সাউথে।
সাউথ তো বিরাট জায়গা। বেহালা, টালিগঞ্জ, গড়িয়া, কসবা। শুধু সাউথ বললে কিছুই বোঝা যায় না।
কথাটা আপনি খারাপ বলেননি। সাউথ কথাটা ভারী গোলমেলে। আজকাল তো সোনারপুর টুরও শুনি সাউথের মধ্যে চলে এসেছে। কলকাতা শহরের পরিধি যে শেষ অবধি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে সেইটেই বোঝা যাচ্ছে না। বাসন্তী, গোসাবা, সবই না শেষে কলকাতার মধ্যে চলে আসে।
খুব ঠিক কথা। সাউথ ক্রমশ স্ফীত হচ্ছে। নর্থও হাত পা গুটিয়ে বসে নেই। মধ্যমগ্রাম, বিরাটি, বারাসাত, রাজারহাট ছাড়িয়ে সেও ধাওয়া করেছে উত্তর চব্বিশ পরগনা গ্রাস করে নিতে।
আপনি তো ছোঁকরা মানুষ। আমরা একটু বয়স্করা তো দেখেছি। ওই যে আপনাদের ঝাঁ চকচকে সল্ট লেক সিটি, একসময়ে কী অখদ্দে জায়গাই না ছিল। সাপ গোসাপের আড্ডা, জলা, ভেড়ি। আমরা তো বলতাম বাদা অঞ্চল। এখনও সেখানে মাঝে মাঝে সাপখোপ বেরোয়।
শেয়ালের ডাকও শোনা যায়।
আগে এই লেকেই কত শেয়াল ছিল। আমাদের আমলের কথা বলছি।
আপনার বয়স কত?
সাতান্ন।
প্লাস?
ওসব প্লাস মাইনাস ঠিক বুঝতে পারি না। গত শ্রাবণে সাতান্ন কমপ্লিট করেছি। সার্টিফিকেটে অবশ্য দু-বছর কমানো আছে।
আপনাদের আমলে বয়স কমানোর একটা ব্যাড হ্যাবিট ছিল, তাই না?
হ্যাঁ, তা ছিল। ছেলে যাতে বেশিদিন চাকরি করতে পারে। মেয়ে যাতে বুড়ি হলেও হুঁড়ি থাকে তার জন্যই বয়স কমানো হত।
ব্যাপারটা কিন্তু মিথ্যাচার।
তা তো বটেই।
তবু আপনারা যাঁরা বয়স্ক তাঁরা নিজেদের আমলের পঞ্চমুখে প্রশংসা করেন।
ও হল নস্টালজিয়া। আপনিও বয়স হলে এই আমলের প্রশংসা করবেন।
বয়স তো আমার কিছু কম হল না!
তাই নাকি? আমার হিসেবমতো আপনার বয়স ঊনত্রিশ বছর দু-মাস হতে পারে।
কত বললেন?
উনত্রিশ বছর দু-মাস। খুব আন্দাজেই বলছি।
দাঁড়ান মশাই, হিসেব করে দেখি। আমারও তো অত অ্যাকিউরেট হিসেব করা নেই কিনা। দাঁড়ান। জাস্ট এ মিনিট।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, সময় নিন না। এখনও বেশি রাত হয়নি। মোটে তো আটটা বাজে।
আপনাকে কিন্তু পুলিশে দেওয়া উচিত।
কেন মশাই, কী করলাম?
আমার বয়স সত্যিই ঊনত্রিশ বছর দু-মাস। কিন্তু আপনি সেটা কী করে জানলেন?
জানার প্রশ্ন উঠছে না। চেহারা দেখেই বয়স অনুমান করা যায়।
তা যায়। কিন্তু এতটা অ্যাকুরেট ক্যালকুলেশন করা যায় না।
তাও যায়। আমার মনে হচ্ছিল আপনার বয়স আঠাশ থেকে ত্রিশের মধ্যেই হবে। তাই একটা মাঝামাঝি রফা করে নিয়ে বলে দিলাম। তা সেটা লেগেও গেল দেখছি। এক-একদিন এরকম হয় মশাই, মানুষের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বা তৃতীয় নয়ন যা-ই বলুন, বেশ ভালো কাজ করতে থাকে।
ভালো কথা, আপনার বড় মেয়ের শ্বশুরবাড়িটা কোথায় যেন বলছিলেন।
সাউথে। এখান থেকে কাছেই।
সাউথে এবং এখান থেকে কাছেই–এই কথা দুটোর কোনও অর্থ হয় না।
কেন মশাই, বাংলা কথাই তো।
হ্যাঁ, কিন্তু ও থেকে কিছু বোঝা যায় কি?
