শমীক চুপ করে থাকে। অনেকক্ষণ বাদে বলে–কিন্তু চন্দির কথা আলাদা।
–সকলের কাছেই নিজের মেয়ে আলাদা।
—তুমি হার্টলেস।
–জানোই তো।
শমীক ঘুমোল। কিন্তু সুচেতা জেগে রইল। একবার উঠে গিয়ে পাশের ঘরে ঘুমন্ত মেয়েটাকে দেখে এল। মাঝরাতে নীরবে চোখের জল ফেলল কিছুক্ষণ। বিজু বিদেশে। মেয়েও চলল শ্বশুরঘর।
.
৫.
বাথরুম থেকে ঘরে আসতে পারছিল না শমীক। কী দূর হয়ে গেছে ঘর! কত দূর! তার গলার স্বর পৌঁছোয় না ঘরে সুচেতার কাছে। তবু সে প্রাণপণে ডাকে—সুচেতা! ডাকটা ফোটে না। অস্ফুট গোঙানির শব্দ হয়।
শেষ রাতে সুচেতা টের পেল, শমীক বিছানায় নেই। অনেকক্ষণ নেই। চমকে ওঠে বুক। বয়সটা ভালো নয় তো! উঠে সে স্বামীকে খোঁজে।
বাথরুমে যখন খুঁজে পায় তখন শমীকের জ্ঞান নেই। গোঁ-গোঁ শব্দ করছে। হাত পায়ে খিচুনি।
ডাক্তার বলল—মাইলড স্ট্রোক। এরপর থেকে কিন্তু খুব সাবধান।
খবর পেয়ে দুর্গাপুর থেকে কর্মব্যস্ত বিজু এল। মুখ থমথমে, গম্ভীর।
চন্দনা এল তার তিন বছর দু-মাসের দুই বাচ্চাকে নিয়ে। বাবার শিয়রে বসে রইল ভাইবোনে। সুচেতা নাতি-নাতনি সামলাতে লাগল।
শমীক বলল–তোরা অমন ভেঙে পড়িস না। আমি এখন ভালো আছি।
চন্দনা কাঁদতে থাকে। বিজু ছুটি বাড়ানোর দরখাস্ত পাঠায়।
শমীক সেরে ওঠে।
যাওয়ার আগে বিজু একদিন আড়ালে মাকে বলে—সবসময় তো বিয়ে-বিয়ে করে মাথা খারাপ করে দিচ্ছ। ভালো পাত্রী পেয়েছ তো বলো করে ফেলি।
—তিন-তিনটে হাতে রেখেছি। এবারই দেখে পাকা কথা দিয়ে যা।
বিজু খুব লাজুক স্বরে বলল—আর-একটা দেখা তো আছে, বলো তো তোমাদের দেখিয়ে দিই।
—ওমা! তাই বলি–বলে সুচেতার গালে হাত।
.
৬.
বিরক্ত হয়ে শমীক বলল—সবই কি আর মনের মতো হয়? মানিয়ে নিতে হবে।
সুচেতা বলে—তুমি পুরুষমানুষ, আত্মভোলা শিবের জাত। মানিয়ে নিতে পারো। মেয়েরা পারে না।
শমীক মৃদু হেসে বলে—পারো না কেন? মেয়েরা বড় জেলাস, কারও সঙ্গে কারও বনে না। ছেলের বউ তো শাশুড়ির চিরকালের শত্রু।
—না মশাই, আমি আমার শাশুড়ির শত্রু ছিলাম না। তুমি কি ভাবো তোমার ছেলে যে বউটি ঘরে এনেছে সে আমার নখের যুগ্যি?
—তা বলছিনা।
—তাই বলছ। জানো না বলেই বলছ। অত দেমাক কীসের ওর? গায়ের রংটা একটু কটা আর এম-এ পাস যোগ্যতা তো এটুকুই। এম-এ পাস নই বলে আমরাও কম যাই নাকি?
—ওই তো জেলাসির কথা। তোমাকে কম কে বলছে?
—অনেকে হয়তো ভাবে। তুমিও বউকে আশকারা দাও, বউকে কিছু বললে ছেলেরও মুখ ভার। না বাপু, দুর্গাপুরে আর নয়। কলকাতা চলো। ছেলের সংসারে ঢের হয়েছে।
.
৭.
