কী বিষণ্ণ এই ছবি! জগদীশ ভাবল। ছবিটাকে তার ভালো লাগে না। কিন্তু ছবিটা আছে। থাকবে। কতদিন থাকবে কে জানে! হয়তো আজীবন। জগদীশ জানে না। সন্ধেবেলা বাতি না জ্বালিয়ে পড়ার ঘরে একা-একা বসে থাকলে এই ছবিটাকে মনে পড়ে। মনটা বিষণ্ণ উদাস হয়ে যায়। ছবিটা কখনওই সত্যি হয়ে আসবে না জগদীশ সেটা বুঝতে পেরেছে বড় হয়ে।
এই গলিটা অনেক পুরোনো কথাকে মনে করিয়ে দেয়। বোধহয় ভিজে মাটি আর শ্যাওলার ভারী গন্ধ আর পলেস্তারা খসে যাওয়া পুরোনো দেওয়ালগুলোর জন্যই ওরকম হয়। এখানে এসে বসলেই মনে হয় যেন এখানে সে আর নেই, সে যেন অনেক পুরোনো দিনগুলোয় ফিরে গেছে। এই দেওয়ালগুলোর যদি প্রাণ থাকত কিংবা প্রাণ আছে একথা যদি জগদীশ বিশ্বাস করতে পারত তবে বেশ হত। ছেলেবেলায় সে যখন প্রথম পড়েছিল যে উদ্ভিদের প্রাণ আছে তখন কথাটা তার ভালো লেগেছিল। ঠাকুমাকে বলতেই ঠাকুমা বলেছিলেন শুধু উদ্ভিদ কেন পাথর। পাহাড় নুড়ি, এ সব কিছুরই প্রাণ আছে, সুখ-দুঃখ আছে, ভালোমন্দের অনুভূতি আছে। ঠাকুমার কথাটা তার বিশ্বাস হয়েছিল। অনেক বাধা পেয়ে, ঘা খেয়েও সেই বিশ্বাসটা মনের কোণে তলিয়ে থিতিয়ে অনেকদিন পর্যন্ত বেঁচে ছিল। তারপর আস্তে-আস্তে কেমন করে সে নিজেই জানে না সেই বিশ্বাসটা হারিয়ে গেল। ঠাকুমারা মরে গেলেই কিংবা হয়তো বয়স বাড়লেই এই অদ্ভুত বিশ্বাসগুলো ভেঙে যায়। কিন্তু এই বিশ্বাসগুলো যখন ভেঙে যায় তখন ভালো লাগে না, মন খারাপ লাগে। যেন অনেক দিনের পুরোনো বন্ধুরা আমাদের ছেড়ে যাচ্ছে এরকম মনে হয়। মন তখন যেন চায় এই বিশ্বাসগুলো আবার চুপিচুপি ফিরে আসুক। সে বিশ্বাস করতে পারুক যে এই দেওয়ালগুলো, এই মাটি, ওই মিত্তিরদের ভাঙা পোডড়া বাড়িটার ভেতরেও প্রাণ আছে। ওদেরও যেন প্রিয়জন আছে যারা চলে গেলে ওরা দুঃখ পায়। সেই প্রিয়জনদের কথা ওরা জগদীশকে বলুক।…এই কথাগুলো ভাবতে-ভাবতেই যেন জগদীশনিজের কাছে নিজেই লজ্জা পেল। ছটফট করে উঠে দাঁড়াল। বিকেল হয়ে আসছে এক্ষুনি মাঠে যেতে হবে। দল বেঁধে তাকে খুঁজতে এসে বোধহয় ফিরে গেছে বন্ধুর দল।
.
