‘দেখব।’ বললাম। কেমন সন্দেহ হল নিবারণের মাথায় কোনও অদ্ভুত ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। কেন না হঠাৎ এক সময়ে বললেন, ‘আমার আঙুলগুলো তো নষ্টই হয়ে যাচ্ছে’–একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘কুসুমকে বলে দেখব, যদি ও আমার ছবি–আঁকার আঙুল দুটো খেয়ে ফেলতে পারে। বলেই পুরোনো ধরনের খিকখিক হাসি হাসলেন নিবারণ। হঠাৎ গলা নামিয়ে বললেন, ‘আপনারা কুসুমকে ভয় করেন, না?’
আমি তাড়াতাড়ি উঠে পড়লাম। পাগল আর কাকে বলে! যখন চলে আসি তখনও নিবারণ বিড়বিড় করে যা বলছিলেন তার অর্থ–ওঁর ছবি আঁকার আঙুলগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে! আমরা ভেবেছিলাম মিস কে. নন্দী দেবী চৌধুরানীর মতো প্রফুল্ল রূপান্তরিত হয়েছেন। কিন্তু ব্যাপারটা যা বোঝা যাচ্ছে তাতে মনে হয় কোথাও কোনও গোলমাল থেকে গেল।
এদিকে গাঁয়ের লোকেরা কে. নন্দী কিংবা নিবারণ কারুরই এই গাঁয়ে থাকা পছন্দ করছিল। তারা বলে বেড়াচ্ছিল কে, নন্দী এবার তাঁর শেষ খেলা দেখাবেন। তিনি বড়ই উচ্চাকাঙ্ক্ষাসম্পন্না মহিলা–সাপ মুরগির পর এবার তিনি আরও বড় কিছুর জন্য হাঁ করেছেন। নিবারণের বিপদ ঘনিয়ে এল বলে। মনে হচ্ছিল কে, নন্দীর সেই শেষ খেলাটা দেখার জন্য অনেকেই অপেক্ষা করছে।
ছবি–আঁকা ছেড়েই দিলেন নিবারণ। ঘর থেকে বড় একটা বেরোতেন না। কিন্তু তাঁর ভিতরে যে একটা বিপর্যয় ঘটে গেছে, একদিন তা প্রমাণ পাওয়া গেল। গাজনের বাজনা শুনে হঠাৎ খেপে গিয়ে ওঁর ঘর ছেড়ে বেরোলেন তিনি। ডেকে উঠলেন–হাত-পা ছুঁড়ে চিৎকার করলেন এবং এইসব ব্যাপারে সম্পূর্ণ অনভ্যস্ত রক্তাক্ত শরীরে অবশেষে বুড়ো শিবতলার বটগাছের নীচে লুটিয়ে পড়লেন। কে, নন্দীর সেবা–যত্নে তাঁর শরীর ক্রমশ সুস্থ হল, কিন্তু রোখ কমল না। পথে পথে ঘুরে বেড়ান আর বুড়ো বাচ্চা সকলকেই ডেকে তাঁর ডানহাতটা দেখান ‘দ্যাখো তো, আমার আঙুলগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে কেন?’
এই সময়ে একদিন রাস্তায় আমার সঙ্গে দেখা। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে কষ্টে চিনতে পারলেন আমায়। বললেন, ‘শুনেছেন কিছু? নিশি দারোগা বলে পাঠিয়েছে যে কুসুমকে ত্যাগ করতে হবে। আশ্চর্য!’
আমি কিছু বললাম না। নিবারণের পিঠে হাত রাখলাম। নিবারণ নিজেই বলে চললেন, ‘কুসুম চলে গেলে আমার আঁকার কী হবে!’
‘আপনি আবার আঁকছেন?’
