নরেনবাবু ধীরে-ধীরে এগোচ্ছে। একদিন বলল , নারী আর নদীতে কোনও তফাত নেই, বুঝলি মেয়েছেলে হল বওতা জল, ডুব দিয়ে উঠে পড়ো। নদী কি তাতে অশুদ্ধ হল? এই যে গঙ্গায় কত পাপী–তাপী ডুব দেয়, গঙ্গা কি তাতে ময়লা হয় রে!
আগে যমুনা শুধু শুনত, কিছু বলত না। আজকাল বলে। সে ফস করে বলে ফেলল, তোমার কি কোনও কাজ নেই বাবু? সকালের দিকটায় দোকানে গিয়ে বসলেও তো পারো। শ্রীপতি তো শুনি দোকান ফাঁক করে দিচ্ছে।
নরেনবাবু একটা ফুঃ শব্দ করে বলল , দিক না, তাতে আমার কী? দোকান শ্বশুরের, শ্রীপতিও তার লোক। সে বুঝবে। আমার ওতে মাথা গলানোর কী? আমি খাব–দাব ফুর্তি করব। বোবা কালা বিয়ে করেছি কি মাগনা?
শ্বশুর কি আর চিরকাল থাকবে? দোকান তো তোমারই হবে একদিন।
আমার নয় রে, আমার নয়। দোকান ওই বোবা–কালার নামে। ও আমি চাইও না। দু টাকার জিনিস চার টাকায় বিক্রি করে পয়সা কামানোর ধাতই আমার নয়। আমাকে কি তাই বুঝলি?
আর-একদিন আরও একটু এগোল নরেনবাবু। কথা নয়, একখানা তাঁতের শাড়ি দিয়ে বলল , কাল সকালে পরে আসিস। তোকে মানাবে। এসে একটু ঘোরাফেরা করিস চোখের সামনে।
খুশি হল তারকও। বলল , বাঃ-বাঃ, এই তো কাজ এগোচ্ছে।
তার মানে?
নরেনটা তো ভিতুর ডিম। ভাবছিলুম আর বুঝি এগোবে না।
কী বলতে চাও তুমি বলো তো!
দোষ ধরিসনি। একটু মাখামাখি করলে যদি কাজ হয় তো ভালোই।
তাই যদি হবে তাহলে তো বাজারে গিয়ে নাম লেখালেই পারতুম।
চটিস কেন? পেটের দায় বলে কথা। শ্রীপতি শালা তো শুনছি, কৈলাসপুরে চার কাটা জমি কিনে ফেলেছে।
তাতে তোমার কী?
জ্বলুনি হয়, বুঝলি, বুকের মাঝখানটায় বড্ড জ্বলুনি হয়। ঘরামির কাজ করে করে হাতে কড়া পড়ে গেল, সুখের মুখ দেখলাম না। প্রথমটায় বাধোবাধো ঠেকলেও পরে দেখবি ব্যাপারটা কিছুই না। আমিও যা, ওই নরেনবাবুও তা।
তোমার মুখে পোকা পড়বে।
ওরে শোন, ও চাকরির মতো সুখের চাকরি নেই। মালিক চোখ বুজে থাকে, হিসেব চায় না। এমনটা আর কোথায় পাবি?
এই টানা পোড়েনের মধ্যে দিন কাটছিল যমুনার। একদিন বিকেলে ভিতরের বারান্দায় বসে মলয়ার চুল বাঁধছিল যমুনা। বেশ চুল মেয়েটার। দেখতেও খারাপ নয় কিছু। মায়াও হয়। খোঁপায়। কাঁটা গুঁজে হাত–আয়নাটা মলয়ার হাতে যখন ধরিয়ে দিল তখন হঠাৎ আয়নাটা ফেলে ঘুরে বসল মলয়া। সেই বড়-বড় চোখ। দু-হাতের হঠাৎ যমুনার দু-কাঁধ খিমচে ধরে ঝাঁকায় আর বলে, আঁ আঁ–আঁ–আঁ–আঁ…
ভয়ে আত্মারাম, ডানা ঝাঁপটাচ্ছিল বুকে। কী জোর মেয়েটার গায়ে!
