তারকের হাতে ঘড়ি নেই। আন্দাজে বলল , তা ধরো সাতটা সাড়ে-সাতটা হবে।
উরেব্বাস রে! কেশব হালদার মাল গোটাতে লেগেছে। যাই।
করালী শিসোচ্ছিল।
উঠবে নাকি গোকরালীদা।
করালী একটা হাই তুলে বলল , গরুটার কথাই ভাবছিলুম।
কী ভাবলে?
বাঁজা গরু। পুষতে খরচ আবার বেচতেও মন চায় না। কিনবেই বা কে বল!
তাই বলো, বাঁজা গরু। তা গেছে আপদই গেছে। ভাবনার কী?
আছে রে আছে। আমার ছোট মেয়ে পদীর বড় ভাব গরুটার সঙ্গে।
পাল খাইয়েছ?
কিছু বাকি রাখিনি। আর দুটো গরু বিয়োয়, দুধও দেয়। এটাই দেয় না।
এত বড় হাটে বউ খোঁজা মানে খড়ের গাদায় ছুঁচ খোঁজার শামিল। এসে থাকলেও এত রাত অবধি তো আর হাটের মাটি কামড়ে সে নেই। বউ যদি রাতে না ফেরে তাহলে রাতেও হরিমটর। তারক ভাবছিল আরও কয়েকখানা চপ সাঁটিয়ে নেবে কি না। তারপর এক ঘটি জল খেয়ে নিলেই হল। কিন্তু পয়সার নেশাটা চৌপাট হয়ে গেলে মুশকিল।
২.
পুরুষমানুষ আর মেয়েমানুষের সম্পর্ক নাকি চিড়েন। আ মোলো। সম্পর্কের আবার চিড়েতন, হরতন, ইস্কাপন, রুইতন হয় নাকি? হলেও বাপু, যমুনা কি সেসব বোঝে! তবে কিনা নরেনবাবু ভ ভদ্রলোক, মেলা জানেশোনে। নরেনবাবুর কথা তো আর ফ্যালনা নয়।
একদিন জিগ্যেস করেছিল, চিড়েতনটা আবার কী, বলো তো বাবু?
নরেনবাবু হেসেটেসে বলল , এই ধর তুই আর আমি। আমিও কারও কেউ নই, তুইও কারও কেউ নোস। যেমন জলের মাছ, কে কার মা-বাপ জানে ওরা? তবু তো ডিম ছাড়ছে, বাচ্চা বিয়োচ্ছে। ব্যাপারটা ওরকমই আর কি। চিরন্তন মানে হচ্ছে আদি সম্পর্ক বুঝলি না?
যমুনা বুঝি–বুঝি করেও স্পষ্ট বুঝতে পারছিল না। তবে এটা ঠাহর হল যে, ওই চিড়েতনের মধ্যেই প্যাঁচটা আছে।
প্যাঁচ বুঝতে যমুনার কেন–কোনও মেয়েমানুষেরই দেরি হয় না। যমুনার এই সতেরো বছর বয়স হল। এক বছর হল পুরুষমানুষ ঘাঁটছে। পুরুষটা হল তার বর তারক। একদিন মিটমিট করে হেসে বলেছিল, বাবুর বাড়িতে কাজে যাস, তা কখনও পিট–ঠিট চুলকে দিতে বললে দিস। নরেনবাবুর মেলা পয়সা। পাঁচ বুঝতে যমুনার দেরি হয় না।
আর একদিন বলল , আহা, বাবুর বউটা বোবা, পীরিতের কথাটথা কইতে পারে না। পুরুষমানুষ একটু ওসব শুনতে–টুনতে চায়।
প্যাঁচ। যমুনা বুঝতে পারে। চিড়েতনটা বুঝতেও তার অসুবিধে হয়নি।