সন্ধ্যাবেলা রত্না এল। রত্না বেবীর চেয়ে একটু বড় আর জগদীশের চেয়ে দু-এক বছরের ছোট। কাছাকাছি বাড়ি, কিন্তু রত্না যে রোজ আসে তা নয়। কেন যে আসে না তা জগদীশ জানে না। আগে কিন্তু আসত।
হারিকেনটা উজ্জ্বলভাবে জ্বলছিল। রত্নাকে শাড়ি পরতে এর আগে দেখেনি জগদীশ। নীল রঙের ফ্রকটাকে ব্লাউজের মতো নীচে পরেছে, তার ওপর নীল শাড়ি। চেনা রত্নাকে অচেনা মনে। হচ্ছে।
এই, বেবী কোথায় রে? রত্না জিগ্যেস করল। খুব ভালো করে জগদীশের দিকে না তাকিয়েই জিগ্যেস করল। ওর মুখটা লাল লাল। গলার স্বরটা ক্ষীণ। লজ্জার সুরে কাঁপল, তারপর কাঁপতে কাঁপতে বাতাসের শরীরের সঙ্গে মিশে গেল এবং তারপরেও যেন কাঁপতে লাগল।
–কেন, বেবীকে দিয়ে কী হবে? জগদীশ অনেকক্ষণ পরে বলল ।
–তা দিয়ে তোর দরকার কী! ভারী সর্দার হয়েছিস আজকাল।
–হয়েছিই তো। জগদীশ হেসে-হেসেই বলল ।
–থাক, তোকে বলতে হবে না। আমি মাসিমার কাছে যাচ্ছি।
–না, মাও জানে না বেবী কোথায় আছে। শেষ কথাটা কানে নিল না রত্না। রত্না ঘুরে দাঁড়াল। দরজার দিকে। এক পা এগোল। জগদীশ কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। একটা কিছু করা দরকার না হলে ও চলে যাবে।
জগদীশ বলল ,–দাঁড়া, এইখানে বোস। আমি বেবীকে খুঁজে আনছি।
–ইশ। দাঁড়াব না, আমাকে মীরাদের বাড়ি যেতে হবে।
–বুঝতে পেরেছি, শাড়িটা দেখাতেই এসেছিলি, বেবীকে খুঁজতে নয়।
রত্না শরীরটাতে একটা মোচড় দিল। ঘুরে একটু রুখে দাঁড়ানো ভঙ্গিতে মাথাটা সোজা করে চোখের কোণ দিয়ে জগদীশের দিকে তাকাল। এই ভঙ্গিটা তার চেনা। ছেলেবেলায় খেলতে খেলতে রেগে গেলে জগদীশের দিকে অমনি ভাবে রুখে দাঁড়াত রত্না। ভঙ্গিটা দেখে জগদীশ বরাবর হয়তো, ভয় পেত না।…কিন্তু আজ রত্নাকে অচেনা মনে হচ্ছে। যেন নতুন কোনও মেয়ের সঙ্গে এই প্রথম আলাপ হচ্ছে তার। জগদীশ ভয় পেল যেন। বুকের কাছটা একটু কাঁপল। দৃষ্টিটা পিছলে নামল যেখানে শার্টিনের নীল রঙের ফ্রকটা বুকের কাছে সামান্য একটু টাল খেয়েছে। শাড়ির ওপর থেকেও বোঝা যায়। জগদীশ মেঝের দিকে তাকাল।
জগদীশ চোখ না তুলেও বুঝতে পারল রত্না হাসছে। খুব মৃদু সে হাসিটা। হাসিটা অদ্ভুত যেন অনেক কথা ওই হাসিটার ভেতর বলা থাকে কিন্তু সেগুলো যে কি তা জগদীশ বুঝতে পারে না। রত্নার পায়ের শব্দটা এগিয়ে এল। জগদীশমুখ তুলল।
রত্না হাসছেনা। রত্না ভীষণ গম্ভীর।
জগদীশ তাকাল। তাকিয়ে রইল।
রত্না বলল ,লজ্জা করল না ও কথা বলতে? বাঁদর কোথাকার!
জগদীশ ভীষণ অবাক হল। হঠাৎ কোথা থেকে এত সাহস পেল রত্না। জগদীশের হাত দুটো নিসপিস করে উঠল। দাঁতে দাঁত চাপল জগদীশ। আর একটা কিছু বললেই…। কিন্তু তবু কেন। যেন মনে হচ্ছে রত্না তার চেয়ে ঢের-ঢের বড় হয়ে গেছে। যেন রত্নার কাছে সত্যিই সে ছেলেমানুষ। ও এত বড় হয়ে গেল কেমন করে? নিজেকে খুব অসহায় লাগল তার। কিছু একটা করতে হবে ভেবেও সে চুপ করে বসে রইল। না, রত্নার গায়ে হাত দেওয়া যায় না। ওকে অনেক বড় মনে হচ্ছে। বড় মেয়েদের গায়ে হাত দিতে নেই। ওর বেণী দুটো সামনের দিকে ছাড়া রয়েছে। ইচ্ছে করলে জগদীশ ওই বেণী দুটোতে হ্যাঁচকা টান দিয়ে ওকে শিক্ষা দিতে পারত। কিন্তু কেন যেন জগদীশের ইচ্ছে হল না।
