হঠাৎ ঝাঁক করে মাথাটা পরিষ্কার হয়ে গেল তারকের। এ শালারা ভাড়াটে খুনে নয় তো?
চুলের মুঠি ধরে হেঁচড়ে সিঁড়ি দিয়ে নামিয়ে আনছে মলয়াকে। একজন খেটে মোটা একটা লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছে অমানুষিক জোরে। হাড়গোড় ভেঙে যাওয়ার কথা।
আঁ-আঁ-আঁ-আঁ চিৎকারটা চারদিকে ছড়িয়ে যাচ্ছে সাইরেনের মতো। সেই চিৎকারে মড়া মানুষও শিউরে উঠবে। মশালের আলোয় তারক দেখতে পেল, মলয়ার মুখ দিয়ে রক্ত গড়াচ্ছে।
উঠোনের লোকটা ছোরা হাতে এগিয়ে যাচ্ছিল মলয়ার দিকে।
তারক জন্মে মারদাঙ্গা করেনি। সে ভিতু মানুষ। কিন্তু আজ মাথাটা যেন বড্ড তেতে গেল হঠাৎ। চারদিকে ঢেলা আর ইটের অভাব নেই। পুরোনো বাড়ির ভাঙা টুকরো চারদিকে ছড়ানো। তারক একখান ইটের টুকরো তুলে খানিক দৌড় দিয়ে টিপ করে মারল। একটা, দুটো, তিনটে…
মার শালাকে! মার শালাকে…বলে চেঁচাচ্ছিল তারক।
তার পয়লা ইটেই ছোরাওলা মাথা চেপে বসে পড়েছিল। আর ইটগুলো লাগল কি না কে জানে, তবে তোকগুলো ভড়কে ছিটকে গেল এদিক-ওদিক। তারক লাফ দিয়ে গিয়ে উঠোনে ঢুকল।
সামনে একটা ঘেঁটে লাঠি পড়েছিল। সেইটে তুলে নিল সে। তারপর বসা ডাকাতটা উঠতে যেতেই পাগলের মতো মারতে লাগল তাকে।
কে একজন চেঁচাল, পালা–পালা…লোক আসছে…
ডাকাতের জান বলে কথা। অত পিটুনি খেয়েও লোকটা হঠাৎ উঠে প্রাণভয়ে দৌড় লাগাল। কে কোথায় গেল কে জানে। তবে মেয়েটা বেঁচে গেল এ যাত্রা।
গাঁয়ের লোক বোধহয় তারকের সাহস দেখেই বেরিয়ে এল এতক্ষণে। লহমায় লাঠিসোঁটাধারী পুরুষ আর মেয়েছেলেতে উঠোন ভরতি। মেয়েদের কারও হাতে বঁটি অবধি। চেঁচামেচিতে কান পাতা দায়।
মলয়াকে ধরে তুলতে হল। বোবা মেয়েটা থরথর করে কাঁপছে, চোখে ভূতুড়ে দৃষ্টি। সোজা হয়ে দাঁড়াতেও পারছে না। তারক পাঁজাকোলে করে তাকে ঘরে এনে শোওয়াল বিছানায়। মেয়ে দুটো চেঁচিয়ে কাঁদছে।
নরেনবাবু কোথায়? নরেনবাবু কি খাটের নীচে নাকি? নাকি পালিয়ে গেছেন? এসব নানা জন জিগ্যেস করতে লাগল।
একজন মুনিশ এগিয়ে এসে বলল , বাবু আজ সাতসকালেই একটু শহরে গেছেন। আজ ফিরবেন না।
তারকের গা জ্বালা করছিল হঠাৎ। নরেনশালাই মলয়াকে খুন করতে লোক লাগায়নি তো। শালার যে যমুনার ওপর দারুণ লোভ। তারকের কাছে বিয়ের প্রস্তাব অবধি দিয়ে রেখেছে।
মাথাটা বড্ড গরম হচ্ছিল তারকের। সবাই এসে পিঠ চাপড়ে যত তার বীরত্বের প্রশংসা করছিল আর ততই তারকের গায়ের রোঁয়া দাঁড়িয়ে যাচ্ছিল রাগে। ব্যাপারটা তার কাছে। পরিষ্কার। ডাকাতি নয়, ডাকাতরা অকারণে খুন করে না। এরা খুন করতেই এসেছিল।
তপন হালদারের ছেলে মিতুল মোটরবাইকে করে কালীপুর থেকে মন্মথ ডাক্তারকে নিয়ে এল। গাঁয়ে হোমিওপ্যাথি জগন্নাথ কী সব ওষুধ খাইয়ে দিয়েছিল মলয়াকে। যাই হোক বউটার চোট তেমন মাত্রাছাড়া নয়। মন্মথ ডাক্তার দেখেটেখে বলল , হাড়–টাড় ভাঙেনি। তবে ভোগান্তি আছে।
তারক ভিড়ের বাইরে উঠোনের এক ধারে এসে দাঁড়িয়ে ওপরে চেয়ে আকাশটা দেখল। সে অমানুষ ঠিকই, কিন্তু তার চেয়েও ঢের অমানুষ তো পৃথিবীতে আছে দেখা যাচ্ছে।
কালীপুর থানা থেকে পুলিশও এসে পড়ল জিপে করে। জবানবন্দি দিতে দিতে রাত প্রায় ভোর। তারপর তার বাড়িমুখো রওনা হল। মনটা খারাপ লাগছে। বউটা এঁটো হয়ে পড়ল!
