জীবনলাল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। বোকা–সুখী মেয়েটিকে বাঁচাতে হবে। বড়-বড় ঢেউ কেটে এগিয়ে গিয়ে জীবনলাল ডোঙাটি ধরল এবং ডাঙায় টেনে আনল।
সঙ্গে-সঙ্গে ঝড় থেমে গিয়ে দিনশেষের সোনালি আলোয় চারদিকটা স্বপ্ন পুরীর মতো হয়ে গেল। আর সেই আলোয় জীবনলালের মুখের দিকে চেয়ে অবাক হয়ে গেল টগর, এরকম দুঃখী সুন্দর মুখশ্রী তো সে এর আগে আর কারও দেখেনি!
জীবনলালও মেয়েটির মুখে একটা বিমর্ষতা লক্ষ করছিল, যা লামডিঙের কোনও মেয়ের মুখে সে কখনও দেখেনি।
ঘেন্টু কদমগাছের ডালে বসে বড়-বড় দাঁত বের করে খুব হি–হি করে হাসছিল। মাঝে মাঝে রগড় না করলে তার পেটে বড় বায়ু হয়।
তা সোনালি আলোটা আজ রইলও অনেকক্ষণ। টগর আর জীবনলালের ব্যাপারটার একটা হেস্তনেস্ত না দেখে সূর্যদেবও পাটে বসতে পারছিলেন না। কোনও কাজ আধখ্যাঁচড়া হয়ে থেকে গেলে তাঁরও ভারী বায়ুর উৎপাত হয়। তাই তিনি সাত ঘোড়ার লাগামটা চেপে রইলেন। ওদিকে চাঁদমামা উঠে পড়েছেন আকাশে, কিন্তু সূর্যদেব বিদেয় না হলে তাঁরও বিশেষ খাতির হচ্ছে না। তাই তিনি রীতিমতো চটে উঠে বললেন, ওরে বাপু, এসব হৃদয়ের কারবারে তোমাকে কে আবার কবে ডেকেছে বলো তো! ওসব আমার কেস। চাঁদ না হলে কি হৃদয় এক হয় রে ভাই। এখন বাড়ি যাও তো, আমার কাজ আমাকেই করতে দাও।
তা চাঁদটাও উঠল আজ বড় জোর। যেন একেবারে পিচকিরি দিয়ে জ্যোৎস্না ছিটোনো হতে লাগল চারধারে। সোনার গুঁড়ো দিয়ে বৃষ্টি ঝরালে যা হয় অবিকল তাই।
তা টগর আর জীবনলাল বাক্যহারা হয়ে পরস্পরের দিকে চেয়ে রইল।
এরপর ঘণ্টাখানেকের ঘটনা আমরা চেপে যাই বরং। তবে ঘণ্টাখানেক বাদে টগর ধরা–ধরা গলায় জিগ্যেস করল, তোমার দুঃখ কি ঘুচেছে?
জীবনলাল ঘাড় কাৎ করে বলল , এক্কেবারে নেই। তবে কী জানো, দুঃখ যে চলে গেল সেটাও একটা দুঃখ। আমার যেন দুঃখ হচ্ছে।
শুধু জীবনলাল আর টগরকে নিয়ে থাকলেই তো আর চাঁদমামার চলে না, তাঁর আরও পাঁচটা যজমান আছে, খদ্দের আছে, ফ্যান আছে। সবাইকেই দেখতে হয়। আজ চাঁদমামার হাতটাও বেশদরাজ। ধামা ধামা সোনার গুড়ো ঢালছেন ইচ্ছেমতো।
সূর্যকান্তের পাকা দাড়িতে সোনার গুঁড়ো মেলাই জমে গেল। তিনি একটা চিরুনি দিয়ে দাড়ি আঁচড়াতে আঁচড়াতে সোনার গুঁড়ো ঝেড়ে ফেলে দিতে লাগলেন। আর সঙ্গে-সঙ্গে ভাবতে লাগলেন, আচ্ছা জীবনলালের দুঃখটা কীসের? দুঃখ জিনিসটাই বা কীরকম? এত বয়স হয়ে গেল, একটু দুঃখ চেখে দেখলে হত। দুঃখের স্বাদই যে বুঝলুম না। ভাবতে-ভাবতে তিনি বাগানে। বেড়াতে লাগলেন।
লামডিঙের বিখ্যাত ভূত হল ঘড়িরাম। সে কাছাকাছি থাকলেই টিকটিক শব্দ পাওয়া যায়। টিকটিক শব্দটা শুনেই সূর্যকান্ত গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, ইয়ে, ওহে ঘড়িরাম, একটা কথা।
ঘড়িরাম অদৃশ্য থেকে দৃশ্যমান হয়ে সামনে দাঁড়াল, তার রীতিমতো জোয়ান চেহারা। মাথাটা কামান। মুখখানা খুব গম্ভীর। ঘড়িরামের বউ মেরিও তার পাশে দাঁড়ানো। ভারী সুন্দর ফুটফুটে মেমসাহেব।
ঘড়িরাম গম্ভীর গলায় বলল , কী কথা?
