দেখুন কী আহাম্মক ছেলেটা–অফসাইডে দাঁড়িয়ে সুন্দর চান্সটা নষ্ট করে দিল। আর মাত্র দশ মিনিট আছে, এখনও গোল হয়নি। আর ওই ছেলেটা–হায় ঈশ্বর, কে ওকে ওই লাল সোনালি জার্সি পরিয়েছে! ওকে বের করে দিক মাঠ থেকে। দিন তো মশাই আপনারা চোস্ত গালাগালিতে ওর ভূত ভাগিয়ে। আমার জিভে আবার খারাপ কথাগুলো আসে না। কিন্তু দেখুন, রাগে আমারও হাত-পা কাঁপছে! আজ সকাল থেকেই চাঁদ আর তিনজন দুঃসাহসী মানুষের কথা ভেবে–ভেবে আমার নার্ভগুলো অসাড় হয়ে আছে! তার ওপর দেখুন এই ফালতু টিমটা আমার দলের কাছ থেকে নিয়ে নিচ্ছে এক পয়েন্ট। একটা পয়েন্ট কী সাংঘাতিক! ওদিকে আর আট কি ন’মিনিট সময় আছে মাত্র। কী বলেন দাদা, গোল হবে? কী করে হবে! খুদে টিমটার সব খেলোয়াড় পিছিয়ে এসে দেওয়াল তৈরি করছে গোলের সামনে। আর এরা খেলছে দেখুন, কে বলবে যে গোল দেওয়ার ইচ্ছে আছে? ওই যে ছেলেটা–অফসাইডে দাঁড়িয়ে দিনের সবচেয়ে সহজ চান্সটাকে মাটি করে দিল–আমার ইচ্ছে করছে ওর সামনে গিয়ে বলি–এই আমাকে দ্যাখো, আমি অরিন্দম বসু, এই টিমটাকে আমি ছেলেবেলা থেকে সাপোর্ট করে আসছি। জিতলে ঠাকুরকে ভোগ দিয়েছি, হারলে সুইসাইডের কথা ভেবেছি। তা বাপু, তুমি কি বোঝো সেসব? তুমি তো জানই না যে, আমি–এই ভিড়ের মধ্যে বিশেষ একজন কীরকম দুঃখ নিয়ে ছলছলে চোখে ঘড়ি দেখছি। অবশ্য তাতে কী যায় আসে। আমি কাঁদি কিংবা হাসি-কিংবা যাই করি–কেউ তো আর আমাকে দেখছে না।
না মশাই গোল হল না। রেফারি ওই লম্বা টানা বাঁশি বাজিয়ে দিল। খেলা শেষ। এখন দয়া করে আমাকে একবার দেখুন কীরকম অবসাদগ্রস্ত আমি, কাঁধ ভেঙে আসছে। দেখুন আমার টিমটাকে আমি কত ভালোবাসি, কিন্তু তাতে টিমের কিছু যায় আসে না। ওরা চেনেই না আমাকে। অথচ আমি প্রতিটি হারজিতের পর কত হেসেছি–লাফিয়েছি–কেঁদেছি–চাপড়ে দিয়েছি অচেনা। লোকের পিঠ। খামোকা। তাতে কারও কিছু এসে যায় না। এই যে আমি সকাল থেকে চাঁদ আর তিনজন মানুষের কথা ভেবে চিন্তাষিত–ভালো করে ভাত খেতে পারিনি উত্তেজনায়–এতেই বা কার কী এসে যায়।
দয়া করে আমাকে একবার দেখুন। না, আমি জানি, আপনি লিগ টেবিলে আপনার টিমের অবস্থা ভেবে বিব্রত। তার ওপর চাঁদ আর সেই তিনজন মানুষের কথাও ভাবতে হচ্ছে আপনাকে। কত কিছু ঘটে যাচ্ছে পৃথিবীতে। সাড়ে উনত্রিশ ফুট লং জাম্প দিচ্ছে মানুষ, গুলিতে মারা যাচ্ছে প্রেসিডেন্ট, ভোটে হেরে যাচ্ছে আপনার দল, বিপ্লব আসতে বড় দেরি করছে। তাই, আমি অরবিন্দ বসু, ব্যাঙ্কের ক্যাশ ক্লার্ক–আপনার এত কাছে থাকা সত্বেও আপনি আমাকে দেখতে পাচ্ছেন না।
ওই যে দোতলার বারান্দায় রেলিঙের ওপর ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে আমার চার বছর বয়সের ছোট ছেলেটা–হাপু। বড় দুরন্ত ছেলে। সকাল থেকে বায়না ধরেছে রথের মেলায় যাব বাবা, তুমি তাড়াতাড়ি ফিরো। ওই যে এখন দাঁড়িয়ে আছে আমার জন্য। ঝাঁকড়া চুলের নীচে জ্বলজ্বল করছে দুখানা চোখ, আমি এত দূর থেকেও দেখতে পাচ্ছি।
