কে বলল যাইনি?
আমিই বলছি। আজ মাসির বাড়িতেই একটা বেলা কাটিয়ে দেব বলেই স্থির ছিল। মাসিও আমাকে দেখে বেজায় খুশি। দুপুরে না খাইয়ে ছাড়বে না কিছুতেই। কিন্তু কিছুক্ষণ বসার পরই আমার কেমন উসখুশ শুরু হল।
কেবলই মনে হতে লাগল, লোকটা যে আমাকে ফলো করেছিল সে কি রাস্তায় এখনও ওৎ পেতে আছে? তিনতলার জানালা দিয়ে চেয়ে অবশ্য রাস্তায় আপনাকে দেখতে পাইনি।
আপনার মাসির বাড়ির নম্বরটা বলুন তো?
তিনের সি।
পরেশের বাড়ি তিনের সি বাই ওয়ান। পাশেই। আপনার মেসোমশাইয়ের নাম কি বিপুলকান্তি সেন?
ও বাবা! আপনি যে অনেক খবর রাখেন মশাই?
বিপুল সেন মস্ত অ্যাডভোকেট। পরেশের সঙ্গে খুব দহরম মহরম।
পরেশ গুপ্তর নাম অবশ্য আমি শুনিনি। তবে আপনার কথা সত্যি হলেও অবাক হওয়ার। ঘটনাও অস্বীকার করা যাচ্ছে না। মাসির সঙ্গে অনেকদিন পরে দেখা। সুখ-দুঃখের কথাও মাসির অনেক জমে আছে। কিন্তু উদ্বেগ আর উসখুশনির চোটে আমার দু-দণ্ড বসে থাকার জো রইল না। কেবলই মনে হতে লাগল, লোকটা এখনও নিশ্চয়ই আমার জন্য রাস্তায় অপেক্ষা করছে। মাসি পর্যন্ত আমার অস্বস্তি লক্ষ করে বলে উঠল, কী হয়েছে তোর? অমন ছটফট করছিস কেন? কথাটা ভেঙে মাসিকে বলতেও পারি না, মাসি নিশ্চয়ই হেসে উড়িয়ে দেবে। আমার মতো একজন অপদার্থর পিছু নিয়ে সময় নষ্ট করার মতো আহাম্মক কে আছে বলুন! তাই সামান্য কিছুক্ষণ বসে দুপুরের খাবার না খেয়েই বেরিয়ে পড়লাম।
দুপুরে না খাওয়াটা আপনার আহাম্মকিই হয়েছে। নিশ্চয়ই মাসি আজ ভালোমন্দ বেঁধেছিলেন। বিপুল সেনের অনেক টাকা, রোজই ভালোমন্দ খায় নিশ্চয়ই।
তা কথাটা আপনি খারাপ বলেননি। মাসির রান্নার লোকটি খুবই উঁচু জাতের।
বামুন নাকি?
আরে না, সেই জাতের কথা বলিনি। বলছি হাই গ্রেড রাঁধুনি। চাইনিজ, মোগলাই সব রাঁধতে জানে। আজ তো শুনলুম গুলাবি বিরিয়ানি আর রেশমি কাবাব রান্না হয়েছিল। তা বলে ভাববেন ওরা রোজ এরকম রিচ খাবার খায়। আজ মাসির বেয়াইবাড়ি থেকে কারা যেন আসবে। সেইজন্যেই ওসব স্পেশাল ডিশ।
একটু টেস্ট করে আসতেও পারতেন।
টেস্ট কি মশাই! সত্যি কথা বলতে কি পৃথিবীতে একটা জিনিসই আমি সত্যিকারের ভালোবাসি। আর তা হল খাওয়া। ভালো খাবারের প্রতি আমার আকর্ষণ দুর্নিবার। সুতরাং মাসির বাড়িতে আজ আমার পাত পেড়ে আকণ্ঠ খাওয়ার কথা। কিন্তু তাতে বাদ সেধেছেন আপনি। কে আমাকে ফলো করছে, কেন ফলো করছে সেই দুশ্চিন্তায় আমার অ্যাপেটাইট-টাই আজ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। শেষ অবধি এক কাপ কফি কোনওরকমে খেয়ে বেরিয়ে এলাম। মাসি অবশ্য খুবই মনঃক্ষুণ্ণ হল। হওয়ারই কথা। আমার মা–মাসিরা তিন বোন। একমাত্র আমার মা ছাড়া কারওই ছেলে নেই। দুই মাসিরই দুটি করে মেয়ে। ফলে আমি তাদের খুবই আদরের বোনপো।
আপনারা তো বোধহয় দুই ভাইবোন, তাই না?
