মা চলে গেল।
নিজেকে ভীষণ বোকা বলে মনে হল জগদীশের। মাকে যেন সে বুঝতেই পারল না। তারপর আস্তে-আস্তে সে অনুভব করল যে, একটা বিরক্তি মেশানো ক্ষোভ আর লজ্জা তার মন জুড়ে বসেছে। তার রাগ হল। ইচ্ছে হল একটা কিছু ছুঁড়ে ভেঙে ফেলে রাগটা মেটায়। তারপর কেমন একটা হতাশায় ভেঙে পড়তে-পড়তে সে টেবিলের ওপর দু-হাত রেখে মুখ গুজল। একবার ইচ্ছে হল এ ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। বারান্দায় কিংবা ও ঘরে। তারপর একটা সঙ্কোচ এল। না, যাওয়া যায় না। একটা যেন অলিখিত অকথিত আইন আছে। সে আইনটা আঙুল উঁচিয়ে বলল , না তুমি যাবে না। সে অনুভব করল, খানিকটা স্বাধীনতা সে হারিয়ে ফেলেছে। বুকটা জ্বালা করছে। আজকের বিকেলটা যেন খুব ভালো হতে গিয়ে খুব খারাপ হয়ে গেল।
জগদীশ ভেবেছিল রত্না চলে গেছে। কতক্ষণ সে ঘুমিয়েছিল তা সে জানে না। খুব বেশিক্ষণ নয় নিশ্চয়ই। পিঠে কিল খেয়ে উঠে দেখল, রত্না। রত্না হাসছে।
পিঠে হাত বোলাতে-বোলাতে জগদীশ বলল ,–মারলি কেন?
–এমনিই।
–হাসছিস কেন?
–এমনিই।
–তোকে মারলে কেমন হয়?
–ইল্লি। মারা এত সোজা!
রত্না ঘুরে দাঁড়াল। রত্না চলে যাবে। দরজাটা খোলা। হারিকেনটা উজ্জ্বলভাবে জ্বলছে। জগদীশের মনে হল রত্নার সঙ্গে কার যেন মিল আছে। ঘুরে দাঁড়ানোর ভঙ্গী আর হাসিটার সঙ্গে কার যেন মিল আছে। কার? কেন জানে! কে জানে কেন শরীরে কাঁটা দিল তার!
–কালকে সকালে আবার আসব আমি। বেবীকে থাকতে বলিস। বলতে-বলতে দরজার চৌকাঠের ওপাশে একটা পা বাড়াল রত্না।
–দাঁড়া, তোকে একটা কথা বলা হয়নি। জগদীশ তাড়াতাড়ি বলল ।
–কী?
–রাখী আর পাখিদের চিনিস?
–হ্যাঁ। কেন?
–তোকে দেখতে ঠিক রাখির মতো লাগছে। কেন যেন হঠাৎ কথাটা বলল জগদীশ তা সে নিজেই বুঝল না।
রত্না বলল , যা।
রত্না লাল হল একটু, যেন খুশি হল। তারপর একটু কী যেন ভেবে নিয়ে বলল –রাখীর বিয়ে, জানিস?
