যমুনা রাগ করে বলল , দেখ, আমি সাবিত্রী বেউলো নই, তবে যা বুঝেছি তাই বুঝেছি। আমাকে দিয়ে ওকাজ হবে না।
তুই বোকাও বটে রে! নরেনবাবুর কী মেয়েছেলের অভাব? তোর কত বড় ভাগ্য যে এত মেয়েছেলে থাকতে তুই–ই ও শালার চোখে পড়েছিস। আমি বলি, সময় থাকতে এসব ভাঙিয়ে নে। রূপ–যৌবন সব ভাঙিয়ে মা লক্ষ্মীকে ঘরে এনে তোল আগে।
মা–লক্ষ্মী এমন ঘরে লাথি মারতেও আসবে না। মনটা ঠিক করে ফেলেছিল যমুনা। এখানে থাকলে যে তার আর পরকাল বলে কিছু থাকবে তাও বুঝেছে। কিন্তু যায় কোথা? বাপের বাড়ি বলতে তুলসীপোঁতা গাঁয়ে একখানা ঝুপড়ি। এণ্ডি–গেণ্ডি অনেক ভাইবোনের সংসার। তার বাবা দাদ আর হাজার মলম বিক্রি করে, মা বেচে ঘুঁটে।
৩.
বাঁশঝাড়ের মধ্যে একটা তোলপাড় হচ্ছিল। ভোঁস–ভোঁস শ্বাসের শব্দ, সেইসঙ্গে কে যেন আঁ দাঁড় পাঁ দাঁড় ভাঙচে।
তারক ভয় খেয়ে দাঁড়িয়ে গেল, ও কী গো?
করালী চাপা গলায় বলল , চুপ!
কান খাড়া করে শুনছিল করালী। বাঁশবনের মধ্যে দুটো চোখ চকচক করে উঠল হঠাৎ।
আহ্লাদের গলায় করালী বলল , ওরে পাজি মাগি, এখেনে সেঁধিয়ে রয়েছিস! আয় আয় বলছি শিগগির।
বাঁশবনে প্রলয়ের শব্দ তুলে আর ফোঁসফোঁস করে শ্বাস ফেলতে–ফেলতে গরুটা বেরিয়ে এল। গরু না হাতি বোঝা ভার। বিশাল চেহারা।
উরেব্বাস রে! এই তোমার গোরু?
গরুটা করালীর গা–ঘেঁষে দাঁড়াল, তার গলা এক হাতে জড়িয়ে ধরে করালী বলল , আহা, বাঁজা বলেই ওর মনে সুখ নেই কিনা। মনের দুঃখে মাঝে-মাঝে বনবাসে যায়। ফিরেও আসে। চ’ চ’ পা চালিয়ে চ’। মেয়েটা এতক্ষণে পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসেছে।
তারক একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল , তুমি কপালওলা মানুষ, গরুটা দিব্যি পেয়ে গেলে। এখন আমার বউ কোথা পাই বলতে পারো? আমার কপাল তো আর তোমার মতো নয়।
পাবি–পাবি। বাঁধা বউ যাবে কোথায়? মারধর করিস নাকি?
আরে না। সেসব নয়, নরম–সরম আছে, গায়ে হাত তোলার দরকার হয় না। তবে গোঁ আছে। খুব। যেটা না বলবে সেটাকে হ্যাঁ করায় কার সাধ্যি।
রথতলার কাছ বরাবর করালী বাঁয়ের রাস্তা ধরল, তারক ডাইনে।
সামনেই মলয়া ফার্মেসি। আলো জ্বলছে। দিব্যি পাকা ঘর। দোকানও বড়সড়োই। আজ নরেনবাবু নেই। শ্রীপতি একা বসে মাছি তাড়াচ্ছে।
তাকে দেখে শ্রীপতি বিশেষ খুশি হল না। হওয়ার কথাও নয়। মুখটা আঁশটে করে বলল , বাবু নেই।
আসেনি আজ?
না। সকাল থেকেই পাত্তা নেই। বাড়ি থেকেও লোক এসে খুঁজে গেছে।
অ্যাঁ। তবে তো—
শ্রীপতি চেয়ে আছে। বুকটা ধকধক করছিল তারকের। তাড়ির নেশাটা কেটে যাওয়ার উপক্রম।
গেল কোথায় নরেনবাবু?