নরেনবাবুর বউ মলয়া বোবা–কালা। তবে সে পয়সাওলা নিতাই রায়ের মেয়ে। নিতাই রায় পঞ্চাশ হাজার টাকায় নরেনবাবুকে কিনেছে। এ কথা সবাই জানে। নগদ ছাড়াও বাড়িঘর ঠিকঠাক করে দেওয়া, মেয়ের নামে জমিজমা লিখে দেওয়া তো আছেই। নরেনবাবুকে তাই আর কিছু করতে হয় না। শুয়ে বসে আড্ডা দিয়ে সময় কাটছিল। তবে বেকার জামাই বলে লোকে টিটকিরি না দেয় সেজন্য ইদানীং নয়নপুরের বাজারে একখানা ওষুধের দোকানও করে দিয়েছে। নিতাই রায়। গাঁয়ের দোকান, সেখানে ওষুধ ছাড়াও নানা জিনিস রাখতে হয়। তা নরেন হল বাবু মানুষ। সকালের দিকে শ্রীপতি নামে এক কর্মচারী দোকান দেখে, সন্ধেবেলা নরেনবাবু গিয়ে। ঘণ্টা দুয়েক কাটিয়ে আসে। সেখানে কিছু ইয়ারবন্ধুও জোটে এসে। শোনা যাচ্ছে, নরেনবাবুর গদাইলস্করি চালে সুবিধে হয়েছে শ্রীপতির। সে দু-হাতে লুটে নিচ্ছে। তারকের তাই ইচ্ছে, শ্রীপতিকে সরিয়ে চাকরিটা সে বাগায়।
সোজাসাপটা ব্যাপার। এতে কোনও প্যাঁচ নেই। মানুষ কত কী চায়, আর চাইবেই তো! নেই বলেই চায়। কিন্তু চাইলেই তো হল না। দিচ্ছে কে? আর তখনই প্যাঁচটা লাগে।
মলয়ার দুটো মেয়ে। একটা সাড়ে তিন বছরের, একটা দু-বছরের। তারা কেউ বোবা–কালা নয়। বড়টা পাড়ার খেলুড়িদের সঙ্গে খেলতে শিখেছে, আর ছোেটটা সারা বাড়িতে গুটগুট করে হেঁটে বেড়ায়। এ দুটো মেয়ে হচ্ছে মলয়ার জান। যখন আদর করে তখন খ্যাপাটে হয়ে যায়। আর সারা দিনে মাঝে-মাঝেই মেয়েদের আঁ–আঁ করে ডাকে। মেয়ে দুটো মায়ের ডাক ঠিক বুঝতে পেরে ছুটে আসে। মেয়ে দুটোর দেখাশোনা করত উড়নচণ্ডী পটলী। ছোট মেয়েটা তখন সবে হামা দেয়। পটলী তাকে বারান্দায় ছেড়ে দিয়ে উঠোনে দিব্যি এক্কা–দোক্কা খেলছিল। মেয়েটা গড়িয়ে পড়ে হাঁ করে এমন টান ধরল যে দম বুঝি ফিরে পায় না। মাথা ফুলে ঢোল। শোনার কথাই নয় মলয়ার। তবু মায়ের মন বলে কথা। কোথা থেকে পাখির মতো উড়ে এসে মেয়ে বুকে তুলে নিল। তারপর সে কী তার ভয়ঙ্কর চোখ আর ভৈরবী মূর্তি। পটলী না পালালে বোধহয় খুনই হয়ে যেত মলয়ার হাতে। বোবাদের রাগ বোধহয় বেশিই হয়। কথা দিয়ে দুরমুশ করতে পারে না, গালাগাল দিয়ে বুক হালকা করতে পারে না, তাই ভিতরে ভিতরে পোষা রাগ গুমরে ওঠে।
পটলীর জায়গায় এখন যমুনা। মেয়েদের দেখে শোনে, ধান শুকোয়, উেঁকি কোটে, গেরস্ত বাড়িতে তো কাজের আকাল নেই। আবার ছুটে গিয়ে ঘরের অকালকুষ্মাণ্ড ওই তারকের জন্যও বেঁধে রেখে আসতে হয়। তা বলে খারাপ ছিল না যমুনা। খাটনিকে তো তার ভয় নেই, চিরকাল গতরে খেটেই বড়টি হল। কিন্তু ভয়টা অন্য জায়গায়। সে হল ওই মলয়া। বোবা কালা হলে কী হয়, যমুনার বিশ্বাস, মলয়া অনেক কিছু টের পায়। শুনতে না পেলেও টের পায়। মাঝে-মাঝে কেমন যেন বড়-বড় চোখ করে তার দিকে অপলক চেয়ে থাকে। একটু ভয়-ভয় করে যমুনার।
