বাঁ-পাশে বাবা, ডান পাশে মিন্টু, বেবী সামনে, জলচৌকির ওপর মা বসে। একটা হারিকেন মেঝেতে রাখা। কালি পড়ে হারিকেনটা আবছা হয়ে এসেছে বলে কিংবা সদ্য ঘুম থেকে উঠে এসেছে বলে কারুর মুখ ভালো করে দেখতে পাচ্ছে না জগদীশ। রান্নাঘরের দেওয়ালে তাদের মস্ত মস্ত ছায়াগুলো দুলছে, কাঁপছে। জগদীশের মনে হল যেন তারা সবাই বাবা, সে, পিন্টু, বেবী, সানাই মাকে ঘিরে বসেছে একটা গল্প শুনবে বলে। তারা সবাই উদগ্রীব হয়ে আছে মা গল্পটা বলতে-বলতে হঠাৎ থেমেছে–এক্ষুনি শুরু করবে।
জিভে কোন স্বাদ পাচ্ছে না সে। পাতে ক’টা তরকারি, তাও যেন গুনতে ইচ্ছে করছে না। বিশ্রী লাগছে।
–আর দুটি ভাত দেব তোকে? মা বলল ।
–না, খিদে নেই।
–বাইরে থেকে কী সমস্ত ছাইপাঁশ খেয়ে আসিস, রাতে তাই খেতে পারিস না।
পিঁড়িটা ঠিকমতো মেঝেতে বসেনি। ঠকঠক করে শব্দ হচ্ছে। সামনের দিকে ঝুঁকে ভাত তুলতে গেলে শব্দ হচ্ছে ঠক, পেছন দিকে হেলে মুখের গ্রাসটাকে গিলতে গেলে ঠকঠক, ঠুক ঠাক ঠুক…
–শান্ত হয়ে বসে খেতে পারো না? বাবার গলাটা ভারী আর গম্ভীর। পোড়ো কেরোসিনের গন্ধটা বিশ্রী লাগল জগদীশের। সে খাওয়া বন্ধ করল। পিন্টু বেবীকে কি যেন ফিসফিস করে বলল । বেবী শব্দ করে হাসল। ওরা এত রাত পর্যন্ত জেগে আছে কী করে–জগদীশ ভাবল।
.
ভাত খেয়ে উঠবার পর ঘুমটা যেন কোথায় পালিয়ে যায়। আর যেন ঘুম আসবে না। অথচ শুতে হবে, রাত জাগা চলবে না। নরম বিছানা, সাদা চাদর। জগদীশ হারিকেনের কল ঘুরিয়ে সলতেটাকে কমিয়ে দেয়। ঘরটা প্রায় অন্ধকার।
এই ঘরে যেন একটা উৎসবের গন্ধ লেগে আছে। যেন অনেকদিন আগে এইখানে এক বিত্তশালী সুখী পরিবার থেকে গেছে। বাইরে অন্ধকার জমাট। এপাশে–ওপাশে বাড়িগুলো নিঃশব্দ হয়ে গেছে। আর ঠিক এই সময়ে হালকা তন্দ্রার মধ্যে অস্পষ্টভাবে জগদীশের মনে হয়, এইখানে সে অনেকদিন আগে একবার এসেছিল। বাড়িটা বেশ বড়। প্রত্যেক ঘরের ছাদে আর দেওয়ালে পুরোনো আমলের অদ্ভুত সব নকশা কাটা। আগের দিনের বড়লোকদের বাড়ির মতোই। এখন এত বড় বাড়িটায় তারা কয়েকজন মাত্র মানুষ–পুরো বাড়িটা যেন খাঁ–খাঁ করে। কিন্তু অনেক বছর আগে এখানে একটা মস্ত পরিবার থাকত। অনেক টাকা ছিল তাদের আর অনেকগুলো ছেলেমেয়ে। ছেলেমেয়েগুলো হাসিখুশি মোটাসোটা ছিল! মেয়েগুলো ছিল খুব সুন্দরী। খুব ফরসা, গোলগাল, লম্বাটে ডিমের মতো মুখ, একটু পুরু লাল ঠোঁট, অসাবধানে এসে পড়া একটু লালচে আভার চুলগুলো তাদের সাদা কপালের ওপর খেলা করত।