‘না।’ মাথা নাড়লেন নিবারণ, ‘আমার আঙুলগুলো নষ্ট হয়ে গেছে।’ খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎ বললেন, ‘কিন্তু কুসুমকে আপনারা ভয় পান কেন? আমি তো দেখছি কুসুম সার্কাসে যা করত তাও একটা খেলা। ছবি আঁকা যেমন খেলা, ঠিক তেমনি। কিন্তু মুশকিল–আমরা কেউই অভ্যাস ছাড়তে পারছি না।’ বলেই হঠাৎ হা হা করে হাসলেন নিবারণ ‘কয়েকদিন আগে আমি একটা পায়রা মারলাম। তারপর ঘাড় মটকে সেটার গলার নলীর দিকে অনেকক্ষণ চেয়ে রইলাম।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘মুখ দিতে প্রবৃত্তি হল না। কিন্তু দেখবেন, চেষ্টার অসাধ্য কিছু নেই।’
কয়েকদিন পর নিবারণকে বাস্তবিক দেখা গেল বনডুবির মাঠে–একপাল ছেলেপুলে ঘিরে ধরেছে তাঁক, আর মাঝখানে নিবারণ একটা আধমরা কবুতরের পালক দু’হাতে পটপট করে ছিঁড়ছেন, কাঁচা মাংসের জঙ্গলে ব্যগ্র কামড় বসাচ্ছেন। তাঁর মুখের বিস্বাদ, বমনোদ্রেক সব কিছুই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল।
এরপর প্রায় সব কিছুই ভক্ষণ করবার জন্য ব্যগ্র হয়ে পড়লেন নিবারণ। মাঝে মাঝে জ্যান্ত পাঁঠা–ছাগল কামড়ে ধরেন, কুকুরকে তাড়া করে ফেরেন। দু’বার গাঁয়ের লোক তাঁকে বাঁশ পেটা করে আধমরা করল। লোকে নিবারণের নামের আগে ‘পাগলা’ কথাটা জুড়ে দিল।
আমার মনে হয় নিবারণ ঠিক পাগল হয়ে যাননি। কে, নন্দী সার্কাসে যখন মুরগি এবং সাপ ভক্ষণ করতেন–তখন কেউ তাঁকে পাগল বলেনি, বরং অনেক দূর থেকে পয়সা খরচ করে দেখতে গেছে। নিবারণ সম্পর্কে আমার এই মনে হয় যে তিনি তাঁর শিল্পের অভ্যাস পরিবর্তিত করতে চাইছিলেন মাত্র। মনে হয়েছিল ছবি ছেড়ে বাস্তবিক তাঁর শিল্পগুলি এইবার তাঁকে আক্রমণ করতে শুরু করেছিল। তাই শিপান্তরে যেতে চাইছিলেন মাত্র।
এর কিছুদিন পরে একদল বেদে এল আমাদের গাঁয়ে। নানারকম খেলা দেখাল, ওষুধপত্র শিকড়বাকড় বিক্রি করল। তারপর একদিন ছাউনি গুটিয়ে চলে গেল।
দু-একদিন পর নিবারণ আমার কাছে এসে বললেন, ‘আমার স্ত্রী কুসুমকে আপনি চিনতেন?’
আমি মাথা নাড়ালাম–হ্যাঁ।
হঠাৎ খিকখিক করে হেসে উঠলেন নিবারণ, বললেন, ‘কুসুমের সার্কাসের খেলাগুলো কিন্তু তেমন সাংঘাতিক কিছু ছিল না। ওর চেয়ে সাংঘাতিক খেলা আমিই আপনাকে দেখাতে পারি।’
আমি নিবারণকে দেখছিলাম–আগেকার মতোই আছেন নিবারণ। লক্ষ করলাম তিনি আর। তাঁর ডানহাতের দিকে চাইছেন না এবং তাঁর বগলে মোড়কের মধ্যে কয়েকটা ছবি রয়েছে বলে মনে হল। আমি জিগ্যেস করলাম, ‘কী ব্যাপার?’
খিকখিক করে হাসলেন নিবারণ ‘কুসুমের সেই খেলাটার কথা বলছিলাম। সেই খেলাগুলো আমিই কুসুমকে দেখাতে শুরু করলাম। কুসুম কিন্তু ভয় পেয়ে গেল। খেলা দেখাত কুসুম, কিন্তু ওই খেলা নিজে কখনও দেখেনি সে।’ একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘আমার মতোই অবস্থা হল কুসুমের। তার শিল্পও তাকে আক্রমণ শুরু করল।’
আমি চেয়ে ছিলাম। খানিকটা আন্দাজ করে বিস্মিত না হয়ে আমি প্রশ্ন করলাম, ‘কে. নন্দী কোথায়?’
