তা আমাকে দেখে কী মনে হয় আপনার?
শার্লক হোমস হলে বলতে পারতুম। তবে এমনিতে আপনাকে একজন মধ্যবয়স্ক, মধ্যবিত্ত, মধ্যশিক্ষিত, মধ্যম উচ্চতা ও মধ্যম স্বাস্থ্যের ভ ভদ্রলোক বলেই মনে হয়। একজোড়া সন্দেহভাজন জম্পেশ গোঁফ থাকলেও আপনাকে ভয়ঙ্কর মানুষ বলে মনে হয় না। আর ওইটেই হয়েছে মুশকিল। আজকাল লোক দেখে চেনার উপায় নেই কিনা।
কথাটা যে খুব ভুল বলেছেন তা নয়। আমি ভয়ঙ্কর লোক নই। তবে আমাকে যে কেন পুলিশ বলে আপনার মনে হল সেইটেই বুঝতে পারছি না।
বলছি বলে কিছু মনে করবেন না। আজ ছুটির দিনটা বাড়িতে বসে কাটাব না ঠিক করে সকালে রুটি তরকারি খেয়ে যখন বেরোলাম তখন শরৎকালের আকাশ দেখে মনটা ভারী খুশি হয়ে উঠল। শরৎ আমার ভারী প্রিয় ঋতু। যদিও কলকাতা শহরে শিউলি বা কাশফুল বড় একটা দেখা যায় না, হিমেল ভাবটাও ডিজেল আর জনসংখ্যার জন্য তেমন নেই। তবু যাকে বলে স্মৃতিতাড়িত হয়েই বেরিয়ে পড়েছিলুম। ভাবলুম আজ একটু প্রকৃতিচর্চা করে কাটাব।
আপনি কি একটু প্রকৃতি-প্রেমিক?
প্রকৃতিপ্রেমিক কে নয় বলুন তো! আমাদের পূর্বপুরুষেরা তো বনজঙ্গলেই থাকতেন। ফলে এর একটা উত্তরাধিকার আমাদের রক্তে আছেই। ইট, কাঠ, পাথরের মধ্যে নিজেকে মানিয়ে নিই। বটে, কিন্তু প্রকৃতি আমাদের সর্বদাই ডাকে।
অতি সত্য কথা। তাই আজ প্রকৃতির ডাকে বেরিয়ে পড়লেন বুঝি?
হ্যাঁ। তবে কলকাতায় প্রকৃতির জনপ্রিয়তা এতই বেশি যে কোথাও গিয়ে শান্তি নেই। ময়দানে যান, গুচ্ছের লোক। লেক–এ যান, গুচ্ছের লোক। নিরিবিলিতে যে উড়ুউড়ু মন নিয়ে বসে থাকবেন তার জো নেই। তাই আজ ভাবলুম, লোকাল ট্রেনে চেপে বারুইপুর কি লক্ষ্মীকান্তপুর কিংবা ক্যানিং কোথাও গিয়ে কয়েক ঘণ্টা কাটিয়ে আসি।
তা গেলেন না কেন?
আরে মশাই, সেই কথাই তো বলছি। বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাস স্টপে গিয়ে দাঁড়িয়েছি, তখনই দেখতে পেলুম বাসস্টপে একটা লোক আমাকে আড়ে-আড়ে লক্ষ করছে। এ ব্যাপারটা কিছু অভিনব। কারণ আমাকে লক্ষ করার মত কিছু নেই। আমি অতি সাদামাটা, নগণ্য মানুষ। অথচ লোকটা বারেবারেই আমার দিকে বেশ তীক্ষ্ণ চোখে তাকাচ্ছিল। এবং সেই লোকটা আপনি।
তা হবে হয় তো। আমি ইচ্ছে করেই যে তাকাচ্ছিলাম তা নয়। আসলে আমি খুব ভুলো মনের মানুষ। ভাবতে-ভাবতে কোনও দিকে হয়তো তাকিয়ে থাকি, কিন্তু কিছু দেখি না।
আপনাকে খুব আনমনা লোক বলে মনে হয় না কিন্তু।
কিন্তু একটু আগে আপনিই তো বলছিলেন তোক দেখে কে কেমন তা ঠিক বোঝা যায় না।
হ্যাঁ মশাই, তা বলেছি। তাহলে আপনি নিজেকে ভুলো মনের মানুষ বলেই দাবি করছেন? দাবিদাওয়া কীসের? আমি ভুলো মনের মানুষ কি না তাও সঠিক জানি না। তবে গত তেত্রিশ বছর ধরে আমার বউ বলে আসছে আমি নাকি বেজায় ভুলো মনের মানুষ। বউ যা বলে তা নাকি আমি বেমালুম ভুলে যাই। শুনে শুনে আজকাল কথাটা আমার বিশ্বাস হয়ে গেছে।
কিন্তু মুশকিল কি জানেন, বাস স্টপে আমি আপনাকে এড়ানোর জন্য তিনটে বাস ছেড়ে দিই। বাস ফাঁকাই ছিল, তবু আমি উঠিনি। দেখলুম, আপনিও হিসেব কষেই ওই তিনটি বাস ছেড়ে দিলেন।
তাই নাকি?
