–বাদ দাও।
—কেন বাদ দেব? অশান্তির শুরু এইভাবেই হয়। আমি কিছুতেই এখানে থাকব না। তুমি ফ্ল্যাটে চলো৷ মাসে-মাসে বরং থোক টাকা দিও।
—মা-বাবা যে বড় একলা হয়ে পড়বেন।
—সে ভাবতে হবে না। মেয়ে কাছে এসে উঠেছে। একলা কীসের? বরাবরই দেখেছি মার টান তোমার চেয়ে চন্দনার ওপর বেশি। আমার ছেলেমেয়েদের চাইতে চন্দনার ছেলেমেয়েরা এ বাড়িতে ঢের বেশি আদর পায়।
–যাঃ, ও তোমার মনের ভুল।
—আমি খুকি নই। তুমি স্নেহে অন্ধ বলে দেখতে পাও না। নইলে ব্যাপারটা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার।
আড়ালে সুচেতা চোখের জল মোছে। ওরা থাকবে না।
.
১০.
জয় বলল—আমি যাচ্ছি মা।
হাসনু জয়ের মাথাটা দুহাতে ধরে একটু আদর করে বলল—এসো গিয়ে। টিফিন খেয়ে কিন্তু। ওয়াটার বটলটা ভুলে যেও না।
জয় বিরক্ত হয়ে বলে—নিয়েছি নিয়েছি।
হাসনু ছেলের লম্বাটে ছিপছিপে চেহারাটা একটু দূর থেকে দেখে। মুখখানায় বুদ্ধির ঝিকিমিকি। দেখে মুগ্ধ হয়ে যায়। তারপর হঠাৎ খেয়াল হয়, ওরকমভাবে দেখতে নেই। আজকাল সে এসব সংস্কার মানে। ছেলের চোখের আড়ালে সে একটু হাতজোড় করে ঠাকুরের কাছে মনে-মনে প্রার্থনা করে—ভালো রেখো।
বিজু অফিসে, জয় স্কুলে। মেয়েটা এক মনে ছবি আঁকে। আবোল-তাবোল ছবি। জ্বর থেকে সদ্য উঠেছে।
হাসনু মেয়েকে বলে—ধিয়া, দুধ খেলি না?
–না। বমি পায়।
সারাদিন হাসনুর কাজের শেষ নেই। কিছুই তাকে নিজের হাতে করতে হয় না। আয়া, চাকর, রাঁধুনি আছে। তবু সবদিকে চোখ রাখতে হয়। সারা বাড়ি ছুটতে হয়।
সন্ধে পার করে বিজু এল। হাসনু তার মুখোমুখি বসে বলে–কী ভেবেছ? বলো তো!
—এরকম ডাল সন্ধে কাটানো যায়? এর চেয়ে ঝি-গিরি ভালো ছিল। তোমার সংসার দেখছি, আমারও তো কিছু সাধ আহ্লাদ তোমাকে দেখতে হবে!
পুরোনো চিঠি
নিশুতরাতে এসেছিল এক ডাকপিয়োন। দরজা খুলে দেখি ব্যাগ ভরতি চিঠি, হাত ভরতি চিঠির ভারে কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বুড়ো-সুড়ো লোকটা। জ্যোৎস্নায় ভেজা তার দাড়ি, চাঁদের গুঁড়ো লেগে আছে তার উল্লেখুড়ো পিঙ্গল চুলে, জ্যোৎস্নার রস টলটল করছে তার চোখভরে। উজাড় করে সে চিঠি ঢেলে দিল আমার দুই আঁজলায়। হাত উপচে চিঠির-পর-চিঠি গড়িয়ে পড়ল মেঝেয়, সিঁড়িতে, ছিটকে পড়ল সিঁড়ির নীচেকার ঘাসে। ব্যস্ত হয়ে চিঠিগুলো কুড়িয়ে নিতে থাকি। খুলে পড়তে গিয়ে দেখি, এ সবই পুরোনো সব চিঠি, আদালতের সপিনা, জীবনবিমার প্রিমিয়ারের নোটিশ, বিয়ের আগেকার প্রেমপত্র। সুসংবাদ-দুঃসংবাদে ভরা এসব চিঠি তো আমি কবেই পেয়েছি, তবে কোথা থেকে আবার ঘুরে এল এগুলো? শুনতে পেলাম বুড়ো পিয়োনটা পাড়ার দরজায় দরজায় নিশুতরাতে কড়া নেড়ে ফিরছে, বিলি করছে পুরোনো সব চিঠি, দলিল, নোটিশ।
ঘুম ভেঙে উঠে বসলাম বিছানায়। স্বপ্ন। শিয়রের জানালা দিয়ে একটু শেষরাতের জ্যোৎস্না এসে পড়েছে আমার ঘুমন্ত মেয়ে আর বউয়ের মুখে। একটু চেয়ে থাকলাম মুখ দুটোর দিকে।
মায়ের বুক ঘেঁষে কেমন নিবিড়ভাবে শুয়ে আছে মেয়েটা। জেগে উঠে আবার স্বপ্নে দেখা পিয়োনটার কথা মনে পড়ল। চিঠির ভারে নুয়ে পড়া বুড়ো বিড়বিড় করে আপন মনে কথা বলছে,
আর বিলি করছে তামাদি সব কাগজ, ভুলে যাওয়া সব পুরোনো চিঠি। স্বপ্নটার মানে কী?
