ঠিক বটে, আজও গোটা দুই বিটকেল মহাকাশযান নেমেছে। লিকলিকে চেহারার কয়েকটা জীব ঘাসপাতা খাচ্ছে আর ইতিউতি তাকাচ্ছে। ভারী ভীতু জীব।
বটেশ্বর হাঁক দিল, ওহে, ভয় নেই, এসো একটু দাবা খেলা যাক।
প্রথমটায় কেউ ভয়ে কাছে এল না। বেশ কিছুক্ষণ ডাকাডাকির পর একটা জীব এগিয়ে এল।
বটেশ্বর মহা খুশি। দাবার ছক সাজিয়ে ফেলল ঘাসের ওপর বসে। জীবটা ব্যাপারটা বুঝতে পারছে না বলে চালগুলো শিখিয়ে দিল। কিন্তু খেলা শুরু হতে না হতেই বটেশ্বর বুঝতে পারল, জীবটা ভারী বুদ্ধিমান। দারুণ খেলছে। বটেশ্বরের চার চারটি জোরালো বল মেরে দিল দশ চালের মধ্যে। বাইশ চালে মাত হয়ে গেল বটেশ্বর। জীবটার গলা জড়িয়ে ধরে বটেশ্বর গদগদ স্বরে বলল , আহা, কী খেলাটাই খেললে হে, দেখার মতো।
পিছন থেকে ঘড়িরামের গম্ভীর গলা বলে উঠল, আপনার লজ্জা করছে না বটেশ্বরবাবু? অন্য গ্রহের জীবদের কাছে হেরে গেলেন! যাই বলুন, আমি ব্যাটাকে ঢিট করছি।
ঘড়িরাম একটু চাঁছাছোলা লোক। বটেশ্বর তাকে ভয়ও খায়। সে তাড়াতাড়ি সরে বসল। ঘড়িরাম বসে পড়ল খেলতে।
জ্যোৎস্নাটা বড় জোর নেমেছে আজ। ভাসিয়ে দিচ্ছে চারধার।
মৃত্যুপুরীর চারজন মুশকো পেয়াদা আজ ডিউটি দিতে লামডিঙের আনাচে কানাচে ঘুরঘুর করে। খুব যে সুবিধে করতে পারে এমন নয়। লামডিঙের লোকদের আয়ু বেজায় লম্বা। আর তাদের কাছে পরোয়ানাও বড় একটা থাকে না যে কাউকে নিয়ে যাবে। তবু লামডিঙে রোজই তারা এসে ঘুরঘুর করে। এখানকার বিখ্যাত জ্যোৎস্নায় বসে একটু গা জুড়োয়। কথিত আছে লামডিঙের জ্যোৎস্নায় গেঁটে বাত, সর্দিকাশি আর বায়ু রোগে খুব উপকার হয়। লামডিঙের বাতাসে হাঁফানি, পিত্তের দোষ আর ধাতু দৌর্বল্য সেরে যায়। লামডিঙের জলের তো তুলনাই নেই, পেটের সব গণ্ডগোল সাফ করে দেয়। লোকে বলে, লামডিঙের লোকদের ইচ্ছামৃত্যু। কিন্তু সেই ইচ্ছাটাও বড় একটা কারও হয় না।
তা পেয়াদারা তবু আসে, আনাচে কানাচে ঘোরে, কারও মরার ইচ্ছে জাগে কি না তা খেয়াল রাখে।
পেয়াদাদের লামডিঙের লোকেরা ভালোই চেনে। তবে বিশেষ পাত্তা দেয় না। দেখা হলেই মুখ ফিরিয়ে নিয়ে চলে যায়।
আজ রাতে পেয়াদারা হরগোবিন্দবাবুর দুশো বাইশ বছর বয়সি ঠাকুমার ঘরের কাছে ঘুরঘুর করল খানিক। যথেষ্ট বয়স হয়েছে। এ বয়সে মাঝে-মাঝে মানুষ শখ করেও তো এক আধবার বলে, আর কেন, এবার মরলেই হয়।
কারও মুখ থেকে একবার এরকম একটু ইচ্ছের কথা বেরোলেই পেয়াদারা অমনি সাপুটে ধরে আত্মাটাকে এক ঝাঁকুনিতে বের করে দেবে। পেয়াদারা হরগোবিন্দর ঠাকুমার ঘরের খোলা জানলায় ঘাপটি মেরে কান পেতে রইল। কিন্তু বুড়ি মহা ট্যাটন। আপনমনে নানা কথা বকবক করে যাচ্ছে বটে, মরবার কথাটি মুখে আনছে না।
সূর্যকান্ত বাগানে বেড়াতে–বেড়াতে ভারী চিন্তিত হাত দাড়িতে বোলাচ্ছিলেন এমন সময় পাশেই হরগোবিন্দর বাড়ির জানালায় চারটে মুশকোমতো লোককে দেখে হেঁকে বললেন, কে। ওখানে?
