জীবনলাল চলে গেলে সূর্যকান্ত তাঁর পাকা দাড়িতে হাত বোলাতে-বোলাতে গম্ভীর মুখে আপনমনেই ‘হুঁ’ দিলেন। ব্যাপারটা তাঁর সত্যিই বোধগম্য হচ্ছে না। লামডিঙে দুঃখ! কীসের দুঃখ? কোথায় দুঃখ?
হাতের লাঠিটা বাগিয়ে ধরে তিনি হনহন করে হাঁটতে লাগলেন। সামনে দুঃখ, ওপরে দুঃখ, নীচে দুঃখ। জীবনলাল যেদিকে চায় সেদিকেই দুঃখ দেখতে পায়। সব সময় তার বুক হু-হু করে। চোখ ছলছল করে, মাথার ভিতরটা ধূসরবর্ণ হয়ে থাকে।
কে যেন বলে উঠল, এই যে জীবনভায়া, খবরটবর কী?
জীবন দেখল, বেঁটে মতো একটা লোক বগলে দাবার ছক নিয়ে তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে খুব হাসছে। এ হল বটেশ্বর, ভারী ঝগড়ুটে লোক। প্রায় সকলের সঙ্গেই তার ঝগড়া।
জীবন শুষ্ক মুখে বলল , খবর আর ভালো কী? দুঃখের জীবন যেমন কাটবার তেমনি কাটছে।
দুঃখী জীবনলালের দুঃখের কথা সবাই জানে। বটেশ্বর তাই মাথা নেড়ে বলল , তা তো বটেই। তা আজ কী কাণ্ডটা হল তা কি জানো? সাধুচরণকে দিলুম হারিয়ে। ব্যাটার সঙ্গে অনেকদিন ধরেই একটা ঝগড়া পাকানোর তালে ছিলুম। আজ লেগে গেল। একেবারে গো হারান যাকে বলে তাই হারালুম। দুটো গজ, একটা ঘোড়া, দুটো নৌকা আর মন্ত্রী সমেত হেরে গেল।
লামডিঙের নিয়ম হল, ঝগড়াঝাঁটি চলবে না। তবে নিতান্তই কারও সঙ্গে কারও ঝগড়া লেগে গেলে দু-পক্ষই দাবা খেলতে বসবে। যে জিতবে সে-ই ঝগড়ায় জিতেছে বলে ধরা হবে। দাবা খেলাই হচ্ছে লামডিঙের ঝগড়া।
জীবনলাল গম্ভীর মুখে বলল , তাহলে তো আপনার খুব সুখের দিন আজ।
বটেশ্বর খুশিতে ডগমগ হয়ে বলল , তা তো বটেই। ভারী আনন্দ হচ্ছে।
আমার হচ্ছে না।
এই বলে বিরস মুখে জীবনলাল ফের হনহন করে হাঁটতে লাগল।
উলটোদিকে বটেশ্বরও হাঁটতে লাগল, তবে হনহন করে নয়। সাধুচরণকে যে সে আজ হারিয়েছে এই সাঙ্ঘাতিক খবরটা জনে–জনে দিতে হবে তো। হেঁকে–হেঁকে সে চারদিককে শুনিয়ে বলতে লাগল, দিয়েছি হারিয়ে সিংহের বাচ্চাটাকে। খুব বাড় বেড়েছিল। আজ একেবারে লেজে গোবরে করে ছেড়েছি বাঘের বাচ্চাটাকে।
আসলে বটেশ্বর সাধুচরণকে শুয়োরের বাচ্চা বা কুকুরের বাচ্চাই বলতে চাইছে। তবে এগুলো গালাগাল বলে চিহ্নিত থাকায় লামডিঙের মাতব্বরেরা একদিন পাঁচমাথা এক হয়ে ঠিক করলেন, শুয়োর কুকুরও জন্তু, বাঘ সিংহও জন্তু। আর বাঘ সিংহ কুকুর বা শেয়ালের চেয়ে কিন্তু উঁচু দরের জন্তুও নয়। তবু কুকুরের বাচ্চা বা শুয়োরের বাচ্চা বললে মানুষ রেগে যায়, কিন্তু বাঘের বাচ্চা বা সিংহের বাচ্চা বললে ভারী গৌরব বোধ করে। তাই ঠিক করা হল, কেউ কাউকে শুয়োরের বাচ্চা বলতে চাইলে সিংহের বাচ্চা আর কুকুরের বাচ্চা বলতে চাইলে বাঘের বাচ্চা বলবে। সেই নিয়মই চালু রয়েছে।
