আরও একরকমভাবে ডিস্টার্ব করা সম্ভব।
সেটা কীভাবে?
আপনি এক্সটারনালি মেয়েটিকে ডিস্টার্ব করেননি ঠিকই। কিন্তু ইন্টার্নালি হয়তো করেছেন। হয়তো নয়, করেছেনই।
আজ্ঞে না।
কী করে বুঝলেন করেননি? আপনি কি মেয়েটির মনের ভেতরটা দেখেছেন?
আরে না। মেয়েটা তো আমাকে কখনও লক্ষই করেনি। যে আমাকে লক্ষই করেনি তাকে আমার পক্ষে মানসিক উৎপীড়ন করা কি সম্ভব?
সম্ভব।
কীভাবে?
উৎপীড়ন না বলে যদি নাড়া দেওয়া বলি তাহলে কেমন হয়?
নাড়া দেওয়া! এ কথাটার অর্থ কি একটু আলাদা হয়ে যাচ্ছে না?
তা যাক না। ধরুন সেটাই হয়েছে।
একটু বুঝিয়ে বলুন।
খুব সাদামাটা কথায় বললে বলতে হয় পারিজাতবাবু, আপনি যেমন আড়চোখে মেয়েটিকে লক্ষ করেছেন তেমনভাবে মেয়েটিও আপনাকে লক্ষ করেছে। এবং সে একটু নাড়া খেয়েছে। এবং তারও মনে হয়েছে তার স্বপ্নের পুরুষটি রোজ সকালে নিতান্ত ভদ্র এবং কাপুরুষ বলে কখনও মেয়েটিকে হৃদয়ের কথা জানাতে পারেনি। অগত্যা মেয়েটি তার ছোটকাকার শরণাপন্ন হয়। ছোটকাকা ডাকসাইটে পুলিশ অফিসার। সে ওই রবার্ট ব্লেক এজেন্সিতে ছেলেটি সম্পর্কে খোঁজ খবর সংগ্রহ করতে লাগায়। সংগৃহীত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, পারিজাত সেনগুপ্ত মেধাবী, কৃতবিদ্য, লম্বা বেতন, সম্ভ্রান্ত পরিবারওলা ছেলে। কাপুরুষ সন্দেহ নেই। কিন্তু বরণীয়া। আপনার চোখ ছলছল করছে কেন?
বিশ্বাস হচ্ছে না।
আপনি আজ সকাল থেকে আগাগোড়াই আমাকে অবিশ্বাস করে আসছেন।
এখনও করছি। তবে ডিনারের বিলটা আপনি দিলে আমি আপত্তি করব না।
তাহলে চলুন, ওঠা যাক। এখন খিদে পাচ্ছে, তো?
হ্যাঁ, এখন বেশ খিদে হয়েছে ছোটকাকা।
পুনশ্চ
বিজু বলল—আমি যাচ্ছি না।
সুচেতা বিজুর থুতনিতে আঙুল ছুঁইয়ে ঠোঁটে ঠেকিয়ে চুক করে শব্দ করে বলল—এসো। দেরি কোরো না। টিফিন খেয়ো। জলের বোতল নিয়েছ তো ভরে।
বিজু বিরক্ত হয়ে বলে—আজ ম্যাচ আছে। বোতল-টোতল কেন একগাদা দিলে? কত বই, টিফিন বাক্স! রোজ স্কুলে যাওয়ার সময় আমি গাধার মতো মোট বয়ে নিয়ে যাই।
—দূর পাগল! সবই কাজে লাগে। কিচ্ছু ফেলনা নয়।
—একদিন সব হারিয়ে আসব দেখো।
ছেলের লম্বাটে ছিমছাম চেহারা, সতেজ মুখের দিকে চেয়ে সুচেতা কয়েক পলক মুগ্ধ থাকে। এই তার রক্তের ডেলা, তার আপন সৃষ্টি, তার গাছের মহার্ঘ ফল। ফের ভাবে, নজর লাগল বুঝি।
তাই বিজুর বাঁ-হাত টেনে নিয়ে দাঁতে একটু কামড়ে গায়ে থুথুঃ করে বলে—সাবধানে যাবে। খেলতে গিয়ে ব্যথা পেয়ো না।
বিজু পিঠে ব্যাগ নেয়, কাঁধে বোতল ঝোলায়। তারপর বুটের শব্দ তুলে সতেজ পায়ে বেরিয়ে যায়।
.
২.