আশ্চর্য তো! আপনি কী করে জানলেন?
জানি না তো! আন্দাজে বললাম। আপনি বোধহয় আমার ‘বোধহয়’ কথাটা লক্ষ করেননি!
করেছি। আপনি বলেছেন, আপনারা বোধহয় দুই ভাইবোন, তাই না?
আজ্ঞে হ্যাঁ, আমি তাই বলেছি। অনুমানের ওপর নির্ভর করে।
অদ্ভুত আপনার অনুমানশক্তি। অবশ্য যদি সেটা সত্যিই অনুমান হয়ে থাকে। আমার মন বলছে আপনি আমার বিষয়ে সব খোঁজখবরই রাখেন।
আরে না না। আপনি সন্দেহবাতিকে ভুগছেন। এই তো একটু আগেই আপনি বললেন পরেশ গুপ্তের নাম আপনি শোনেননি। যদি তা নাই–ই শুনবেন তাহলে পরেশ যে গুপ্ত তা কী করে জানলেন বলুন তো! আমি আপনাকে পরেশের নামটা বললেও পদবিটা কিন্তু বলিনি। পরেশ যে গুপ্ত তা তো আপনার জানার কথাই নয়।
বলেছি নাকি?
হ্যাঁ বলেছেন।
তাহলে না জেনেই আন্দাজে বলেছি।
আমিও তো সেটাই বলতে চাইছি। আন্দাজে বলা অনেক কথা মিলে যায়।
আপনি খুব বুদ্ধিমান লোক, আর সেটাই ভয়ের কথা।
আপনার রজ্জুতে সর্পভ্রম হচ্ছে।
সেটা হওয়াই বরং ভালো। সর্পতে রজ্জুভ্রম হওয়া যে আরও মারাত্মক।
আপনার বিচলিত হওয়ার মতো কিছুই তো হয়নি!
সেটা আপনিই বলতে পারেন বটে, কিন্তু আমার সিচুয়েশনে পড়লে বিচলিত না হয়ে আপনারও উপায় থাকত না। কারণ মাসির বাড়ি থেকে দুপুরবেলা বেরিয়ে আমি আপনাকে কোথাও দেখতে না পেয়ে তাড়াতাড়ি কেটে পড়ার তালে ছিলুম। কিন্তু হঠাৎ দেখলুম আপনি মোড়ের পানের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে একজন মোটাসোটা লোকের সঙ্গে কথা কইছেন এবং আমার দিকেই তাকিয়ে আছেন। এমনকি সঙ্গের লোকটাকে ইশারা করে আমাকে দেখিয়ে। দিলেন বলেও আমার মনে হল। কারণ লোকটাও হঠাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে আমাকে দেখল।
আহা, ওই তো পরেশ। ব্যাপারটা হয়েছিল কি, পরেশের বাড়িতে আমার একটু কাজ ছিল। সেটা সেরে বেরোতে যাব, পরেশ বলল , চলো দাদা, তোমাকে মোড় অবধি এগিয়ে দিই, কয়েক খিলি পানও কিনতে হবে। আমার আবার শিবুর পান ছাড়া চলে না। তা তাই পরেশের সঙ্গে দাঁড়িয়ে একটু কথা কইছিলুম। খারাপ কথাও কিছু নয়। বাগবাজারের এক গলির মধ্যে আমার পৈতৃক বাড়ি। তিনতলা বেশ বড় বাড়িই। তা পুরোনো বাড়ি ভেঙে বহুতল করার একটা কথা চলছে। কিন্তু বাদ সাধছে করপোরেশন। তারা বলছে ওই সংকীর্ণ গলির মধ্যে বহুতলের পারমিশন দেওয়া অসম্ভব। তা সেসব নিয়েই পরেশের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। বলতে কি আপনাকে আমি লক্ষই করিনি।