শ্রীপতি ঠোঁট উলটে বলল , তা কে জানে। বলে যায়নি কিছু। বাড়ির লোকও খুঁজছে।
দুইয়ে–দুইয়ে তবে কি চারই হল? যমুনা আর নরেনবাবু যদি একসঙ্গেই হাওয়া হয়ে থাকে তো শ্রীপতির জায়গায় সামনের মাসে সে-ই জয়েন দেবে।
তারক বসে গেল।
দোকানে বিক্রিবাটা কেমন হে?
বিক্রি কোথায়? ওষুধের স্টকই নেই।
নেই কেন?
ওষুধ কি মাগনা আসবে? টাকাটা দেবে কে?
কেন, নিতাইবাবু দেবে।
দিচ্ছে কোথায়? অন্য সব কারবারে টাকা আটকে আছে। দোকান চলছে, নমোনমো করে।
ইয়ে–তা উপরি–টুপরি কেমন?
উপরি! সেটা আবার কী? মাসমাইনেরই দেখা নেই তো উপরি।
তারক মৃদু-মৃদু হাসছিল। শ্রীপতি তো আর পাঁঠা নয় যে তার কাছে কবুল করবে।
নরেনবাবু বাড়িতে কিছু বলে যায়নি?
তা কে জানে। ঠসা–বোবা বউ, তাকে বলাও যা না-বলাও তা।
তারক উঠে পড়ল। নাঃ, এতদিনে যমুনার তাহলে সুমতি হয়েছে। নরেনবাবুর সঙ্গেই যদি গিয়ে থাকে–গেছেই–তাহলে তোমার দিয়া কেল্লা। ওষুধের দোকান মানে কাঁচা পয়সা।
ঘরে ফিরে টেমি জ্বেলে বসে-বসে খানিক ভাবল তারক। খবর নিয়েছে, শ্রীপতির মাইনে মাসে তিনশো টাকা। কম কীসের? বসা চাকরি। তার ওপর উপরি তো আছেই।
মনটা বেশ ভালোই লাগছে তারকের। সে টেমি নিবিয়ে শুয়ে পড়ল। কত রাত হবে কে জানে, হঠাৎ একটা চেঁচামেচি শুনে ঘুম ভাঙল তারকের। কোথা থেকে চেঁচামেচিটা আসছে তা প্রথমে ঠাহর হল না। কারও বিপদ আপদ হল নাকি?
দরজা খুলে বেরিয়ে এল তারক। মনে হল পুরো গাঁ–ই চেঁচাচ্ছে। মেয়েপুরুষের গলা শোনা যাচ্ছে।
ডাকাত! ডাকাত!
তারক লাফ দিয়ে উঠোনে নামল। তারপর নরেনবাবুর বাড়ির দিকে ছুটতে লাগল। গণ্ডগোলটা ওখানেই হচ্ছে যেন!
নরেনবাবুদের পুরোনো ভাঙা বাড়ি সারিয়ে দালান তুলে দিয়েছে নিতাই রায়। বেশ বড়সড়ো বাড়ি। উঠোনে ধানের মরাই, টিপকল, পিছনে গোয়াল, পেঁকিঘর। বাড়িটা হাতের তেলোর মতোই চেনে তারক।
চেঁচালেও পাড়ার লোক কেউ বেরোয়নি ভয়ে। বাইরের উঠোনে মশাল হাতে কালিঝুলি মাখা একটা লোক দাঁড়িয়ে। হাতে একখানা বড়সড় ছোরা চকচক করছে। আর ভাঙা দরজা দিয়ে আর দুজন টেনে হিঁচড়ে বাইরে বের করে আনছে নরেনবাবুর বোবা–কালা বউটাকে। বউটার শাড়ি খুলে লম্বা হয়ে ছড়িয়ে গেছে ঘর অবধি। তার মুখে কথা নেই, কেবল আঁ–আঁ চিৎকার।
তারক চেঁচিয়ে বলল , ডাকাতি করছ করো, বউটাকে ওরকম করছ কেন হে? অ্যাাঁ, ওকে ছেড়ে দাও। বোবা–কালা মানুষ।
উঠোনের ছোরা হাতে লোকটা একবার তার দিকে ফিরে দেখে একটা হাঁক মারল, ভাগ শালা শুয়োরের বাচ্চা। পেট ফাঁসিয়ে দেব…
তারক থমকে গেল। হচ্ছেটা কী? ডাকাতি করবি কর। কিন্তু মেয়েছেলেটাকে টেনে বের করছিস কেন? অবোলা মানুষ।