…ভাবতে-ভাবতে হঠাৎ এক সময়ে থামে জগদীশ। ঠিক এরকম মেয়ে যেন সে কোথায় দেখেছে। কোথায় দেখেছে যেন। হ্যাঁ, মনে পড়েছে। রাখী আর পাখি। রথতলার মেলার মাঠটা ছাড়িয়ে যেতে সেই নিঃশব্দ প্রকাণ্ড জমিদার বাড়িটাকে তারা বহুবার সবিস্ময়ে দেখেছে। রাখী আর পাখি ও বাড়ির মেয়ে। ওরা। বড়লোক, গাড়ি করে স্কুলে আসে। বেবী স্কুলে ভরতি হওয়ার পর বহুবার রাখী আর পাখির গল্প তাদের সবাইকে শুনিয়েছে। ওরা আজে বাজে মেয়ের সঙ্গে মেশে না, রোজ টিফিনে বাড়ি থেকে চাকর ওদের খাবার নিয়ে আসে, প্রত্যেকবার ছুটিতে ওরা বাইরে বেড়াতে যায় রিজার্ভ করা। গাড়িতে। এমনি আরও কত কী। বেবীটা বাড়িয়ে বলে, সত্যিই কি আর ওদের অত দেমাক! জগদীশ তো দেখেছে ওদের।
রোদটা সোজা হয়ে নেমেছে। ভেতরকার ছায়া ছায়া অন্ধকার আর নেই–গলিটাকে এখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। উঁচু হয়ে থাকা ইটগুলোর খাঁজে–খাঁজে ছায়া আলো দিয়ে তৈরি অদ্ভুত নকশা। বাইরে এখন গরম ধুলো ওড়া বাতাসের ঝাঁপটা, কিন্তু এই গলিটার ভেতরটা ঠান্ডা। দেওয়াল দুটো দু-ধারে অনেক উঁচু। বাতাস ঢুকতে পারে না এই গলিটায়, তাই বোধহয় ঠান্ডা। পায়ের নীচে মাটিটা স্যাঁতস্যাঁতে। এখন এই গলিটাকে ঠিক গির্জার মতো দেখাচ্ছে। গির্জার মতো। পবিত্র, শান্ত ঠান্ডা। গির্জার মতো মস্ত বড় আর উজ্জ্বল। ধারে কাছে কেউ নেই। কেউ আসে না। জগদীশ মাটির ওপর বসল দেওয়ালে ঠেস দিয়ে। একটা ইঁদুর অত্যন্ত দ্রুত গতিতে কোথা থেকে যেন ছুটে এল। কয়েক সেকেন্ড দাঁড়াল তারপর চকচকে সরু লেজটাকে বর্শার ফলার মতো পেছনের দিকে উঁচিয়ে রেখে খুব তাড়াতাড়ি চলে গেল। ইঁদুরটা বেশ আছে জগদীশ ভাবল।
এখন ভরদুপুর। ওপর দিকে তাকালে দেখা যায় আকাশটা জ্বলছে। দুপুরটা ঝিমঝিম করছে চারধারে। জগদীশ ভাবল তার ঘুম পাচ্ছে, নেশার মতো ঘুম। আচ্ছন্ন বা। সে যেন একা। ভীষণ একা। দেওয়ালে অনেকগুলো শুয়োপোকা জড়াজড়ি করে আছে। জগদীশ তাকিয়ে রইল। বহু পুরোনো একটা ছবিকে তার মনে পড়ছে। যখন আরও ছোট ছিল সে তখন এই ছবিটাকে সে বোধহয় মনে মনে তৈরি করে নিয়েছিল। ঠিক ছবি নয়–খানিকটা কল্পনা আর খানিকটা স্বপ্নের। মিশেল। তার চারদিকের এখানকার চেহারাটা সেই পুরোনো ছবিটাকে তার মনে জাগিয়ে তুলছে। একটা অস্পষ্ট, গম্ভীর অথচ স্থির ছবি। একটি মেয়ে, তার লাল চুল, নীল চোখ, বাদামি ঠোঁট। আর একটা গির্জার অভ্যন্তর, লম্বা জানলা, গোল খিলান, কাঁচের শার্সি মোমবাতি। সে যেন হাঁটু গেড়ে মোমবাতি–জ্বলা বেদিটার সামনে বসে আছে। মেয়েটি তার কানে কানে খুব কাছ থেকে প্রার্থনার মন্ত্র বলে দিচ্ছে। সে তার গায়ের মিষ্টি কোমল গন্ধ পাচ্ছে। ঘুমে তার চোখ দুলে আসছে। মেয়েটা গানের সুরের মতো কথা বলছে। আরও। কী বলছে ও? আর কেনই বা বলছে! কাঁচের শার্সিটার বাইরে শেষ বেলার সূর্য ডুবে যাওয়া ম্লান ছাই ছাই আলো। জগদীশ চাইছে মেয়েটা আরও কাছে আসুক। সে তাকে স্পর্শ করুক।
