সূর্যকান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মাথা নেড়ে বললেন, দূর। ও আর এমনকী? সুখে–সুখে জীবনটা একঘেয়ে হয়ে গেল, মরার পরও যদি কেবল সুখ ছাড়া আর কিছু না থাকে তাহলে ফের একঘেয়ে লাগবে। না হে বাপু, মরাটরা আমার পোষাবে না।
হেড পেয়াদা হতাশ হয়ে করুণ গলায় বলল , একবার একটু মরে দেখতে পারতেন কিন্তু। খারাপ লাগত না। শুনতে যতটা খারাপ আসলে মরা ব্যাপারটা ততটা খারাপ নয়।
সূর্যকান্ত মাথা নেড়ে বললেন, উঁহু, অন্য জায়গায় দ্যাখো গে বাপু। আমার কাছে সুবিধে হবে না।
দুঃখী জীবনলাল আর টগর জ্যোৎস্নায় পাশাপাশি হাঁটছিল। সোনার গুঁড়োয় দুজন একদম মাখামাখি। দুজনে খুব ঘেঁষাঘেঁষি। জীবনলাল ফের তার দুঃখের কথাই বলছিল, দুঃখ ঘুচে যাওয়ার দুঃখ।
টগর শুনছিল। শুনতে তার ভারী ভালো লাগছিল।
পেয়াদারা কিছুক্ষণ তাদেরও পিছু নিল। দুঃখের কথা বলতে-বলতে যদি জীবনলালের একবারটি অন্তত মরার ইচ্ছে জাগে। তাহলে ঘপাৎ করে–
তা এইসব নিয়েই হল লামডিং। রোজ সেখানে জ্যোৎস্না ফোটে। রোজ সেখানে অন্য গ্রহের জীব আসে। রোজ ভূতুড়ে আর অদ্ভুতুড়ে নানা ঘটনার স্রোত বয়ে যায়। কিন্তু লামডিঙের গল্প কখনও শেষ হয় না।
নবদুর্গা
গরু দুইতে নারু আসছে ওই যে। বৈষ্ণবদীঘির পার দিয়ে বাঁশতলা পেরিয়ে। ভারী সুন্দর জায়গা ওটা। মিষ্টি তেঁতুলের একটা সার আছে ওখানে। সে ভারী সুন্দর তেঁতুল, পাকলেই মিষ্টি। কিন্তু সেটা বড় কথা নয়। এই বিকেলের দিকে গড়ানে রোদ্দুরের আলোয় ওই তেঁতুলবনে যে আলোছায়ার চিকরিমিকরি তৈরি করে তা যেন রূপকথার মতো।
এ-বাড়ির সবাই গরু দুইতে পারে। তবু নারুকে আসতে হয় লছমীর জন্য। ভারী দুষ্ট গরু। জগা খুড়ো বলে, বাপ রে, ও হল লাথ মারুয়া গরু, ওর কাছে যেতে আছে? অথচ লছমী দুধ দেয়। এককাঁড়ি। আবার লাথি বা টুসো মারতেও কসুর করে না। কিন্তু নারুর কাছে তার মাথা হেঁট। তার কাছে কোনও জারিজুরি খাটে না। নারু খুব যত্ন করে লছমীর পিছনের পা দুটো গামছা দিয়ে বাঁধে। তারপর পেতলের বালতিতে চ্যাংচুং শব্দে দুধ দোয়ায়। লছমী চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে, একটুও দুষ্টুমি করে না।
আচ্ছা নারুদাদা, তোমাকে কি লছমী ভয় পায়?