পেয়াদারা ভারী জড়সড়ো হয়ে কাঁচমাচু মুখে বলল , এই আজ্ঞে, আমরা।
সূর্যকান্ত পেয়াদাদের ভালোই চেনেন।
ছেলেবেলা থেকেই দেখে আসছেন। বললেন, তা সুবিধেটুবিধে কিছু করতে পারলে হে বাপু?
হেড পেয়াদা দুঃখের সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল , আজ্ঞে না, একেবারেই সুবিধে হচ্ছে না। কাজ কারবার লাটে উঠবার জোগাড়।
কেউ মরছে না বুঝি?
মোটেই মরছেন না। সেই বছর দশেক আগে বটেশ্বরবাবাকে জুতমতো পেয়ে গিয়েছিলুম। তারপর থেকে একেবারে জালে মাছিটি পড়ছে না।
বটেশ্বর! কোন বটেশ্বর বলল তো! বেঁটে বটেশ্বর নাকি?
আজ্ঞে তিনিই।
যে দাবা খেলে বেড়ায়।
আজ্ঞে দাবাড়ু বটেশ্বরই বটেন।
সূর্যকান্ত ভারী চটে উঠে বললেন, মরেছে যে খবরটা তো হতভাগা একবারও মুখ ফুটে আমাকে বলেনি। অথচ রোজ দেখা হচ্ছে। এই একটু আগেও তো দেখলুম তাকে।
বোধহয় চেপে যেতে চাইছেন।
সূর্যকান্ত দাড়ি নেড়ে উত্তেজিত গলায় বললেন, চেপে গেলেই হল! জন্মমৃত্যুর একটা রেজিস্টার আছে তো। তা ছাড়া বাঁচা তোক আর মরা লোকে কিছু তফাতও আছে। তফাতটা না থাকলে চলবে কী করে?
হেড পেয়াদা মাথা চুলকে বলল , বটেশ্বরবাবু যে মরেছেন তা তিনি স্বীকার করতেই চান না যে!
মরতে তাকে বলেছিলই বা কে?
নিজেই বলেছিলেন। সেবার বাঘা দাবাড়ু কালীকেষ্টকে হারিয়ে ভারী খুশি হয়ে বলে ফেলেছিলেন, আহা এরকম এক চাল খেলতে পারলে মরে গেলেও দুঃখ নেই। যেই বলা অমনি আমরা ঘপাৎ করে–
বুঝেছি। তা মরাটা খুব কঠিন ব্যাপার নাকি?
আজ্ঞে মোটেই না। ব্যথাটেথা নেই, ধড়ফড়ানি নেই, একেবারে জামা ছাড়ার মতো সহজ ব্যাপার।
সূর্যকান্ত চোখ ছোট করে বললেন, আর সুবিধেটুবিধে কী দিচ্ছ? মানে, একটা লোক কিছু না পেলে খামোখা মরতেই বা যাবে কেন?
হেড পেয়াদা একটু আশার আলো দেখতে পেয়ে ভারী উৎসাহের সঙ্গে বলতে লাগল, আজ্ঞে সুবিধে মেলা। বেঁচেবর্তে যেমন আছেন প্রায় তেমনই থাকবেন। সুবিধে হল, ইচ্ছেমতো অন্তর্ধান। করা যায়। ইচ্ছে হলে গ্রহ নক্ষত্রে ঘুরে আসা যায়। স্বর্গ–মর্ত পাতাল কোথাও যাওয়া আটকায় না। তারপর ধরুন কাজকর্মও কিছু নেই, সারাদিন ফুর্তি করে বেড়ালেই হয়। হোঁচট খেয়ে যদি পড়ে যান, দরজায় যদি আঙুল চিপে যায়, ছাদ থেকে যদি পড়ে যান তাহলেও ব্যথা লাগবে না। তারপর ধরুন, রোগবালাই নেই, খিদেতেষ্টা নেই, খরচাপাতি নেই। একেবারে ঝাড়া হাত-পা। হয়ে গেলেন আর কি।
