‘ঠিক জানি না। একদল বেদে এসেছিল লক্ষ করেছেন?’ আমি বুঝলাম। চুপ করে থেকে হঠাৎ জিগ্যেস করলাম, ‘আপনার আঙুল?’
নিবারণ উত্তর দিলেন না। আস্তে-আস্তে ছবিগুলোর মোড়ক খুলে আমার সামনে পেতে দিলেন। প্রথম ছবিটাতে ছিল দুটো ভয়ঙ্কর কালসাপ পরস্পকে জড়িয়ে ধরেছে। আমি আর ছবিগুলো দেখলাম না। দেখবার দরকারও ছিল না।
বুঝলাম, পটুয়া নিবারণকে এবার ঠেকানো মুশকিল হবে। কেন না, তিনি বুঝতে পেরেছেন তাঁর অস্তিত্বের অপরাংশ তাঁর শিল্পকর্মের বিদ্রোহী যাবতীয় ভয়ঙ্করতা ও হিংস্রতাকে ভক্ষণ করতে সক্ষম।
পরপুরুষ
করালী গরু খুঁজতে বেরিয়েছিল। আর তারক বেরিয়েছিল বউ খুঁজতে।
কালীপুরের হাটে সাঁঝের বেলায় দুজনে দেখা।
বাঁ-চোখে ছানি এসেছে, ভালো ঠাহর হয় না। তবু তারককে চিনতে পেরে করালী বলল , তারক নাকি?
আর বলো কেন দাদা। মাগি সকালে থেকে হাওয়া।
ঝগড়া করেছিস?
সে আর কোনদিন না হচ্ছে! আজ আবার বাগান থেকে মস্ত মানকচুটা তুলে নিয়ে বেরিয়েছে। আমি ভাবলুম কচু বেচতে যদি হাটে এসে থাকে।
বাঁধা বউ, ঠিক ফিরে যাবে। আমার তো তা নয়। গরু বলে কথা, অবোলা জীব। হাটে যদি হাতবদল হয় তো মস্ত লোকসান।
গো–হাটা ঘুরে দেখেছ?
তা আর দেখিনি! পেলুম না।
ভেবোনা। গরুও ফিরবে। চল, পরানের দোকানে বসি।
পরাণ তাড়ির কলসি সাজিয়ে বসে, একখানা বারকোশে ভাঁড় আর কাঁচের গেলাস সাজানো। আশেপাশে খদ্দেররা সব উবু হয়ে বসে ঢকঢক গিলছে। দুজনে সেখানে সেঁটে গেল।
কালীপুরের হাট একখানা হাটের মতো হাটই বটে। দশটা গাঁ যেন ভেঙে পড়ে। জিনিস যেমন সরেস দামও মোলায়েম। এই সন্ধের পরও হ্যাজাক, কারবাইড, টেমি জ্বেলে বিকিকিনি চলছে রমরম করে। হাটেবাজারে এলে মনটা ভালো থাকে তারকের। পেটে তাড়ি টাড়ি গেলে তো আরও তর হয়ে যায়। তবে কিনা বউটা সকালবেলায় পালিয়ে যাওয়ায় আজ সারাদিন হরিমটর গেছে। রান্নাটা আসে না তারকের। ছেলেবেলায় এই কালীপুরের হাটেই এক জ্যোতিষী তার মাকে বলেছিল, বাপু, তোমার ছেলের কিন্তু অগ্নিভয় আছে। আগুন থেকে সাবধানে রেখো। তাই মা তাকে গা ছুঁইয়ে বাক্যি নিয়েছিল, আগুনের কাছে যাবে না। মায়ের কথা ভাবতেই চোখটা জ্বালা করল। মা মরে গিয়ে ইস্তক কিছু ফাঁকা হয়ে গেছে যেন। দুপুরে গড়াননা বেলায় মুকুন্দর দোকানে চারটি মুড়ি–বাতাসা চিবিয়েছিল। এখন খিদেটা চাগাড় মারছে।
করালী যেন মনের কথা টের পেয়েই বলল , নন্দকিশোরের মোচার চপ খাবি?