বাঁশঝাড় পেরনোর সময়ে কে যেন বলে উঠল, আমি তো জানতুম তুমি খারাপ লোক নও।
তারক হাঁ।
কে? কে?
আমি।
অন্ধকারেও কি আর চিনতে ভুল হয়?
তুই! তুই নরেনবাবুর সঙ্গে যাসনি?
তোমার কি মুখে কিছু আটকায় না? তার আগে গলায় দড়ি দেব।
তাহলে কোথায় ছিলি?
কোথায় আবার! বউদি লুকিয়ে রেখেছিল নতুন গোয়ালঘরে। ডাকাত যখন পড়ল তখন বেরিয়ে এসে কাণ্ড দেখে খড়ের গাদার পিছনে লুকিয়ে পড়ি। তুমি না এলে আজ কী যে হত!
নরেনবাবু তাহলে কার সঙ্গে গেল?
তার আমি কী জানি! নিয়ে যেতে চেয়েছিল বলেই তো পালিয়েছিলুম।
ও শালা মহা হারামি। একবার ভেবেছিলুম পুলিশকে বলে দিই, খুনটা ও শালাই করাচ্ছিল।
না-না, ওসব বলার দরকার নেই। আমাদের তো এ গাঁয়েই থাকতে হবে। আমরা গরিব
মানুষ।
হুঁ।
আর আমাকে বেচতে চাইবে না তো!
তারক একটু হাসল। তারপর হাত বাড়িয়ে যমুনার একটা হাত ধরে বলল , সেই তারকটা ভেগে গেছে। এখন যে–তারকের হাত ধরে হাঁটছিস সেটা একটা পরপুরুষ।
তারকের হাতে একটা জোর চিমটি কাটল যমুনা।
পারিজাত ও ছোটকাকা
আপনি কি পুলিশের লোক?
কেন বলুন তো! আমাকে কি পুলিশের লোক বলে মনে হয়?
আজকাল কাউকে দেখে কি কিছু বোঝা যায়, বলুন! আমাদের নিমাইবাবুর কথাই ধরুন না কেন! দিব্যি মোটাসোটা, হাসিখুশি, দিলদরিয়া, নির্বিরোধী মানুষ। ভিখিরিকে ভিক্ষে দেন, কীর্তন শুনে কাঁদেন, পাড়ার বাচ্চাদের সঙ্গে ছুটির দিনে ব্যাটবল খেলেন, ঘরে ঠাকুর দেবতার ছবি আছে। অথচ একদিন সকালে তাঁর বাড়ি পুলিশে–পুলিশে ছয়লাপ। তাঁর শোওয়ার ঘরের খাটের তলা থেকে দুটো এ কে ফর্টি সেভেন অ্যাসল্ট রাইফেল, দুটো বেলজিয়ান পিস্তল, আর ডি এক্স, কার্তুজ আরও কী-কী সব যেন বেরোল। আমাদের এক গাল মাছি।
নিমাইবাবু ধরা পড়লেন বুঝি!
পাগল! শুনলুম, ওই থলথলে চেহারা নিয়েও তিনি নাকি নিজের বাড়ির ছাদ থেকে পাশের বাড়ির ছাদে লাফিয়ে পড়ে হাওয়া হয়েছেন। তাই বলছিলুম, লোক দেখে আজকাল আর কে যে কী তা চেনা মুশকিল। শুনলুম নিমাইবাবু নাকি কোন টেররিস্ট দলের সর্দার। বুঝুন কাণ্ড!