জামাই রবীনের পাতে আরও একটু মুরগি দিয়ে সুচেতা হাসিমাখা মুখে বলে—বলছেই না যখন–
রবীন মুখ তুলল না। চিন্তিতভাবে চুপ করে রইল।
চন্দনা টেবিলের অন্য ধার থেকে বলে—বলবে কী করে? একা ওই-ই তো সংসারের সব খরচ চালায়। ভাইরা কিছু দেয় নাকি? যাও বা দেয় শাশুড়ি তা ব্যাংকে জমা করেন। বড় ছেলেই চক্ষুশূল।
শমীক এসব কথা পছন্দ করে না। সে প্রাচীনপন্থী মুখখানা বিভীষণ করে খাচ্ছিল। অর্ধেক খেয়ে উঠে গেল কিছু না বলে।
সুচেতা লক্ষ করে ব্যাপারটা। তবু মেয়ের স্বার্থ তাকে তো দেখতেই হবে। সে মৃদুস্বরে বলে— সংসারের শান্তি চাইলে কিছু অপ্রিয় কাজও করতে হয়। আমি বলি কি, একটা আলাদা বাসা করে চলে এসো তোমরা। আমার কাছাকাছি চলে এসো, ছেলেমেয়ে আমিও দেখতে পারব’খন।
রবীন জবাব দেয় না। কিন্তু কথাটা ভাবে।
চন্দনা বলে—আমিও তো কবে থেকে তাই ভাবছি। ও কেবল বাপ মায়ের কর্তব্যের নামে থাকতে চায়।
সুচেতা বলল-কর্তব্য দূরে থেকেও করা যায়! বরং বেশিই করা যায়। থোক টাকা দেবে মাসে-মাসে।
রবীন একবার চন্দনার দিকে রাগ-চোখে চায়। কিছু বাদে সে-ও প্রায় ভরা পাত ফেলে ওঠে।
রাতে শমীক সুচেতাকে বলে—এসব প্রশ্রয় দিচ্ছ! পরে ভুগবে।
—আহা, কী কথা! জামাই তার সব রোজগার সংসারে ঢালছে, মেয়েটার ভবিষ্যৎ নেই? দুটো পয়সা রাখতে পারছে না।
শমীক রাগ করে পাশ ফিরে শোয়।
.
৮.
মস্ত প্রোমোশন পেয়ে বিজু বদলি হয়েছে। কলকাতায়। বউ হাসনু আর দুই ছেলেমেয়ে হইহই করে এসে হাজির হল একদিন।
সুচেতার আনন্দ ধরে না। শমীকের গম্ভীর মুখে খুশির বেলুন ফাটল।
সুচেতা বলল—বলতে নেই বউমা, তোমার শরীরটা একটু সেরেছে। বিয়ের সময় যা রোগা ছিলে!
–দুর্গাপুরের জল ভালো মা।
–কলকাতায় এলে তো। এবার বুঝবে।
—তা হোক মা, দুর্গাপুরে লাইফ নেই। এখানে কত লোকজন, আলো। ওখানে যেন মৃত্যুপুরী। কতদিন থেকে আসব-আসব করছি।
খুব সাবধানে সুচেতা জিগ্যেস করে—এ-বাড়িতেই থাকবে তো! নাকি–?
হাসনু মাথা নত করে বলে—ওকে তো অফিস থেকে আলাদা ফ্ল্যাট দেবে।
সুচেতা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। হাসনু বলে—ওর অবশ্য আপনাদের কাছেই থাকার ইচ্ছে।
—শুধু ওর ইচ্ছেয় তো হওয়ার নয় মা, তোমারও ইচ্ছে থাকা চাই।
হাসনু জবাব দেয় না।
.
৯.
পরদার আড়াল থেকে সুচেতা শুনল, হাসনু বিজুকে বলছে—অফিসের ফ্ল্যাটের কী হল?
—নিচ্ছি না। এই তো বেশ আছি। মা-বাবার কাছে। ছেলে-মেয়ে দুটো দাদু-ঠানু বলতে অস্থির।
বাইরে থেকে তো ভালোই লাগছে। এদিকে যে বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা। চন্দনা আর রবীন কাছেই ফ্ল্যাট নিয়েছে, রোজ আসে।
—তাতে কী?
–কী আবার। মায়ে মেয়েতে দিনরাত গুজগুজ ফুসফুস। কী বলে কে জানে! বিয়ের পর মেয়েদের বাপের বাড়ির সঙ্গে অত মাখামাখি কেন থাকবে? ওর বরটাও ম্যাদাটে মার্কা। শ্বশুরবাড়ি বলতে অজ্ঞান।
