লক্ষ করেছেন কি না তা জানি না। তবে তাকিয়েছিলেন।
তা ওরকম তো আমরা কতই তাকাই। তাকানো মানেই কি আর দেখা! সবকিছুর দিকেই তাকাচ্ছি অথচ কিছুই দেখছি না, এমন অবস্থা কি আপনার কখনও হয় না?
তা হবে না কেন? সবসময়েই হয়। ভুলো মনের মানুষদের তো আরও বেশি করেই হয়। তবু আমার কেন যেন মনে হচ্ছিল আপনি তাকাচ্ছেন এবং দেখছেনও। তাই ভয়ে আমি তাড়াতাড়ি বড় রাস্তায় এসে দক্ষিণের একটা বাসে উঠে পড়ি।
আপনি এরপর কী বলবেন আমি জানি। আপনি বলবেন যে ওই বাসে আমিও সওয়ার হয়েছিলাম, তাই তো?
যদি অন্তর্যামী না হয়ে থাকেন তবে তা-ই। হাসছেন যে! হাসছি কি আর সাধে? কাকতালীয় আর কাকে বলে! আমারও যে আজ দক্ষিণ কলকাতার বালিগঞ্জে আমার বড় মেয়ের বাড়িতে যাওয়ার কথা ছিল। তার শাশুড়ির অসুখ। যাব যাচ্ছি করে আর যাওয়া হয়ে উঠছিল না। আজ গিন্নি একেবারে মাথার দিব্যি দিয়ে বললেন, না-যাওয়াটা খুবই দৃষ্টিকটু হচ্ছে। আমাদের কিছু হলেই ওরা এসে দেখা সাক্ষাৎ করে যান।
কাকতালীয় কথাটার অর্থ আমি কিন্তু সঠিক জানি না। কাক আর তাল মিলিয়ে শব্দটা যা দাঁড়ায় তার কোনও মানে হয় কি?
সত্যি কথা বললে বলতে হয়, আমিও জানি না। ছেলেবেলা থেকে শুনে আসছি তাই বলি। বাংলা ভাষাটা যাচ্ছেতাই। বরং ইংরিজি শব্দগুলো একটু বোঝা টোঝা যায়। তা আপনি তো ইংরিজির এমএ, কাকতালীয় কথাটার ইংরিজি কী হবে বলুন তো!
স্ট্রেঞ্জ কো ইনসিডেন্স।
বা! এই তো বেশ বোঝা গেল। স্ট্রেঞ্জ কোইনসিডেন্স!
না মশাই, বোঝা গেল না। বরং আরও ঘোরাল হল।
কেন বলুন তো!
আমি যে ইংরিজির এম.এ তা আপনি কি করে জানলেন?
মোটেই জানি না মশাই, আন্দাজে একটা ঢিল ছুড়লাম। লেগে গেল।
বটে! আন্দাজে ঢিল ছুঁড়তে থাকলে এক-আধটা লাগতে পারে, সবক’টা লাগে কি?
তাহলে মশাই, কথাটা আপনাকে ভেঙেই বলি।
আজ্ঞে, আমি তো তার জন্যই অপেক্ষা করছি।
আসলে কারও কোয়ালিফিকেশন বা বেতন কিংবা জাত জিগ্যেস করাটা ঘোর অভদ্রতা। তাই আমি কারও বেতন জানবার দরকার হলে তাকে গিয়ে বলি, আরে রামবাবু আপনি তো মাসে চল্লিশ হাজার টাকা বেতন পান, তাহলে বারো টাকার বেগুন কিনতে পিছোচ্ছেন কেন। তখন। রামবাবু বলে উঠলেন, কে বলল চল্লিশ? আমার বেতন মোটে বাইশ হাজার সাতশো টাকা। কিংবা কারও জাত জানবার দরকার হলে তাকে গিয়ে বললাম, ওঃ আপনারা বামুনরাই দেশটার সর্বনাশ করলেন মশাই। তাতে লোকটা একটু তেড়িয়া হয়ে বলল , মোটেই আমি বামুন নই, আমরা বদ্যি। তেমনি কারও কোয়ালিফিকেশন জানার দরকার হলেই আমি তাকে বলি, আরে, আপনি তো ইংরিজির এমএ বলুন দেখি এই শব্দটার ইংরিজি কী হবে। খুবই প্রাচীন এবং বহু। ব্যবহৃত কৌশল। কাজও ভালো দেয়। আচ্ছা, আপনি কি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন?