নিঃসাড়ে বিছানা ছেড়ে উঠে আসি। জানলার গরাদের ফাঁক দিয়ে দেখি, আকাশে স্টিমারের আলোর মতো এক গোল চাঁদ। নির্জন জ্যোৎস্নায় চোরের মতো পা ফেলে হেঁটে যাচ্ছে বাতাস, জানালায় উঁকি দেয় লোভী বেড়ালের চোখ। রাস্তায় চৌকিদার লাঠি ঠুকে–ঠুকে হাঁটছে।
বুকের বাঁ-ধারে একটু ব্যথা টের পাই। মনটা বিষণ্ণ। জল খেলাম, একটা আস্ত সিগারেট শেষ করলাম, তবু আর শুতে ইচ্ছে করল না। মনের মধ্যে একটু ভয়-ভয় ভাব। ঘড়ি দেখলাম। তিনটে। রাত ফুরোতে ঢের দেরি। অন্ধকারে একা ভূতের মতো বসে রইলাম। রাতটা অস্বস্তির সঙ্গে কেটে গেল।
সকালে মেয়েকে নিয়ে বেড়াতে বেরোই। আমার পাঁচ বছরের মেয়ে মুন্নি কুকুর দেখে, বেড়াল দেখে, পাখি দেখে, থেমে-থেমে হাঁটে। আমি মাঝে-মাঝে এগিয়ে যাই, সে পিছনে পড়ে থাকে। তারপর দৌড়ে এসে আমাকে আবার ধরে। এত সকালে রাস্তায় লোক চলাচল থাকে না। ভারী নির্জন রাস্তা। ভোরের গন্ধটি কেমন সতেজ, আলোটি কেমন ছায়াময়। হাঁটতে-হাঁটতে আমরা কথা বলি।
মুন্নি বলে–আমার হাত ছেড়ে দাও বাবা, আমি তো একাই হাঁটতে পারি।
–ঠিক তো। বলে আমি হাত ছেড়ে দিই তার।
মুন্নি হাসে-তবে কেন আমার হাত ধরে থাকো রোজ? আমি কি হারিয়ে যাই?
–না-না। আমি তাড়াতাড়ি বলি,–’তুমি তো হারাও না, আমিই হারিয়ে যাই মা, সেই ভয়ে হাত ধরে থাকি।’
–তুমি কি ছোট্ট?
বলি–হুঁ।
–আমার চেয়েও ছোট্ট।
–তোমার চেয়েও।
–কাল থেকে তো আমি ইস্কুলে যাব, তখন কার সঙ্গে তুমি বেড়াবে?
একটু চমকে উঠি। ঠিক। মুন্নি কাল থেকে প্রথমে ইস্কুলে যাবে। কাল থেকে আমি কার সঙ্গে
হাঁটব?
ম্লান হেসে বলি–একাই বেড়াব মা।
–যদি হারিয়ে যাও?
‘হারিয়ে যাব?’ হঠাৎ আমাকে ঘিরে এক স্তব্ধতা নেমে আসে। নিজেকেই প্রশ্ন করি ‘হারিয়ে যাব?’
মুন্নি পিছিয়ে পড়ে। তার জুতোয় কাঁকর ঢুকেছে। জুতো খুলে কাঁকরটা বের করছে সে। আমি একটু এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াই। পিছু ফিরে দেখি, শূন্য রাস্তার মাঝখানে আমার শিশু মেয়ে একা। ঝাঁকড়া চুল মুখের ওপর ফেলে উবু হয়ে জুতো পরিষ্কার করছে। দৃশ্যটা থেকে চোখ ফেরাতে পারি না।