আজ্ঞে হ্যাঁ। ঠিক তাই। চতুর্থ বাসটায় উঠতেই দেখলুম আপনিও উঠে পড়েছেন। তখনই মনে একটা খটকা লাগল।
খটকা! খটকা লাগবে কেন? এরকম তো হতেই পারে। প্রতিদিন এই কলকাতা শহরেই কত লোক তিনটে বাস ছেড়ে দিয়ে চার নম্বর বাসে ওঠে। এতে খটকা লাগার কী আছে? আপনি একটু সন্দেহবাতিকগ্রস্ত, তাই না?
সন্দেহ তো এমনি হয় না মশাই, কারণ থাকলেই হয়। শ্যামবাজার থেকে শেয়ালদা যেতে যেতে আমি বারবারই লক্ষ করছিলাম যে, আপনি আমার ওপর নজর রাখছেন। আমি তখন আকাশ পাতাল ভেবেও বুঝতে পারছি না আমার ওপর কারও নজর রাখার কারণ কী হতে পারে। তাই আপনাকে বাজিয়ে দেখার জন্যই আমি শেয়ালদা না গিয়ে মানিকতলার মোড়েই নেমে পড়লুম। কাছেই আমার মেজো মাসির বাড়ি। অনেক কাল যাওয়া হয় না। প্রকৃতিচর্চা ছেড়ে অগত্যা মাসির বাড়িতেই এ-বেলাটা কাটিয়ে দেব বলে মনস্থির করে ফেললুম। কিন্তু কী আশ্চর্য! দেখলুম আপনিও ঠিক ওই স্টপেই নেমে পড়েছেন এবং দিব্যি আমার পিছু পিছু আসছেন।
আপনার কি মনে হয় যে মানিকতলায় আমারও কেউ থাকতে নেই? বললে হয়তো বিশ্বাস করবেন না, ওই মানিকতলায় আমার জ্যেঠতুতো ভাই পরেশের বাড়ি। পরেশ বেশ নামকরা লোক, করপোরেশনের কাউন্সিলার। সমাজসেবা–টেবা করে। শোনা যাচ্ছে সামনের ইলেকশনে। এম এল এ হওয়ার জন্যও ভোটে দাঁড়াবে।
খুব ভালো কথা। ফ্যামিলিতে একজন পলিটিক্যাল লোক থাকা খুব ভালো। বিপদে আপদে খুব কাজ দেয়।
তা যা বলেছেন। আজকাল পলিটিক্স ছাড়া বেঁচে থাকাই শক্ত।
দুঃখের বিষয় কী জানেন? আমার কোনও পলিটিক্যাল দাদা বা ভাই নেই। পলিটিক্যাল মুরুব্বি না থাকায় আমাদের মতো সাধারণ মানুষকে নানা ধরনের ইনসিকিউরিটিতে ভুগতে হয়। খুঁটির জোর না থাকার ফলে আমরা কোনও সাহসের কাজই করতে পারি না।
খুবই ঠিক কথা। আজকাল সাহসের কাজ না করাই ভালো। অন্যায়ের প্রতিবাদ বা অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এসব করতে গেলে উলটো বিপত্তি হতে পারে।
হ্যাঁ। তা শেষপর্যন্ত আপনি তো আপনার ভাই পরেশবাবুর বাড়িতে যাননি!