খুব খাব।
পয়সা দিচ্ছি, যা নিয়ে আয়।
নন্দকিশোরের মোচার চপের খুব নামডাক। সারা দিনে দোকানে যেন পাকা কাঁঠালে মাছির মতো ভিড়। এখন সন্ধেবেলায় ভিড় একটু পাতলা হয়েছে। সারা দিনে না হোক কয়েক হাজার টাকার মাল বিক্রি করে নন্দকিশোরের হ্যাদানো চেহারা। চারটে কর্মচারীও নেতিয়ে পড়েছে যেন।
নন্দকিশোর মাথা নেড়ে বলল , মোচা কখন ফুরিয়ে গেছে। ফুলুরি হবে। তবে গরম নয়।
আহা একটু গরম করে দিলেই তো হয়।
উনুন ঝিমিয়ে পড়েছে বাপু। এখন আঁচ তুলতে গেলে কয়লা দিতে হবে। শেষ হাটে আর আঁচ তুলে লোকসান দেব নাকি দু-টাকার ফুলুরির জন্য?
তা বটে। তারক এধার-ওধার খুঁজে দেখল। শেষে মুকুন্দ দলুইয়ের দোকানে গরম চপ পেয়ে নিয়ে এল।
খালি পেটে ঢুকে চপ যেন নৃত্য করতে লাগল। তার ওপর তাড়ি গিয়ে যেন গান ধরে ফেলল। ভিতরে যখন নাচগান চলছে তখন তারক বলল , কালীপুরের হাট বড় ভালো জায়গা, কী বলো কারালীদা!
জিবে একটা মারাত্মক কাঁচালঙ্কার ঘষটানি খেয়ে শিসোচ্ছিল করালী। এক গাল তাড়িতে জলন্ত জিবটা খানিক ভিজিয়ে রেখে ঢোঁক গিলে বলল , সেই কোমরে ঘুনসি–পরা বয়সে বাপের হাত ধরে আসতুম, তখন একরকম ছিল। এখন অন্যরকম।
তারকের বাঁ-পাশে একজন দাঁত উঁচু লোক তখন থেকে দুখানা সস্তা গন্ধ সাবান বাঁ-হাতে ধরে বসে আছে। ডান হাতে গেলাসে চুমুক দিচ্ছে আর ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সাবান দু-খানা দেখছে বারবার।
পেটের মধ্যে নৃত্যগীত চলছে, মেজাজটা একটু ঢিলে হয়েছে তারকের। লোকটার দিকে চেয়ে বলল , সাবান বুঝি বউয়ের জন্য?
লোকটা উদাস হয়ে বলল , বউ কোথা? ঘাড়ের ওপর দু-দুটো ধুমসি বোন, মা-বাপ। মুকুন্দ বিশ্বেস সাফ বলে দিয়েছে, আগে পরিবার থেকে আলগা হও, তারপর মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দেব।
তা আলগা হতে বাধা কী? হলেই হয়। আজকাল সবাই হচ্ছে।
ভয়ও আছে। মুকুন্দ বিশ্বেসের ছেলের সঙ্গে তার ঝগড়া। মেয়ের বিয়ে দিয়েই মুকুন্দ আর তার বউ আমার ঘাড়ে চাপবার মতলব করছে।
ও বাবা! সেও তো গন্ধমাদন।
তাই আর বিয়েটা হয়ে উঠছেনা।
করো কী?
ভ্যানরিকশা চালাই। নয়াপুর থেকে কেশব হালদারের মাল নিয়ে এসেছি। হাটের পর ফের মাল নিয়ে ফেরা। আর সাবানের কথা বলছ! সে কি আর শখ করে কেনা! লটারিতে পেলুম।
বাঃ। লটারি মেরেছ, এ তো সুখের কথা।
ছাই। ওই যে লোহার রিং ছুঁড়ে– ছুঁড়ে জিনিসের ওপর ফেলতে হয়। রিং-এর মধ্যিখানে যা পড়বে তা পাবে। ফি বার দু-টাকা করে। তিরিশখানা টাকা গচ্চা গেল। তার মধ্যে একবার এই সাবান দু-খানা উঠল। যাচাই করে দেখেছি, এ সাবান চার টাকা পঞ্চাশ পয়সায় বিকোয়।
লটারি মানেই তো তাইরে ভাই। তুমিই যদি সব জিতে যাও তাহলে লটারিওয়ালার থাকবে কী?
দাঁত–উঁচু লোকটা এক চুমুক খেয়ে বলল , সবারই সব হয়, শুধু এই ভ্যানগাড়িওয়ালারই কিছু হয় না, বুঝলে! মা একখানা ফর্দ ধরিয়ে দিয়েছিল, ট্যাঁকে আছে এখনও। সেসব আর নেওয়া হবে না। ক’টা বাজে বলল তো!
