা বলল –আমরা আর তিন-চার মাস কলকাতায় আছি। উনি রিটায়ার করলেন, হেতমপুরে ওঁদের দেশেই আমাদের বাড়ি তৈরি হচ্ছে, দু-তিনটে ঘরের ছাদ বাকি, ছাদ হলেই আমরা চলে যাব। এর মধ্যেই এসো আবার। মা-বাবা কেমন? বলে হাসলেন–কতদিন ওঁদের দেখি না।
