নিশুতরাতে এসেছিল এক ডাকপিয়োন। আমার সারাজীবনের সব স্মৃতি ফিরিয়ে দিয়ে গেছে। বোধহয় আমার আর কোনও চিঠি আসবে না। আমি যেন ঠিক মোহনার কাছে পৌঁছনো এক নদী, যার স্রোতের আর কোনও ঢল নেই। সামনে মহাসমুদ্র।
আমি মুন্নির জন্য অপেক্ষা করি। কিন্তু আমার দিকে তার আর মনোযোগ নেই। সে কাককে ঢিল ছুড়ছে। আমি একটু হাসি, তারপর এগিয়ে যেতে থাকি। মুন্নি একা আসতে পারবে। আমি যখন থাকব না, তখনও তো মুন্নিকে একাই হাঁটতে হবে।
পুরোনো দেওয়াল
হাড় জিরজিরে রোগা ছেলের মতো ইট বের করা দেওয়ালের গলি। দু-পাশেই শুধু দেওয়াল, জানলা নেই, দরজাও না। গলিটা খুব নির্জন। জগদীশ নিশ্বাস টানলে গন্ধটা পায়। অত্যন্ত মৃদু মাটির গন্ধের সঙ্গে ভিজে শ্যাওলার গন্ধ। গন্ধটা মিষ্টি। শরীর অবশ করে নেওয়ার মতো আমেজ যেন গন্ধটার সঙ্গে মিশে থাকে। যেন এইখানে দাঁড়ালে অনেক পুরোনো কথাকে মনে পড়বে।
রোজ না, কিন্তু কখনও-কখনও সন্ধ্যাবেলা এই গলিটা দিয়ে হেঁটে আসতে জগদীশের গা–টা ছমছম করে। ভয় নয়, কেমন বিচিত্র একটা অনুভূতি। একটা টিমটিমে আলো গলিটার কোণে দাঁড়িয়ে জ্বলে। মাটির ওপর নিজের পায়ের শব্দটা অনেক বড় হয়ে তার কানে লাগে। গলিটাকে মনে হয়, একটা প্রাচীন প্রাগৈতিহাসিক গুহার মতো। নিজেকে মনে হয় কোন এক প্রাগৈতিহাসিক মানুষের মতো, যে অনেক রোদে পুড়ে, জলে ভিজে পরিশ্রান্ত হা–ক্লান্ত হয়ে হঠাৎ একটা অনাবিষ্কৃত আশ্রয়ের সন্ধান পেয়ে গিয়েছিল। এই সেই গুহা যেন। চোখ দিয়ে দেখা যায় না, কিন্তু যেন অনুভব করা যায়, দেওয়ালে বিচিত্র সব ছবি খোদাই করা। একটা পবিত্র শুষ্ক হাওয়া গুহাটার ভিতর খুব মৃদু হয়ে বইছে। আর কেবলই মনে হয়, যারা এই গুহাকে পিছনে ফেলে চলে গেছে, তারা আর ফিরে আসবে না। কেন তারা ফিরে আসবে না? জগদীশ ভাবে। তারপর মনে। হয়, বোধহয় প্রিয়জনদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গেলে আর ফিরে আসতে নেই।
জগদীশের ইচ্ছে হয়, এইখানে হাঁটু গেড়ে বসে, যারা চলে গেছে তাদের মঙ্গলের জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে। সত্যিই সে প্রার্থনা করতে বসে না, কিন্তু কথাটা মনে হলেই কেন যে সে নিজেই জানে না, তার কান্না পায়। তার মোলো বছরের অপরিণত ছিপছিপে দেহটা সেই কান্নার আবেগে কাঁপতে থাকে, কুঁকড়ে যেতে চায়, আর তারপর গলার কাছে একটা দলা পাকানো দুঃখকে অনুভব করতে-করতে সে দৌড়তে আরম্ভ করে। গলির শেষে বাঁ-দিকে মিত্তিরদের পোড়ো বাড়িটার উঠোনটা ডিঙিয়ে বাবুপাড়ায় ঢুকে পড়ার পর সে স্বস্তি পায়।
গোপালদার মনোহারী দোকানে একটা মস্তবড় হ্যাজাক জ্বলে। রাস্তাটা সেখানেই দুটো ভাগে ভাগ হয়েছে। আলোটা রাস্তাটার অনেকখানি পর্যন্ত উজ্জ্বল করে রাখে। এই আলোটা দেখলে বেশ ভালো লাগে, মোড়ের মাথায় কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে গল্প করে। গোপালদার দোকান থেকে মৃদু ধূপের গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পড়তে থাকে, আর তখন শরীরে রাজ্যের ক্লান্তি অনুভব করতে করতে জগদীশের বাড়ির কথা মনে হয়।