আহা, বুঝবার দরকারটাই বা কি? আমার বড় মেয়ের শ্বশুরবাড়ি দিয়ে আমাদের তো কোনও প্রয়োজন সিদ্ধ হবে না।
হবে। কারণ, আপনি সেখানেই যাবেন বলে বেরিয়ে শেষ অবধি সেখানে যাননি। আমার মৌটুসির শ্বশুরবাড়ি বালিগঞ্জেই এবং আমার সেখানেই যাওয়ার কথা ছিল বটে। কিন্তু হঠাৎ মনে। পড়ে গেল যে, তার চেয়েও একটা জরুরি কাজ আমার আছে।
সেটা কি টালিগঞ্জের মেজো মেয়ে মৌবনের শ্বশুরবাড়িতে যাওয়া!
আশ্চর্য! অতি আশ্চর্য! বয়সে নিতান্তই আমার ছেলের বয়সি না হলে আমি আপনাকে একটা নমস্কার জানাতাম।
কেন মশাই, আমি তেমন ভালো কাজ তো কিছু করিনি!
করেছেন বইকী! আমার মেজো মেয়ের নাম যে মৌবন সেটা আপনার জানার কথাই নয়। এমনকী আরও আশ্চর্যের ব্যাপার হল তার শ্বশুরবাড়ি যে টালিগঞ্জে সেটাই বা আপনি জানলেন কী করে?
জানি না মশাই, আমি কিছুই জানি না। আপনি কী-কী অজুহাত দিতে পারেন তা আন্দাজ করতে গিয়ে যা মুখে এসেছে বলে দিয়েছি। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বা তৃতীয় নয়ন কিছুই আমার নেই।
কিংবা একটু বেশি মাত্রাতেই আছে। আমার মেজো মেয়ের নাম বা তার শ্বশুরবাড়ি কোথায় তা ঠিকঠাক বললেও একটা জায়গায় আপনার ভুল হচ্ছে। আমি কিন্তু বড় মেয়ের বদলে মেজো মেয়ের বাড়িতে যাচ্ছিলাম না। আসলে হঠাৎ মনে পড়ে গেল, মহেন্দ্র সিং নামে একটা লোকের কাছে আমি ছ’হাজার টাকা পাই। লোকটা অনেকদিন ধরে লেজে খেলাচ্ছে। গতকালই তাকে তার মোবাইল ফোনে ধরে কিছু হুমকি দেওয়াতে সে টাকাটা আজই দিয়ে দেবে বলে কথা। দিয়েছে। অধমর্ণদের তো জানেন, যতক্ষণ পারে টাকাটা আটকে রেখে সুদে খাঁটিয়ে দেয়। তা কথাটা মনে পড়তেই আমি গন্তব্য বদল করে মহেন্দ্র সিং-এর কাছেই যাচ্ছিলাম।
কিন্তু যাননি।
কেন যাইনি তারও গভীর কারণ আছে। মহেন্দ্র সিং ল্যান্সডাউনের একটা গলিতে থাকে। ন্যাপার দোকান থেকে একটুখানি পথ। যাব বলে পা বাড়িয়েই হঠাৎ দেখি মহেন্দ্র, পাশে তার বউ।
আপনি কি চেঁচিয়ে মহেন্দ্র সিংকে ডেকেছিলেন?
আহাম্মক হলে ডাকতাম। মহেন্দ্র সিং-এর গাড়ি এয়ারকন্ডিশন, জানলার কাঁচ আঁট করে বন্ধ ছিল।
তারপর?
তারপর আর কী? তারপর অগত্যা কিছুক্ষণ হাঁটা।
হ্যাঁ। আমার পিছু পিছু।
শুধু আপনি কেন, আমার সামনে আরও অনেক লোক হাঁটছিল।
আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে, এত জরুরি কাজ ফেলে অবশেষে আপনি এই লেক-এর ধারে এসে বসে আছেন কেন? আপনি কি জানেন, আপনার জন্য আজ দুপুরে আমার খাওয়া হয়নি?