সারাদিন হাওয়া বয় তিনতলার ঘরদোরে। খুব হাওয়া। টুকটাক কাজ আর সুচেতনার শেষ হতে চায় না। কোলের মেয়েটা জ্বালায় বড়। হাম হয়েছে। সারা বাড়ি হামা টেনে বেড়াচ্ছে। মেঝেয় পেচ্ছাপ করে সেই জলে থাপুর-থুপুর করে দুই হাতে।
—এই রে! দেখেছ! বলে উনুন থেকে কড়া নামিয়ে রেখে সুচেতা ছুটে যায়। হামে যদি ঠান্ডা লাগে তবে বিপদ। অরুন্ধতীর ছেলেটা হাম বসে মরতে চলেছিল।
মেয়েকে কোলে নিয়ে আঁচলে তার হাত-পা মোছায়, জাঙিয়া পালটে দেয়। পেচ্ছাপের জায়গাটা মোছে। মেয়েকে খেলা দিয়ে আবার গিয়ে চাপড়ঘণ্টের কড়া চাপায়।
এইভাবেই যৌবন শেষ হয়ে আসে বুঝি। এই তিনতলার ঘরে সংসারে আবদ্ধ জীবন। বেড়ানো, খেলানো নেই, কলেজ জীবনের আড্ডা নেই, রোমাঞ্চ নেই।
শমীক সন্ধে পার করে এল।
–সুচেতা তাকে চা দিয়ে কাছে বসে বলল কী ভেবেছ বলো তো?
–কী ভাবলাম? শমীকের ভীতু গলায় জবাব।
—এইভাবে আমাকে নিঙড়ে শেষ করবে? এর চেয়ে যে ঝি-গিরি অনেক সৎমানের। খাটাচ্ছ, কিন্তু শখ-আহ্লাদও পূর্ণ করবে তো। স্বার্থপর কেন বলো তো?
.
৩.
বিজু ফার্স্ট ডিভিশনে পাস করে কলেজে ভরতি হল। মেয়ে চন্দনা সিক্স থেকে ফার্স্ট হচ্ছে। ভালো নাচে, গায়।
এক-আধদিন আজকাল শমীক বলে—বড্ড টায়ার্ড লাগে।
-কেন?
–কী জানি। লো প্রেসারটা তো আছেই।
—আমারও মাথা ঘোরে। হজম হয় না।
শমীক বলে—চলো তো দুজনেই ডাক্তারের কাছে যাই আজ।
পাড়ার চেনা ডাক্তার দুজনকেই দেখে বলেন—তেমন কিছু নয়। মিসেস চ্যাটার্জিকে নিয়ে একটু ঘুরে-টুরে আসুন কোথাও।
সুচেতা বলে—ওঁকে ভালো করে দেখুন।
—দেখেছি।
–কী?
—কিছু নয়। চল্লিশের পর শরীরে ক্ষয় শুরু হয়। এসব একটু-আধটু অসুবিধে এখন থেকে হবে। একটু এক্সারসাইজ দরকার।
সুচেতা ভাবল চল্লিশের ওপর? এই সেদিনও তার বরটি মাত্র চব্বিশের ছিল যে! হিসেবে অবশ্য তাই হয়। সে নিজেও আটত্রিশ ছুঁল।
.
৪.
বরপক্ষ চন্দনাকে একবারে পছন্দ করল।
ছেলের বাবা বললেন-দেনা-পাওনার কথা ওঠে না। যা দেওয়ার মেয়েকে দেবেন। ছেলের কিছু চাই না, শুধু লক্ষ্মীমন্ত বউ চাই।
শমীক অলক্ষে সুচেতার দিকে তাকায়। সুচেতার মুখেচোখে মেয়ের জন্য অহংকার। শমীক অতটা খুশি নয়। মেয়ে তার প্রাণ। মেয়ের বিয়ে হলে থাকবে কী করে?
রাত্রিবেলা শুয়ে জনান্তিকে সুচেতাকে বলল—তুমি তো বিয়ের নামে টগবগ করছ। আমি থাকব কী করে?
—আমিও তো মা।
—আমার বুকের মধ্যে কষ্ট হচ্ছে।
—টাকার কথা ভাবছ?
—সে ভাবনাও আছে। কিন্তু চন্দিকে ছেড়ে থাকা।
–ভেবো না। সয়ে যাবে।
–মেয়েরা বড় নিষ্ঠুর।
—মেয়েরা নয়, তোমরাই। আমাকে যখন আমার বাপ-মা’র কাছ থেকে ছিনিয়ে এনেছিলে তখন এত মায়া কোথায় ছিল?