বিকেল বেলায় বাড়ি ফিরে আসাটা বিশ্রী। বিকেল বেলাতে যেন মাকে ভীষণ গম্ভীর আর রাগি বলে মনে হয়। যেন একটু ছুঁতে গেলেই মা ভীষণভাবে ধমকে দেবে। বোধহয় এ-সময়টাতে মা সাজগোজ করে থাকে বলেই ওরকম মনে হয়। ভাবতে-ভাবতে জগদীশবাড়ি ঢুকল।
খিদে পেয়েছে। ভয়ংকর। কলতলার দিকে যেতে-যেতে জগদীশ চেঁচিয়ে বলল , খেতে দাও মা, খিদে পেয়েছে। মা কোথায় আছে না জেনে না ভেবেই সে চেঁচাল। বিকেল বেলা মাকে সাজগোজ করতে দেখলে ভালো লাগে না। সাজগোজ করলেই মায়েরা যেন গম্ভীর হয়ে যায়। কলতলার আবছা অন্ধকারটার দিকে তাকিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তার মনে হল, সে মাকে খুব ভালোবাসে। খুব। হঠাৎ কেন যে কথাটা মনে হল তা সে বুঝতে পারল না। এমনি। হঠাৎ–হঠাৎ কতকগুলো অদ্ভুত কথা মনে হয় যে, তার হাসি পায়। মগটা জলে ডুবিয়ে তারপর তুলে তারপর আবার ডুবিয়ে জলের গুরগুর শব্দটা শুনল সে।
সাবানটা কোথায়। অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে না ভালো করে। সাবানটা হাতড়ে-হাতড়ে খুঁজতে খুঁজতে সে ভাবল কত অদ্ভুত ইচ্ছেই যে মনে আসে।
এই ঘর জগদীশের। ঘরটা ছোট। একটা করে খাট, চেয়ার, টেবিল।
পা দুটোকে নিয়ে অস্বস্তি। টেবিলের তলা দিয়ে পা দুটো ভালো করে ছড়িয়ে দেওয়া যায় না –ওপাশের দেওয়ালে গিয়ে ঠেকে যায়। শরীরটাকে কিছুতেই একভাবে রাখা যায় না। শরীরটাকে মোচড়াতে ইচ্ছে করে, ভাঁজে–ভাঁজে ভাঙতে ইচ্ছে করে, আর একটা অস্থিরতা যেন ক্রমাগত বুকের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়ায়। পড়ার বই খোলা থাকে, কিন্তু পড়তে ইচ্ছে করে না। তারপর হঠাৎ এক সময়ে ঘরটাকে শূন্য নিরর্থক মনে হয়। একটা কিছু যেন ঘটা উচিত, অথচ যা কিছুতেই ঘটছে না। একটা কিছু করা দরকার, কিছু একটা করতে হবে ভাবতে ভাবতেই ঘুম এসে যায়। আর তারপর ঘুমে ঢুলতে–ঢুলতে চেয়ার থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বিছানায় যেতে-যেতে সারাদিনের ভাবনাগুলো তালগোল পাকিয়ে ধোঁয়াটে হয়ে এক সময়ে স্বপ্ন হয়ে যায়। অদ্ভুত সমস্ত স্বপ্ন।
কে যেন তাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে দিয়ে গেল। ঘুম থেকে উঠে বুঝতে পারল না কে তাকে ডেকেছে। আবছা–আবছা গলার স্বরটা কানে ঢুকছিল, নিজের নামটা শুধু বুঝতে পারছিল। রাত বেশ হয়েছে, খেতে যেতে হবে। ঘুম থেকে উঠে উঠোন রান্নাঘরে খেতে যেতে একদম ইচ্ছে করে না। বরং রাগ হয়। বাড়ির সকলের ওপর রাগ করতে ইচ্ছে হয়। কী দরকার ছিল ডাকবার! এক রাত না খেয়েও বেশ থাকা যেত।
