আমি ওঁর সামনের সদ্য–আঁকা ছবিটা দেখছিলাম। পালঙ্কের ওপর মিথুনবদ্ধ নগ্ন নর–নারীর ছবি এঁকেছেন তিনি; আর দেখা যাচ্ছে একটা সাপ পালঙ্কের শিয়রে ফণা তুলে পুরুষটিকে দংশন করতে উদ্যত মেয়েটি সাপটাকে দেখছে–অথচ কিছুই করছে না; তার চোখ সম্পূর্ণ নির্বিকার। কিংবা এও হতে পারে যে মিথুন তখন এমন পর্যায়ে যে বাধা দিলে তার মাধুর্য নষ্ট হয়–তাই মেয়েটি যা নিয়তি তাকে মেনে নিচ্ছে।
হঠাৎ খুকখুক করে হাসলেন নিবারণ। আমি উঠে পড়লাম। চলে আসবার সময় কে. নন্দীকে দেখা গেল–ঘোমটা মাথায় সারা বাড়ি ঘুরঘুর করে বেড়াচ্ছেন। মনে হল সম্মোহন কেটে গেছে–সেই আধোঘুম ও অর্ধস্বপ্ন থেকে ম্যানেজারের লাঠির খোঁচায় জেগে উঠেই অমানুষিক খাদ্যবস্তুর সম্মুখীন হতে হচ্ছে না বলে তিনি বোধহয় সুখী। কিংবা কে জানে–আমার দেখার ভিতরে ভুলও থাকতে পারে।
গ্রামে জনশ্রুতি ছিল, নানারকম গল্প প্রচলিত হচ্ছিল। কিন্তু সার্কাসের সর্বভুক মহিলার সঙ্গে পটুয়ার যৌথ জীবন ঠিক কোন পর্যায়ে এসে দাঁড়াল তা বোঝা যাচ্ছিল না। কেন না, নিবারণ আমাদের আর ডাকতেন না, গেলে বিরক্ত হতেন। কে, নন্দীও পাঁচজনের সামনে কদাচিৎ বের হতেন। ক্রমশ বাইরের জগৎ থেকে দুজনেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছিলেন। এরকম ভাবে তাঁরা আর পাঁচজনের মনোযোগ থেকে আত্মরক্ষা করে রইলেন।
দীর্ঘদিন পর আমাকে আর একবার ডেকে পাঠালেন নিবারণ। গিয়ে দেখি আঁকবার ঘরে চুপচাপ বসে আছেন নিবারণ। আমি যেতেই প্রশ্ন করলেন, ‘আমার স্ত্রীকে আপনি চিনতেন?
থতমত খেয়ে উত্তর দিলাম, ঠিক কী বলছেন বুঝতে পারছি না। তবে মিস কে. নন্দীকে আমরা অনেকেই দেখেছি।’
‘আপনি কি বিশ্বাস করেন যে উনি ডাকিনী কিংবা পিশাচ–সিদ্ধ?’
‘না।’
‘তবে?’
‘তবে কী?
খুব চিন্তিত দেখাল নিবারণকে। কুঞ্চিত কপালে ছোট চোখে উনি ওঁর চারদিকে স্থূপাকৃতি পটগুলোর দিকে চেয়ে দেখছিলেন। সেই চেয়ে দেখার ভিতর খানিকটা ভয়ের ভাব ছিল। শুকনো ঠোঁটে জিভ বুলিয়ে উনি বললেন, ‘কুসুম সার্কাসে যা করত তাকে লোকে কী বলে! সেটা শিল্প, না খেলা?’
‘কে কুসুম?’ আমি জিগ্যেস করলাম।
‘কুসুম মানে–’হতচকিত হয়ে উত্তর দিলেন নিবারণ–’আমার স্ত্রী।’
‘কে. নন্দী?’
‘হ্যাঁ।’ মাথা নাড়লেন নিবারণ, ‘আমার সন্দেহ ছিল কাঁচা মুরগি ও সাপের মাথা খাওয়ার ভিতর কোনও শিল্প নেই; আশ্চর্যের বিষয় এই যে, এখন আমার মনে হয় ধারণাটা ভুল।’
আমি কিছু না বুঝে চুপ করে রইলাম।
নিবারণ বললেন, সার্কাসে আপনারা কুসুমকে দেখেছেন, আমি দেখিনি। আমি ওর কথা শুনেছিলাম, ওকে বলা হত পিশাচ–মহিলা।’ আবার ভ্রূ কুঞ্চিত করলেন নিবারণ, ‘কিন্তু আমার কী মনে হয় জানেন?’