ফেলিনি। আপনা থেকেই বেরিয়ে গেল।
দীর্ঘশ্বাস ফেলার মতো কিছু ঘটছে কি?
ঘটেছে।
কী বলুন তো?
আমার বেতন চল্লিশ হাজার, আমি বদ্যি এবং ইংরিজির এমএ।
বলেন কি মশাই? এঃ, আজ তো দেখছি আমার লটারি মারার দিন ছিল। কেন যে একটা রয়াল ভুটানের টিকিট কেটে রাখিনি!
আপনার মতো বুদ্ধিমান লোকেরা লটারির টিকিট কেটে পয়সা রোজগার করার স্বপ্ন দেখে না। লটারির টিকিট কাটে বোকারা। আপনার মতো লোকেরা বুদ্ধি খাঁটিয়ে লটারির চেয়ে অনেক বেশি টাকা কামাতে পারে।
কেন যে আমাকে লজ্জায় ফেলছেন জানি না। কয়েকটা কাকতালীয় ব্যাপার থেকে এতটা ধরে নেওয়া কি ঠিক?
তা কাকতালীয় ব্যাপারগুলো আজ এমন হিসেব করে ঘটছিল যে ঘটনাগুলোকে নিতান্তই বেহায়া এবং বেশরম বলতে হয়। বাসটা যখন ল্যান্সডাউন দিয়ে যাচ্ছে তখন আমি দুশ্চিন্তায় রীতিমতো ঘামছি। আপনার হাত এড়ানোর জন্য আমি অগত্যা আচমকাই একটা স্টপে নেমে পড়লাম।
বুঝেছি! বুঝেছি! ওই ন্যাপার দোকানের সামনে তো! দেখুন যোগাযোগ আর কাকে বলে। মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে যাচ্ছি অথচ খালিহাতে। গিন্নি পইপই করে বলে দিয়েছিলেন, ওগো বেয়াই বাড়িতে খালি হাতে যেও না কিন্তু, ভালো দোকান থেকে একশো টাকার ভালো মিষ্টি নিয়ে যেও। কথাটা একদম খেয়াল ছিল না। মনে পড়তেই ওই ন্যাপার দোকানের স্টপে নেমে পড়লাম।
হ্যাঁ, সেখানে একটা বড় মিষ্টির দোকান ছিল বটে।
থাকতেই হবে, নইলে নামব কেন?
কিন্তু মশাই, নেমে আপনি তো দাঁড়িয়ে দোকানের সাইনবোর্ড পড়তে লাগলেন, মিষ্টি তো কিনলেন না।
বলিনি বুঝি আপনাকে? আমারও দেখছি আপনার হাওয়া লেগেছে। জরুরি কথা বেমালুম ভুলে যাই। আসলে সমস্যা হল, আমার বেয়াইমশাই হলেন ব্লাড সুগারের রুগি। চারশোর নীচে সুগার মোটে নামেই না। কিন্তু মিষ্টি খাওয়ার এমনই লোভ যে ঠাকুরের বাতাসা অবধি চুরি করে খান। তাই সে বাড়িতে মিষ্টি নিয়ে যাওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। বাস থেকে নেমেই কথাটা মনে পড়ে গেল বলে আমি আর মিষ্টি কিনিনি।
ব্লাড সুগার খুবই খারাপ জিনিস। আমার বাবারও সম্প্রতি ধরা পড়েছে এবং তাঁরও খুব মিষ্টি খাওয়ার ঝোঁক।
তাহলেই বুঝুন, এক বর্ণ মিথ্যে বলিনি।
আপনি বলেনও ভারী আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে। শুনলে বিশ্বাস করতে ইচ্ছেও করে।
তাই তো বলছি। সত্যি কথার একটা আলাদা জোর আছে। বিশ্বাস না করেই পারা যায় না।
আপনার বড় মেয়ের শ্বশুরবাড়িটা কোথায় যেন?
