রত্না চলে গেল না। দাঁড়িয়ে রইল। অনেকক্ষণ। জগদীশ অবাক হলেও কথা বলল না। রত্না ওর বেণী দুটো নিয়ে নাড়া চাড়া করল কিছুক্ষণ। তারপর হাসল। সেই অদ্ভুত হাসিটা যেন অনেক কথা ওই হাসিটার ভেতর বলা থাকে, কিন্তু সেগুলো যে কি তা জগদীশ বুঝতে পারে না। জগদীশ চুপ করে রইল।
–কীরে কথা বলছিস না যে! রত্না বলল ।
–এমনিই।
–ইস এমনি বইকি! নিশ্চয়ই তুই—
রত্নার চোখের দিকে এবার স্পষ্ট করে তাকাল জগদীশ। রত্না যেন ভীষণ অবাক হয়েছে। খুব বড়-বড় চোখে তার দিকে তাকিয়ে সেই অদ্ভুত হাসিটা হাসছে রত্না। অবাক হওয়ার সঙ্গে সব বুঝে ফেলেছি ধরনের একটা ভাব। জগদীশ ভাবল, বোধহয় রত্না আশা করেছিল যে সে রেগে যাবে। রেগে গিয়ে ঠিক আগের মতোই ওর বেণী ধরে টেনে কিংবা হাত মুচড়ে দিয়ে কিংবা চড় মেরে শোধ নেবে জগদীশ। কিন্তু তা করেনি বলেই যেন অবাক হয়েছে ও। কিন্তু ওতো জানে না ওকে আজ কতো বড় আর অস্পষ্ট দুর্বোধ্য মনে হচ্ছে।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে রত্না বলল , বোকার মতো মুখ করে বসে আছিস কেন?
জগদীশ চুপ করে রইল। রত্না এগিয়ে এল আর তারপর জগদীশের চেয়ারের মুখোমুখি খাটের একপাশে খুব সন্তর্পণে বসল।
ইস, রাগ হয়েছে বাবুর। রত্না আবার বলল । জগদীশ খুব স্পষ্টভাবে একটা সুগন্ধ পেল। পাউডার স্নো আর বোধহয় তেলের গন্ধ। গন্ধটা চেনা। তবু যেন জগদীশ অস্বস্তি বোধ করল। কেমন যেন সঙ্কোচে জড়সড়ো হয়ে বসল সে। রত্নাটা এত কাছাকাছি এসে বসেছে যে ওর দিকে ভালো করে তাকাতে পারছে না জগদীশ।
যেন খুব গোপন একটা কথা কানে-কানে বলবে এইভাবে মুখটা জগদীশের কাছে এগিয়ে আনল রত্না। রত্নার মুখটা খুব কাছাকাছি যেন তাকে ছোঁয়–ছোঁয়। জগদীশ একটা ঠান্ডা ভয়কে তার মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে যেতে অনুভব করল। কেমন জ্বালা করল বুকটা। বুকটা জ্বালা করল আর কাঁপতে লাগল। রত্নার মুখটা হাসি-হাসি। রত্না বলল –এই, একটা কথা বলবি?
নিজের মুখটা দূরে সরিয়ে নেওয়ার জন্য একটু পেছন দিকে হেলে জগদীশ প্রায় অস্ফুট স্বরে বলল –কী?
রত্না বলল কাছে আয় না, অমন হেলছিস কেন?
হারিকেনটা বড় বেশি উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছে। জগদীশ ভাবল। আলোটা আরও কম হলে–আরও কম হলে কী যে হত সে ভেবে পেল না। রত্নার মুখটা লাল–লাল। যেন কী একটা কথা নিয়ে মনে-মনেই ও লজ্জা পাচ্ছে। জগদীশ সামনের দিকে সামান্য একটু ঝুঁকল! প্রায় কাঁপা গলায় বলল –কী বলছিস বল না।
–ঠিক বলবি তো?
–হ্যাঁ।
–আজকে–আজকে আমায় কী রকম দেখাচ্ছে রে!
