লালু ধীরে-ধীরে মেঝেতে বসে। তারপর দেওয়ালে হেলান দিয়ে চোখ বোজে। একটাও মার ঠেকাবার চেষ্টা করে না। জুলেখা চিৎকার করে কাঁদতে থাকে, মিলু চিৎকার করে দুজনের মাঝখানে এসে পড়ে, বিলাস তাকে হাতের ঝাঁপটায় সরিয়ে দিয়ে পাগলের মতো আবার আক্রমণ করে লালুকে।
তারপর এক সময়ে সে থামে। চারদিকে চেয়ে দেখে। তার চোখে আতঙ্ক দেখা যায়। সে লালুর রক্তাভ বীভৎস নিস্পন্দ দেহখানা দেখে। হঠাৎ সংবিৎ পেয়ে কেঁপে ওঠে। দৌড়ে আলনা থেকে প্যান্ট টেনে নিয়ে পরে, গায়ে শার্ট চাপায়, খুব তাড়াতাড়ি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে সে।
সদর দরজার কাছে গিয়ে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে ভিতরের ঘরের দিকে চেয়ে বলে–মিলু, মিলু আমাকে ক্ষমা কোরো–লক্ষ্মী সোনা আমার–
দাদাকে দু-হাতে জাপটে বসেছিল মিলু। পাথর হয়ে। তবু বিলাসের কথা তার কানে গেল। হরিণীর মতো সচকিত হয়ে উঠল সে। বিলাস–বিলাস কি তবে ভালোবাসে তাকে? এখনও? চকিতে বিদ্যুৎস্পর্শে উঠে দাঁড়ায় সে। ছুটে আসে দরজায়।
বিলাস সিঁড়ি দিয়ে কত দ্রুত নেমে যাচ্ছে। পালাচ্ছে।
শোনো, শোনো। ডাকে মিলু।
বিলাস তার ভয়ার্ত সুন্দর মুখখানা ঘুরিয়ে থমকে দাঁড়ায়।
দরজার চৌকাঠে হাত রেখে মিলু কাঁপতে থাকে, কাঁদে অস্ফুট গলায় বলে–তুমি কি এখনও আমাকে ভালোবাসো?
বিলাস দু-ধাপ সিঁড়ি উঠে আসে বলে,বাসি মিলু, চিরকাল বেসেছি। তুমি বোঝো না?
মিলু আস্তে করে বলে–তোমায় ভয় নেই, দাদা মরেনি। তুমি তাড়াতাড়ি ফিরো।
বিলাস অবিশ্বাসের চোখে খানিকক্ষণ চেয়ে থাকে। তারপর মাথা নাড়ে। ধীরে-ধীরে সিঁড়ি ভেঙে নেমে যায়।
ভাঙা কাঁচ আকীর্ণ মেঝের ওপর শিশু জুলেখা দাঁড়িয়ে। তার চোখে জল, সে কাঁদছে। এক-পা এক-পা করে এগোচ্ছে লালুর দিকে।
ভাঙা, রক্তাক্ত মুখ তুলে লালু জুলেখাকে দেখল।
–আঃ জুলেখা, চারদিকে কাঁচ মা, তোমার পা কেটে যাবে।
সে ফিসফিস করে বলল ।
জুলেখা তবু ভাঙা কাঁচ মাড়িয়ে এক-পা এক-পা করে আসছে।
চোখের রক্ত মুছে নেয় লালু। তারপর দু-হাত বাড়িয়ে কোলে নেয় জুলেখাকে। শিশুগন্ধে তার বুক ভরে যায়।
–আঃ জুলেখা আমার তেমন লাগেনি মা। আমি ঘোড়া হই, তুমি আমার পিঠে চাপো। লালু শিশু হয়ে থাকে। লালু শিশু হয়ে যায়। ভাঙা মুখ, রক্তাক্ত শরীর, মাথার ভিতরে এক আংশিক অন্ধকার-তবু নিজেকে নিরভিমান লাগে তার। রাগদ্বেষহীন প্রকাণ্ড শিশুর মতো সে জুলেখাকে ভোলাতে থাকে। জুলেখাকে পিঠে নিয়ে আকীর্ণ কাঁচ খণ্ড পয়সা রক্তের ফোঁটার ওপর সে হামা দিয়ে ফেরে সারা ঘর। মুখে তার অনাবিল হাসি।
দরজায় দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা হাঁ করে দেখে মিলু।
দোলা
গাড়ি বদল করতে হয় মধুডিহি জংশনে।
