জগদীশ চুপ করে বসে রইল। জগদীশের মনে হল এই দেওয়াল দুটো একদিন ভেঙে পড়বে, কিংবা কেউ এসে ভেঙে ফেলবে। কোন কিছুই চিরকাল থাকে না। থাকবে না। যেদিন এ দেওয়াল দুটো ভেঙে পড়বে সেদিন জগদীশ খুব দুঃখ পাবে, খুব কষ্ট হবে তার। এই দেওয়াল দুটো তাকে অনেকদিন আশ্রয় দিয়েছে, শান্তি দিয়েছে। পোষা কুকুরছানা মরে গেলে সকলের সামনে কাঁদতে না পেরে এইখানে এসে কেঁদেছে ছেলেবেলায়। কতবার ডাঁশা পেয়ারা, কাঁচা আম কিংবা মা-বাবার চোখের বিষ তার ধনুকটা ছেলেবেলায় এইখানে এসে লুকিয়ে রেখেছে সে। কেউ টের পায়নি। এই দেওয়াল দুটো তার বিশ্বস্ত আত্মীয়ের মতো, সমবয়স্ক বন্ধুর মতো তাকে সঙ্গ দিয়েছে। কিন্তু একদিন এই গলিটাও ধ্বংস হয়ে যাবে, মরে যাবে। যেভাবে তার ঠাকুমা মরে গেছে। কেউ বেঁচে থাকবে না। মা, বাবা, বেবী, পিন্টু, রত্না, রাখী, পাখি–এরা সবাই একদিন মরে যাবে। শেষ হয়ে যাবে।
ঠাকুমাকে সে ভয়ংকর ভালোবাসতো। একদিন রাত্রিবেলা কে তাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলল। সবাই কাঁদছিল, জগদীশকে কোলের কাছে টেনে নিয়ে বুকে চেপে ধরে মা কাঁদছিল। জগদীশ ভেবেছিল ওরা বোকার মতো কাঁদছে। আসলে ঠাকুমা বেঁচে উঠবেই। ঠাকুমা কি মরে যেতে পারে? দূর তাই কখনও হয়! ঠাকুমার ফিরে আসার অপেক্ষায় জগদীশ অনেকদিন উৎকণ্ঠ হয়েছিল।
কেন যে এমন হয়! ঠাকুমা মরে যায়, রাখী–পাখিদের বিয়ে হয়ে যায়, দেওয়ালগুলো ভেঙে পড়ে।
অস্পষ্ট ধোঁয়া ধোঁয়া অনুভূতির সঙ্গে সিরসিরে বাতাসের মতো কিছু যেন একটা বুঝতে পারল জগদীশ। যেন বুঝতে পারল এগুলোকে হতেই হয়। রত্না–রাখী–পাখিরা একদিন বড় হবে তারপর বড় হতে-হতে একদিন ঠাকুমার মতো বুড়ি হয়ে একদিন মরে যাবে। মনে হতেই যেন কেমন। খারাপ লাগল তার।
গলিটা শূন্য। জগদীশের মনে হল তার চারদিকের জগৎটা যেন একটা খোলস ছাড়িয়ে আস্তে-আস্তে নতুন হয়ে তার চোখের সামনে ফুটে উঠছে। চোখ বুজে সে দেখতে পাচ্ছে পুরোনো পৃথিবীটা যেন দূরে-দূরে সরে যেতে-যেতে তার দিকে বিষণ্ণ চোখে তাকিয়ে আছে। জগদীশের ঘুম পেল।
সে যেন সেই গির্জাটার ভেতরে বসে আছে। সামনে মোমবাতি–জ্বলা বেদি। খুব কাছে থেকে সেই মেয়েটি তার কানে-কানে প্রার্থনা মন্ত্র বলে দিচ্ছে। আজ তার আর ঘুম আসছে না। সে মেয়েটির দিকে তাকাল। মেয়েটি রত্না! না, রত্না নয়, বোধ হয় রাখী। হ্যাঁ, রাখীই, যার বিয়ে হবে যাবে এ মাসের সাতাশে। জগদীশের দুঃখ হল। মেয়েটি হাসছে। হাসতেই মেয়েটার মুখটা যেন তার মায়ের মতো হয়ে গেল। জগদীশ আশ্চর্য হয়ে দেখল মেয়েটির মুখে রত্না–রাখী–পাখি আর তার মা–সকলেরই মুখের আদল যেন আছে। সবাই মিলে যেন এই মেয়েটি।