কী করছ বউদি, কী করছ? আমি তো কিছু করিনি।
মলয়া ঝাঁকানি থামিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে চেয়ে রইল তার চোখের দিকে। তারপর সাপে ব্যাং ধরলে ব্যাং যেমন শব্দ করে তেমনি এক অবোধ শব্দ বেরোতে লাগল তার গলা থেকে। আর দু চোখে জলের ধারা।
নরেনবাবু পরদিনই বলল , শহরে বেড়াতে যাবি দু-দিনের জন্য? শুধু তুই আর আমি। একটু ফুর্তি করে আসি চল।
ফুঁসে উঠতে পারল না যমুনা। তার কি সেই জোর আছে? জোর হল স্বামীর জোর। তার তো সেখানেই লবডঙ্কা। যমুনা সুতরাং অন্য পন্থা ধরে বলল , তোমার শ্বশুরকে যদি বলে দিই তাহলে কী হয়?
ও বাবা! এ যে আমার শ্বশুর দেখায়! কেন রে, শ্বশুরের কাছে কি টিকিখানাও বাঁধা রেখেছি? নিতাই রায়ই বা কম কীসে? পটলডাঙায় তার বসন্তকুমারীর ঘরে যাতায়াত কে না জানে? কী করবে সে আমার? তুই বড্ড বোকা মেয়েছেলে তো!
শোনো বাবু, বউদি কিন্তু সব টের পায়।
সোহাগের কথা আর বলিসনি। টের পায় তো পায়। কী করবে সে?
যমুনার ভাবনা হল। নরেনবাবুর সাহস বড়ই বেড়েছে, এবার তার বিপদ।
শুনে খ্যাঁক করে উঠল তারক, বিপদ আবার কী? তোকে তো কতবার বলেছি, ওতে কিছু হয়। তোর আমিও রইলুম। কখনও কলঙ্ক রটিয়ে তোকে বিপদে ফেলব না। নরেনবাবুর সঙ্গে আমার পষ্টাপষ্টি কথা হয়ে গেছে।
কী কথা?
সামনের মাসে চাকরিতে জয়েন দেব।
নরেনবাবু অন্য মেয়েমানুষ দেখে নেয় না কেন?
যার যাকে পছন্দ। তোকে চোখে লেগেছে। ও বড় সর্বনেশে ব্যাপার। যাকে চোখে লাগে তার জন্য পুরুষমানুষ সব করতে পারে।
আমি কালই বাপের বাড়ি যাচ্ছি। লাথি–ঝাঁটা খাই, শুকিয়ে মরি, তাও ভালো। তবু নষ্ট হব না।
বিপদে ফেললি দেখছি। বলি, আমার মতো একটা মনিষ্যিকে যদি তোর সব দিয়ে থাকতে পারিস তবে নরেনবাবু দোষটা কী করল? সে দেখতে আমার চেয়ে ঢের ভালো। ফরসা চোখমুখে শ্রী–ছাঁদ আছে। আমি তার পাশে কী বল তো!
তুমি আমার স্বামী।
ওই তো তোর দোষ। স্বামীর মতো স্বামী হলেও না হয় বুঝতুম।
তুমি খারাপ লোক নও। তোমাকে লোভে পেয়েছে।
তোর মাথাটাই বিগড়েছে। আমি খারাপ নই? খুব খারাপ। কেউ আজ অবধি আমাকে ভালো। বলেনি।
আমি বলছি। ভালো করে ভেবে দ্যাখো।
নরেনবাবু তোকে চায়। এমনকী এ কথাও বলেছে, সে তোকে বিয়ে করতেও রাজি।
বিয়ে! বলে এমন অবাক হয়ে তাকাল যমুনা যেন ভূত দেখছে।
ভয় পাসনি। তোর একটু ধর্মভয় আছে আমি জানি। আমি সাফ বলে দিয়েছি, বিয়ে–টিয়ে নয় মশাই। আম বউ ছাড়ছি না। দু-দিন চার-দিন বড় জোর।
তোমার একটু বাধল না বলতে? নরকে যাবে যে!
সে দেরি আছে। নরকে মেলা লোকই যাবে। কলিকালে কি নরকযাত্রীর অভাব রে! আগে এ জন্মে কিছু জুত করে নিই। নরক তো আছেই কপালে।