অনেকটা হেঁটে ক্লান্ত জীবনলাল একটি বনস্থলীতে ঢুকে পড়ল। লামডিঙে এরকম বড়-বড় কুঞ্জবন মেলা রয়েছে। এসব বনভূমির সৌন্দর্য দেখার মতো। চারদিকে বড়-বড় গাছের অবরোধ পেরিয়ে ভিতরে ঢুকলে ফুলের বন্যা। মাঝখানে দীর্ঘ সরোবর। তাতেও নানা জলজ ফুল ফুটে আছে। নানা আকারের ছোটো বড় বর্ণময় নৌকো বাঁধা রয়েছে ঘাটে। যে–খুশি নৌকাবিহারে বেরিয়ে পড়তে পারে। কুঞ্জবনে অনেক পাখি ডাকছে, প্রজাপতি ও মধুকরেরা উড়ে বেড়াচ্ছে।
জীবনলাল কুঞ্জবনের নরম ঘাসের ওপর বসে জীবনের নানা দুঃখের কথা ভেবে ঘন–ঘন দীর্ঘশ্বাস ফেলতে লাগল। সূর্য অস্তাচলে চলে যাচ্ছে, পাখিরা নীড়ে ফিরছে, দিন শেষ হয়ে আসছে, এসবও জীবনলালের দুঃখের কারণ।
লামডিঙের ভূতেদের খ্যাতি ও অখ্যাতি দুই-ই আছে। তারা ভালোও করে, মন্দও করে। লামডিঙের মজারু ভূত ঘেন্টু একটা কদম গাছের ডালে বসে চারদিককার শোভা দেখছিল। শশাভা দেখতে সে ভারী ভালোবাসে। শোভা দেখতে দেখতে সে হঠাৎ দেখতে পেল, জলের মধ্যে একটা ছোট্ট নীল ডোঙায় একটি ভারী সুন্দরী মেয়ে মুখখানা গোমড়া করে বসে আছে। এরকমটা হওয়ার কথা নয়। লামডিঙে একমাত্র জীবনলাল ছাড়া আর গোমড়ামুখো মানুষ কেউ নেই।
তবে ঘেন্টু ভালো করে নিরীক্ষণ করার পর বুঝল মেয়েটি হল টগর। টগরের একটা দুঃখ আছে ঠিকই। তার বিয়ের বয়স হয়েছে, কিন্তু কোনও ছেলেকেই তার পছন্দ হচ্ছে না। তার কারণ ছেলেগুলো কেমন যেন ছ্যাবলা, মোটা, অতিরিক্ত আহ্লাদী, কোনও কাজের নয়। সেইজন্য ইদানীং টগরের ভারী মন খারাপ যাচ্ছে। ডোঙায় বসে তাই সে নানা কথা ভাবছে।
ঘেন্টু ঘাসবনের মধ্যে দুঃখী জীবনলালকেও দেখতে পাচ্ছিল। বিরস মুখে বসে জীবনলাল ঘন–ঘন দীর্ঘশ্বাস ফেলছে।
ঘেন্টুর মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। সে গাছের ডালে বসে ঠ্যাং দোলাতে–দোলাতে হাতে হাত ঘষে মন্ত্রপূত ফুঁ দিল। সঙ্গে-সঙ্গে চারদিকে একটা ঝড়ের বাতাস উঠল। জলে বড়-বড় ঢেউ দিতে লাগল। ডোঙাটা মাঝ–দীঘিতে ভীষণ দুলতে লাগল। টগর তার বাঁশির মতো গলায় পেঁচিয়ে উঠল, বাঁচাও! বাঁচাও!
দুঃখী জীবনলাল চারদিকে দুঃখের ঝড় উঠতে দেখে আরও মুহ্যমান হয়ে পড়েছিল। সে চোখ বুজে ভাবছিল, এত দুঃখ নিয়ে, দুঃখের ওপর দুঃখ নিয়ে কী করে বেঁচে থাকা যায়?
ঠিক এই করুণ মুহূর্তে তার দুঃখিত হৃদয়কে আরও রক্তাক্ত করে দিতে টগরের আর্তস্বর কানে এসে পৌঁছোল। সে উঠল এবং জলের ধারে গিয়ে অনেক দূরে মাঝদরিয়ায় বিপন্ন ডোঙাটি দেখতে পেল। এই দুঃখময় লামডিঙে বেঁচে থাকার যদি কোনও মানেই হয় না, তবু জীবনলালের মনে হল, এই মেয়েটি হয়তো বাঁচতে চায়। এখানকার বোকা সুখী লোকেরা তো বাঁচতেই চাইবে।