জগদীশের হঠাৎ হেসে উঠতে ইচ্ছে করল। খুব জোরে। হাসিটাকে সে বুকের ভেতর অনুভবও করল, কিন্তু কিছুতেই সেটা ঠোঁটে এলো না। হাসিটা বুকের ভেতরই কাঁপতে-কাঁপতে মরে গেল। জগদীশ উজ্জ্বল চোখে রত্নার দিকে তাকাল। যেন রত্না তাকে অনেক সম্মান দিয়েছে। এই যেন প্রথম নিজের মূল্য বুঝতে পারল জগদীশ। জগদীশ খুশি হল। সঙ্গে-সঙ্গে তার মনে হল –রত্নাটা কী ছেলেমানুষ!
কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল জগদীশ। বারান্দায় পায়ের শব্দ। মা আসছে। মার পায়ের শব্দটা জগদীশের চেনা। একটু যেন চমকে উঠল জগদীশ। অথচ চমকানোর কোনও দারকারই ছিল না, কেন না সে এমন কিছু করছে না যে–। মনে-মনে তার নিজের ওপর রাগ হল। সে কিছুই বলল না রত্নাকে।
–একী, রত্না কখন এলি? ঘরের দরজা থেকেই মা জিগ্যেস করল।
–এই মাত্র। রত্নর উত্তর।
কী মিথ্যুক–জগদীশ মনে-মনে ভাবল। মিথ্যে কথা বলবার কোনও দরকার ছিল কি রত্নার! ও তো অনেকক্ষণ এসেছে;–সেকথা বললেই বা কী হত।
মা ঘরে এল। হাতে এক রাশ ধোয়া শুকনো জামাকাপড়। সেগুলো আলনায় ভাঁজ করে রাখবার জন্য এগিয়ে যেতে-যেতেই মা রত্নাকে বলল –তুই ও ঘরে যা, আমি আসছি।
রত্না চলে গেল। যাওয়ার সময় দরজা থেকে ঘুরে জগদীশের দিকে তাকাল। ওর তাকানোর মধ্যে একটু হাসি ছিল। জগদীশ ভাবল।
মার মুখটা গম্ভীর, রাগ–রাগ। রোজ এই সময়টাতে যেন মাকে ভীষণ রাগি আর গম্ভীর বলে মনে হয়। যেন একটু ছুঁতে গেলেই মা ধমকে দেবে। বিকেলবেলা গা ধুয়েছে মা। সাবানের মৃদু গন্ধ। খোঁপাটা পরিপাটি করে বাঁধা, পরনের শাড়িটা ধপধপে পরিষ্কার। এইরকম সাজপোশাকে মাকে যেন ভালো লাগে না, যেন মা–মা মনেই হয় না। যেন অন্য বাড়ি থেকে কোনও ভদ্রমহিলা বেড়াতে এসেছে। কাজ করতে-করতে যখন মার চুল এলোমেলো হয়ে যায়, কাপড়টা নোংরা আর হলুদের ছোপধরা হয়, আর মুখে ঘাম জবজব করতে থাকে, তখন যেন মাকে ভীষণ ভালো লাগে, আদর করতে ইচ্ছে হয়। বারবার মনে হয় মার বোধহয় খুব কষ্ট হচ্ছে কাজ করতে। বোধহয় মা’র কষ্টের জন্যেই তখন মাকে অত ভালো লাগে।
মা জগদীশের দিকে তাকাল। বলল ,–তুই পড় না। রাতদিন বসে-বসে কী যে ভাবিস ছাইভস্ম।
–মা, তুমি আমার কাছে একটু বসবে? জগদীশ বলল ।
–কেন রে!
–এমনিই। ভালো লাগছেনা। বোলোনা।
–বসবো কী করে, ও ঘরে রত্না বসে আছে একা-একা।
–কেন, বেবী আসেনি?
–কোথায়, দেখছি না তো। তার তো আড্ডার শেষ নেই।
–তাহলে রত্নাকেও এই ঘরে ডাকো।
মা কেমন যেন অদ্ভুতভাবে তাকাল আমার দিকে। যেন হঠাৎ আমাকে নতুন করে দেখছে মা। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না, তবুও জগদীশের মনে হল মার মুখটা যেন বদলে গেল। মা খুব গম্ভীর হল। মা খুব আস্তে বলল ,–না। তুমি পড়ো।