মেয়েটি আরও কাছে এল। তাকে চুল। জগদীশ চমকে উঠল। তার চোখের সামনে থেকে একটা মস্ত পরদা যেন হঠাৎ সরে গেল। তখন রাখী, পাখি আর রত্নাদের সব রহস্য যেন তার জানা হয়ে গেছে। এখন যেন অনেক–অনেক কিছু, জগদীশ যা এতদিন বুঝতে পারত না, তা যেন বুঝতে পারছে। জগদীশকে ভেঙে ধ্বংস করে আবার যেন কে তাকে বাঁচিয়ে তুলছে।
জগদীশ জেগে উঠল। প্রবল যন্ত্রণার মতো একটা কান্না তার বুক থেকে উঠে আসছে। এই কান্নাটাকে জগদীশ এতদিন চেপে রেখেছিল। ইটের খাঁজে হাত দুটোকে চেপে ধরল সে। ঝুর ঝুর করে বালি পড়ল। বালি পড়তেই লাগল,–জগদীশের মাথায়, গায়ে, চোখে।
জগদীশ ফুলে-ফুলে কাঁদতে লাগল। সেই কান্নার মধ্যে খুব সামান্য, ছুঁচের মুখের মতো ছোট্ট একটা সুখ ছিল।
দুপুরটা ঘন হয়ে তার রক্তের মধ্যে জ্বলতে লাগল।
পেঁপেসেদ্ধ
যারা টিফিনে পেঁপেসেদ্ধ খায় আমি তাদের খুবই শ্রদ্ধা করি।
কেন মশাই, যারা পেঁপেসেদ্ধ খায় তাদের শ্রদ্ধা করার কী আছে?
যারা এভারেস্টে ওঠে, বানজি জাম্প দেয় বা ট্রাপিজের খেলা দেখায় তাদের প্রতি কি আমাদের শ্রদ্ধা হয় না? আমি যা পারি না তা আর একজন যখন অনায়াসে পারে তখন শ্রদ্ধাকে। ঠেকানো মুশকিল।
আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে আপনি পেঁপেসেদ্ধ পছন্দ করেন না।
আমি পেঁপেকে শ্রদ্ধা করি, যে খায় তাকেও শ্রদ্ধা করি।
বুঝেছি মশাই, আপনার কথার মধ্যে একটা প্যাঁচ আছে। প্রচ্ছন্ন বিদ্রূপ এবং চোরা ব্যঙ্গ। আমি পেঁপেসেদ্ধ খাচ্ছি বলে আপনার অসুবিধে হচ্ছে না তো!
না। মানুষকে খেতে দেখলে আমার বড় ভালো লাগে। পার্কের ওই দক্ষিণ কোণের ফুটপাথে দেখবেন দুপুরে পশ্চিমিরা পেতলের থালায় ছাতু মেখে খায়। আমি সুযোগ পেলেই দাঁড়িয়ে তাদের খাওয়া দেখি। কিংবা ধরুন অফিস পাড়ায় টিফিনের সময় বাবুরা যে রাস্তায় চাউমিন, রোল বা ঘুঘনি দিয়ে রুটি সাঁটে সেই দৃশ্যটাও কিন্তু ভারী সুন্দর। তারপর ধরুন, সুন্দরী মেয়েরা যখন আকাশমুখো হয়ে হাঁয়ের মধ্যে জলভরা ফুচকা ফেলে তখন সেই দৃশ্য দেখে আমার বড় আনন্দ হয়। মানুষ খাচ্ছে, তাদের পেট ভরছে, তৃপ্তি হচ্ছে এ তো অতি সুন্দর ঘটনা। আপনি যে এই নিরিবিলিতে দুপুরের পার্কে গাছের ছায়ায় বসে পেঁপেসেদ্ধ খাচ্ছেন এরও সুষমা আছে।
পেঁপে সম্পর্কে আপনার বিরূপ ধারণা থাকতেই পারে, কিন্তু একথা স্বীকার না করে উপায় নেই যে, পেঁপের মধ্যে প্রচুর ভিটামিন, খনিজ এবং হজমের সহায়ক উপাদান আছে। তাই নয় কি?