‘কী?’
হঠাৎ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন নিবারণ। আর কোনও কথা বললেন না। দেখলাম উনি স্থির দৃষ্টিতে নিজের ডান হাতের দিকে তাকিয়ে আছেন। হঠাৎ বললেন, ‘আমি কুসুমকে বুঝবার চেষ্টা করছি।’ একটু চুপ করে থেকে আবার বললেন, ‘হয়তো একটা জীবন–সময় অনেক কিছুর জন্যই যথেষ্ট নয়।’
নিবারণ কর্মকার সামান্য পটুয়া–তাঁর চিন্তায় কিছু উদ্ভট ব্যাপার ছিল–এইটুকুই আমরা জানতাম। সব মিলিয়ে মানুষটা আমাদের কাছে ছিল মজার। কিন্তু এখন কেমন সন্দেহ হল–নিবারণের গলার স্বরে, চোখের চাউনিতে অন্যরকম কিছু প্রকাশ পাচ্ছে। হঠাৎ উঠে গেলেন নিবারণ, দরজার বাইরে মুখ বার করে কী দেখে নিলেন, ফিরে এসে নিজের ডান হাতের দিকে পূর্ববৎ চেয়ে থেকে নীচু গলায় বললেন, ‘কিছুদিন আগে এক দুপুরবেলা দেখি কুসুম ছাঁচবেড়ার ওপর এসে বসা একটা মোরগের দিকে স্থির চোখে চেয়ে আছে। আমি ওকে ডাকলাম, সাড়া দিল না।’ একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘আপনার কী মনে হয়?
আমি মাথা নাড়লাম–জানি না।
নিবারণ বললেন, ‘আমার মনে হয় স্বাভাবিক মানুষ যা খায়–তা খেয়ে কুসুমের তৃপ্তি হয় না। এ ব্যাপারে আপনি কিছু বলতে পারেন?
আমি আবার মাথা নাড়লাম–না। আমার গা শিউরে উঠছিল।
নিবারণ বললেন, ‘একদিন আমি ওর খেলা দেখতে চাইলাম। ও প্রথমে রাজি হল না। বলল –সার্কাসে যা দেখাত তার সবটাই ছিল কৌশল। কিন্তু আমার সন্দেহ ছিল। অবশেষে একদিন আমার সাধ্য–সাধনায় রাজি হল। গভীর রাত্রে আমার সামনে একটা কাঁচা মুরগি খেল ও। সে দৃশ্য বড় ভয়ঙ্কর।’ বললেন নিবারণ কর্মকার-তাঁর মুখচোখে ভয় ফুটে উঠছিল–যেন চোখের সামনে গভীর রাত্রে একা এক পিশাচ–মহিলার সামনে বসে থাকার সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে এখনও তাড়া করছে। একটু দম নিয়ে বললেন, ‘কল্পনা করুন ঘরের বউ যাকে খুব চিনি জানি বলে মনে হয় হঠাৎ গভীর রাতে তার চেহারা ও স্বভাব বদলে যেতে দেখলে কী মনে হয়!’
আমার কিছুই বলার ছিল না। চুপ করে রইলাম।
নিবারণ বলল , ‘কিন্তু ভেবে দেখলে এ ব্যাপারে বোধহয় ভয়ঙ্কর কিছু নেই।’ বলেই খানিকক্ষণ চিন্তা করলেন নিবারণ, তারপর প্রায় আপন মনে বললেন, ‘ছবি আঁকার সঙ্গে এর তফাত কী? আমি ভেবে দেখেছি–অভ্যাস না কৌশল না অসুখ–কোনটা?’ দীর্ঘশ্বাস ছড়ালেন নিবারণ, আবার নিজের ডান হাতের সন্দেহজনক দুটো আঙুলের দিকে চেয়ে রইলেন। হঠাৎ বললেন, ‘আপনার কি মনে হয় না যে এ ব্যাপারে ওর কিছু করার নেই?’
‘কী রকম?’ আমি প্রশ্ন করি।
হাসলেন নিবারণ কর্মকার ‘যেমন ছবির ব্যাপারে আমার কিছুই করবার ছিল না। নিশি দারোগার মেয়ের ব্যাপারটা ভেবে দেখুন।’