আর যে–গাড়ি নিয়ে যাবে আপনাকে লামডিঙে তা আগাগোড়া ছবি–আঁকা। কী নরম আর চকচকে গদির আসন গাড়ির ভিতরে। আর কী মিঠে ইনজিনের ভেঁপু। কু-ঝিক–ঝিক ট্রেন মধুডিহি ছাড়িয়েই বাঁক নেবে মায়াবী জগতে। সবুজ অরণ্যের ডালপালা এসে হাত বুলোবে রেলগাড়ির গায়ে। একটু দুলে–দুলে চলবে মন্থর গাড়ি। খেয়াল করে শুনবেন গাড়ির চাকা ঠিক যেন পালকির গান গাইছে। কোথাও-কোথাও গাড়ি থামে, জল নেয়। ছোট্ট–ছোট্ট পুতুলবাড়ির মতো রঙিন স্টেশন। রাঙা মোরামে ছাওয়া প্ল্যাটফর্ম নিবিড় গাছের ছায়ায় ঝিম মেরে আছে। অনেক পাখির শিস শোনা যায় আর নেপথ্যে কুলুকুলু কোনও প্রবাহিত ছোট নদীর শব্দ। গাড়ি রেলপোল পার হয়ে মলের শব্দ তুলে। মাঝে-মাঝে ছোট উপত্যকায় দেখা যাবে শান্ত গভীর দল চরছে। দেখা যাবে মাটির ওপর নেমে এসেছে রাঙা গোধূলির মেঘ।
জ্যোৎস্নারাত্রি। আকাশভরা সোনালি চাঁদ। চারদিকে ম–ম করা ফুলের গন্ধ। নাতিশীতোষ্ণ এক বাতাস বয়ে যাচ্ছে। সন্ধের একটু পরেই যখন লামডিঙের ছোট্ট স্টেশনে গাড়িটি থামবে তখন চারদিকে চেয়ে আপনি অবাক হয়ে বলে উঠবেন, আরে! ঠিক এরকম একটা জায়গাই তো আমি খুঁজছিলুম।
সবাই খোঁজে, ভাগ্যবানেরা পৌঁছে যায়।
এরকমই এক জ্যোৎস্নাময় রাতে লামডিঙের একমাত্র দুঃখী মানুষ জীবনলাল পথে–পথে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। তার দুঃখের তেমন কোনও কারণ অবশ্য নেই। কিন্তু কিছু লোক দুঃখী থাকতে ভালোবাসে। জীবনলাল চাঁদ উঠলে দুঃখ পায়, পাখি ডাকলে দুঃখ পায়, ভালো খাবার খেলে দুঃখ পায়, ভালো স্বপ্ন দেখলে দুঃখ পায়। কেবল বলে, চারদিকে এত দুঃখ! এত দুঃখ!
একদিন বুড়ো সূর্যকান্ত জীবনলালকে রাস্তায় পাকড়াও করলেন, হ্যাঁ হে জীবনলাল, তোমার দুঃখটা ঠিক কীসের তা বুঝিয়ে বলতে পারো?
জীবনলাল দুঃখের সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল , আমার দুঃখের কি শেষ আছে? চারদিকে যেন দুঃখেরা ওত পেতে বসে আছে। আকাশেদুঃখ, বাতাসে দুঃখ, জলে স্থলে দুঃখ।
কিন্তু কই আমরা তো কিছু টের পাই না?
এ কথায় জীবনলাল আরও কত দুঃখ পেয়ে বলল , তাহলে কি আমি ভুল বলছি?
সূর্যকান্ত তাঁর লম্বা পাকা দাড়িতে হাত বুলিয়ে বললেন, লামডিঙে থাকতে–থাকতে দুঃখের ব্যাপারটা আর আমার স্মরণ হয় না। খাওয়া পরার দুঃখ নেই, ঝগড়া কাজিয়া নেই, শোক তাপও নেই, তবে দুঃখটা যে কীসের সেটা বুঝতে পারছিনা।
জীবনলাল একটা বুক কাঁপানো দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল , লামডিঙ তো দুঃখেরই দেশ। গাছে গাছে যে ফুল ফোটে ফল ফলে তাও আসলে দুঃখেরই প্রকাশ। আকাশে দুঃখের নীল। দুঃখের জ্যোৎস্নায় চারদিকে বান ডেকে যায়। বড় দুঃখ। বড়ই দুঃখ।