জগদীশ চমকে উঠল। কথা বলল না, বলতে পারল না। রত্না নিজেই আবার বলল ,–এ মাসের সাতাশে।
–তুই কী করে জানলি? জগদীশ অবিশ্বাসের সুরে বলল ।
তার বুকের ওপর দিয়ে খুব ভারী পায়ে কে যেন মাড়িয়ে গেল! বুকটা মোচড় দিল, তারপর শূন্য হয়ে গেল। দম বন্ধ হয়ে আসছিল। খুব জোরে চিৎকার দিতে গিয়েও পারল না সে। সে যেন মরে যাচ্ছে আর মৃত্যুর অসহ্য যন্ত্রণার মধ্যে দিয়েও সে যেন দেখতে পাচ্ছে তার চারপাশে অনেক লোক। তাদের মুখগুলো দেখা যাচ্ছে না। তারা সব অশরীরী মূর্তির মতো নিঃশব্দে তার চারপাশে ঘুরছে ফিরছে, আর চাপা গলায় কথা বলছে। কী এত কথা ওদের। কোথা থেকে যেন মৃদু আর গভীর নীল আলো ঘরটার মধ্যে এসে পড়েছে। ঘরটা ভীষণ ঠান্ডা। কে যেন খুব কাছে এল আর চাপা গলায় তাকে জানাল যে, তার মা-ও মরে গেছে। জগদীশের ভীষণ কান্না পেল। কিন্তু সে কাঁদতে পারছে না। তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। দরজা খুলে কারা যেন ঢুকল একটা দেহকে বহন করে নিয়ে। জগদীশ টের পেল ওই দেহটা তার মার। মা মরে গেছে। ওরা মার দেহটা ঠিক তার পাশেই শুইয়ে রাখল। জগদীশ ভাবল, তার যেন বিশ্বাস হল মা আবার বেঁচে উঠবে। ঠাকুমা যখন। মরে গিয়েছিল তখনও জগদীশ ঠিক এ কথাটাই ভেবেছিল, ঠাকুমা নিশ্চয়ই বেঁচে উঠবে আবার। যেমন করেই হোক। কিন্তু ঠাকুমা বাঁচেনি। তার শিয়রে বসে কারা যেন কাঁদছে। জগদীশ চোখ তুলল। রাখী আর পাখি। আর তার পায়ের কাছে বসে রত্না। ওরা সবাই কাঁদছে। জগদীশ একটুও অবাক হল না। যেন সে এরকমটাই ভেবেছিল। জগদীশের কান্না পাচ্ছে। যেন কাঁদতে পারলেই সব দুঃখ জুড়িয়ে যাবে। কিন্তু কে যেন তার গলাটা চেপে ধরে আছে। কিছুতেই সে কাঁদতে পারছে না। রাখী–পাখি–রত্না তার দিকে তাকিয়ে আছে। ওরা জগদীশকে মরে যেতে দেখছে। জগদীশদাঁতে দাঁত চাপল। সে মরবে না, কিছুতেই না…।
ঘুম ভেঙে তড়বড় করে উঠে বসল জগদীশ। গলা শুকিয়ে কাঠ। বুকটা ধড়ফড় করছে। হ্যারিকেনটা তেমনি জ্বলছে। বইগুলো খোলা। জগদীশ উঠে দাঁড়াল। খুব আশ্বস্ত হয়ে সে অনুভব করল, মা-বাবা–পিন্টু–বেবী সবাই জেগে আছে। বেঁচে আছে। এখনও খাওয়ার ডাক পড়েনি।
মা ডাকছে। জগদীশ উত্তর দিল না। মা এ ঘরে এল,–ওমা, তুই জেগে আছিস। আমি ভাবলাম বুঝি ঘুমিয়ে পড়েছিস। খেতে যাবি না!
–হুঁ।
–আয়, সবাই বসে আছে তোর জন্যে।
–তুমি আমার কাছে এসো একটু।
মা কাছে এল,–কেন রে; শরীর–টরীর খারাপ নয় ত’? জগদীশমাকে ছুঁলো। মাকে খুব ভালো লাগছে। মা বেঁচে আছে। মা হাসছে। জগদীশমার কাঁধে মুখটা গুঁজে দিল,মা, মা, মা, মাগো, মামণি গো।
তার চোখে জল এল হঠাৎ। কেন যে কান্না পাচ্ছে তার, তা সে বুঝতে পারল না। কান্নাটা বুক ছাপিয়ে, গলা ছাড়িয়ে, শিরায় শিরায় আলোড়ন তুলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। গলাটা বুজে আসতে চাইছে।
–কী হল তোর হঠাৎ?
জগদীশ কথা বলতে পারল না। জগদীশ কান্নাটাকে প্রাণপণে চেপে রাখল।
দুপুর। ঘরটা বিশ্রী গরম। ঘর থেকে জগদীশ বাইরে এল। তারপর আস্তে-আস্তে হাঁটতে শুরু করল।
মিত্তিরদের নির্জন পোডড়া ভিটেটা প্রায় নিঃশব্দে ডিঙিয়ে গলিটার ভেতর এসে দাঁড়াল সে। মাটির ওপর বসল দেওয়ালে ঠেস দিয়ে। একটা নরম ঠান্ডা মৃদু বাতাস যেন তাকে আলতোভাবে জড়িয়ে ধরল। খুব ভালো লাগল তার। দুপুরের রোদ্দুরটা চোখ রাঙিয়ে তাকে শাস্তি দিতে চেয়েছিল। গলিটা স্নেহশীলা ঠাকুমার মতো, মায়ের মতো তাকে আগলে নিল। দুপুরটা গলির বাইরে দাঁড়িয়ে শাসাচ্ছে!