ইয়ে দুঃখ জিনিসটা কীরকম বলতে পারো?
ঘড়িরাম খুব গম্ভীর হয়ে বলল , দুঃখ কাকে বলে তা জানতাম বটে, কিন্তু অনেককাল হয়ে গেল, এখন আর ঠিক মনে নেই। তবে জিনিসটা খুব খারাপ।
সূর্যকান্ত মাথা নেড়ে বললেন, তাই হবে। কিন্তু জিনিসটা একটু চোখে না দেখলে ঠিক জুত হচ্ছে না।
ঘড়িরাম দুঃখিতভাবে মাথা নেড়ে বলল , আজ্ঞে আমার কিছু করার নেই। দুঃখ জিনিসটা কেমন তা আমিই কবে ভুলে মেরে দিয়েছি।
ঘড়িরাম আর মেরি চলে যাওয়ার পর সূর্যকান্ত একা একা জ্যোৎস্নায় পায়চারি করতে লাগলেন। দুঃখ জিনিসটা ঠিক কীরকম? দুঃখ হলে কীরকম লাগবে?
ঠিক এই সময় জ্যোৎস্না ছুঁড়ে নাট্যকার বিপুলবিহারী দশাসই চেহারা নিয়ে এসে হাজির। বিপুলবিহারীর হাতে একখানা টেস্ট টিউব। তাতে খানিকটা জ্যোৎস্না ভরে নিয়ে একটু নেড়ে ছিপিটা বন্ধ করে দিয়ে বললেন, এই যে সূর্যদা, কী খবরটবর?
আচ্ছা বিপুলবিহারী, দুঃখ জিনিসটা কেমন বলতে পারো?
বিপুলবিহারী প্রবলভাবে অট্টহাস্য করে বললেন, আমি তার কী জানি বলো? সারাদিন নানা নাটকের মহড়া করে চলেছি আপনমনে। সুখ দুঃখ কিছুই টের পাই না। এই জ্যোৎস্নার সঙ্গে খানিকটা গ্লিসারিন মিশিয়ে তবে নায়িকার চোখের জল বানাতে হবে। দেশের এমন দুর্দশা যে নায়িকা কাঁদতে পর্যন্ত শেখেনি। আর শেখাবেই বা কে বলো? এদেশে একটা লোকও কি কাঁদতে জানে? ধরেছিলুম দুঃখী জীবনলালকে, তা সে বলল , আমার বড় দুঃখ, ওসব নাটুকে কান্না শেখানোর মতো মন আমার নেই।
সূর্যকান্ত বললেন, তাই তো হে, এ তো ভারী বিপদের কথা।
বিপুলবিহারী চলে গেল। সূর্যকান্ত একা জ্যোৎস্নায় একটা পাথরের ওপর বসে রইলেন। দুঃখ জিনিসটা না চাখলে মুখটাই যে মাটি হবে তাঁর। দুঃখ জিনিসটা কেমন তা না বুঝলে সুখটাকেই বা চেনা যাবে কী করে? বটেশ্বর আজ রাতে আর-এক পাটি দাবা না খেলে পারবে না। সাধুচরণটা বড্ড অল্পেই হেরে গেল। কিন্তু বটেশ্বর আর খেলুড়ি খুঁজে পাচ্ছে না। এমনকী ঘেন্টুটা অবধি পিছিয়ে গেল দাবার নাম শুনে।
তবে ভয় নেই। লামডিঙের দক্ষিণের বনের ধারে রোজ রাতেই অন্য গ্রহের জীবেরা ঘাসপাতা খেতে তাদের মহাকাশযান করে চলে আসে। বটেশ্বর দাবার ছক বগলে চেপে, হাতে খুঁটির পুঁটুলি নিয়ে সেইদিকেই রওনা হল।