নারু হাসে। বলে, না রে পাগলি, ভয় পাবে কেন? ও আমাকে ভালোবাসে।
তা তোমাকেই বাসে, আর আমাদের বাসে না কেন? আমরা তো ওকে খড় বিচালি দিই, জাবনা দিই, ভাতের ফ্যান তরকারির খোসা খাওয়াই, কত আদর করি গলকম্বলে হাত বুলিয়ে।
কোনও-কোনও গোরু ও রকম হয়।
জগা খুড়ো বলে, তুমি নাকি মন্তরতন্তর জানো।
খুব হাসে নারু, শোন কথা। মন্তরতর কোথা থেকে জানব? আমাদের কি তত ক্ষমতা আছে? জগা খুড়ো হলো মাথা–পাগলা মানুষ, কত কী বলে।
নবদুর্গার খুব ইচ্ছে করে লছমীর সঙ্গে ভাব করতে। ইচ্ছে হবে না-ই বা কেন? কী সুন্দর দেখতে লছমী! দুধসাদা রঙের ওপর কালো ছোপ। তেমনি মায়াবী দু-খানা চোখ। বলতে নেই, লছমী বেশ বড়সড় গরু, তেজও তেমনি। নবদুর্গার সঙ্গে কি তা বলে লছমীর ভাব নেই? আছে। লছমী যখন মাটির কালো গামলায় জাবনা খায় তখন তো নবদুর্গাই জাবনা নেড়ে চেড়ে দেয়। তখন গলায় হাত বোলালে লছমী ভারী আরাম পায়। কিন্তু তাদের অন্য আর পাঁচটা গরু যেমন মাটির মানুষ আর বাধ্যের মানুষ, ডাকলেই কাছে আসে, লছমী তেমনটি নয়। আর এই যে নারুদার ওপর লছমীর একটু পক্ষপাত এতেও নগদুর্গার একটু হিংসে আছে। হিংসে হবে না, বলো! এত ভালোবাসে সে লছমীকে, আর লছমী কিনা অমন!
নবদুর্গার একটু হিংসে টিংসে আছে বাপু। ওই যে তার খেলুড়ি বন্ধুরা এসে জামতলায় জড়ো হয়েছে ওদের মধ্যে যেমন তোটন আর রমলা তার খুব বন্ধু অন্যরা কি তেমন? তোটনের সঙ্গে পুষ্পর যদি বেশি ভাব দেখতে পায় নবদুর্গা তবে তার হিংসে হয়। কেন, তা কে বলবে।
তোটন অবশ্য বলে, তোর একটুতেই বড্ড গাল ফোলে।
তা ফোলে বাপু, নবদুর্গা মিথ্যে কথা বলতে পারবে না।
জগা খুড়ো ওই যে আছে তার দাওয়ায় এক কোণটিতে। নগদুর্গাদের মস্ত উঠোন। তাও একটা নয়, চারখানা। বেশির ভাগই মাটির ঘর। একতলাও আছে, দোতলাও আছে। হালে একখানা পাকা দোতলাও উঠেছে ওই ধারে। জগা খুড়ো এ-বাড়ির কেউ নয়, আছে মাত্র। তিন কুলে কেউ নেই। ঘরে বসে নানারকম কিস্তুত ওষুধ, আচার এ সব বানায় আর ধর্মের বই পড়ে। এই যে বিকেলটি হয়ে আসছে, এই সময়টায় জগা খুড়ো এসে দাওয়ায় বসবে মাদুর পেতে। সামনে একখানা জলচৌকি, কত কী পাঠ করে সুরেলা গলায়। সন্ধের পর জগা খুড়োকে ঘিরে। বাড়ি আর পাড়ার বউ–ঝি আর বুড়ো–বুড়িদের জমায়েত হয়। জগা খুড়ো একদিন তাকে বলেছিল, নরক কা মূল অভিমান। তোর অত কথায়-কথায় গলা ফোলে কেন রে? ওরকমটা ভালো নয়।
তা কী করবে নবদুর্গা? তার যে হয়! নরক কা মূল অভিমান–কথাটা মনে হলে তার একটু ভয়ও হয়। তার যে কথায় কথায় গাল ফোলে ভগবান? তবে কি নরকেই যেতে হবে তাকে? মাগো! বাজিতপুরের হাটে নরকের একখানা বড় পট দেখেছিল নবদুর্গা। পাজি মেয়েদের কী দুরবস্থা বাবা! ফুটন্ত হাঁড়িতে ফেলছে একজনাকে তো অন্যজনকে চুলের মুঠি ধরে গদা দিয়ে পেটাচ্ছে। একজনকে তো ন্যাংটো করে–মাগো!
দুধে ভরা পেতলের বালতিটা নারুদার হাত থেকে নিতে–নিতে কে জানে কেন নগদুর্গা বলে ফেলল, তুমি খুব ভালো লোক নারুদাদা।