আমি সিঁড়িতে পা দিয়েছি মাত্র, ও ওপর থেকে দুড় দাঁড় করে নেমে এল–ওর মা ওপর থেকে
চেঁচাচ্ছে–হাপু–উ কোথায় গেলি, ও হাপুউউ। এক গাল হেসে হাপু ঝাঁপিয়ে পড়ল প্রায়–কত দেরি করলে বাবা, যাবে না? হ্যাঁ মশাই, বাইরে থেকে ফিরে এলে–এই আপনজনদের মধ্যে আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। কচি ছেলেটাকে আমি কোলে তুলে নিলাম। ওর গায়ে মিষ্টি একটা ঘামের গন্ধ, শীতের রোদের মতো কবোষ্ণ ওর নরম গা। মুখ ডুবিয়ে দিলে মনে হয় একটা অদৃশ্য স্নান করে নিচ্ছি যেন! বললাম–যাব বাবা, বড় খিদে পেয়েছে, একটু বিশ্রাম করে খেয়ে নিই।
যতক্ষণ আমি বিশ্রাম করলাম ততক্ষণ হাপু আমার গায়ের সঙ্গে লেগে রইল, উত্তেজনায় বলল –শিগগির করো। ওর মা ধমক দিতেই বড় মায়ায় বললাম–আহা, বোকো না, ছেলেমানুষ! আসলে ওর ওই নেই–আঁকড়ে ভাবটুকু বড় ভালো লাগে আমার।
বড় দুরন্ত ছেলে। মেলায় পা দিয়েই হাত ছাড়িয়ে ছুটে যেতে চায়। বললাম–ওরকম করে। হাপু, হাত ধরে থাকো, আমার হাত ধরেই তুমি ঠিকমতো মেলা দেখতে পাবে। ও কেবল এদিক-ওদিক তাকায় তারপর ভীষণ জোরে চিৎকার করে জিগ্যেস করে–ওটা কী বাবা! আর ওটা! আর ওইখানে! আমি ওকে দেখিয়ে দিই–ওটা নাগরদোলা। ওইটা সার্কাসের তাঁবু। আর ওটা মৃত্যুকূপ!
আস্ত একটা পাঁপর ভাজা হাতে নাগরদোলায় উঠে গেল হাপু। ওই যে দেখা যাচ্ছে তাকে আকাশের কাছাকাছি উঠে হিহি করে হেসে হাত নাড়ছে সাঁই করে নেমে আসছে আবার আবার উঠে যাচ্ছে সারাক্ষণ আমার দিকে চেয়ে হাসছে হাপু। দেখে মন ভরে যায়।
মৃত্যুকূপের উঁচু প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ওকে দেখালাম দেওয়াল বেয়ে ভীষণ শব্দে ঘুরে-ঘুরে উঠে নেমে যাচ্ছে তীব্রবেগে মোটর সাইকেল। ও আমাকে আঁকড়ে ধরে থেকে দেখল।
তারপর আধঘন্টার সার্কাস দেখলাম দুজন। দুই মাথাওলা মানুষ সিংগিং ডল, আট ফুট লম্বা লোক। হাপুর কথাবার্তা থেমে গেল। ঝলমল করতে লাগল চোখ।
বাইরে এনে ওকে ছেড়ে দিলাম। আমার পাশে-পাশে ও হাঁটতে লাগল। ওর হাতে ধরা হাতটা থেমে গিয়েছিল বলে আমি ওর হাত ছেড়ে দিলাম।
ওই তো ও এগিয়ে যাচ্ছে আমার হাত ছেড়ে! দোকানে সাজানো একগাদা হুইশল দেখছে ঝুঁকে, আবার এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ায় আর একটা দোকানে, যেখানে এরোপ্লেনের দৌড় হচ্ছে। তারপর আস্তে আস্তে এগিয়ে যাচ্ছে, ও এয়ার গান আর রংচঙে বল দেখতে-দেখতে আস্তে-আস্তে পা ফেলছে… ক্ৰমে ভিড়ের মধ্যে চলে যাচ্ছে হাপু…আমি তখন আমার টিমটার কথা ভাবছিলাম –খামোক একটা পয়েন্ট নষ্ট হয়ে গেল আজ। চাঁদের দিকে চলেছে তিনজন মানুষ–ওরা কি পৌঁছতে পারবে?
