২.
পাঁচবছর পর।
এখন একা ঘরে লালুর বাস। শরীরটা তেমনি আছে তার। কেবল পেটে চর্বি জমেছে একটু, মাথার চুল কয়েকটা পেকেছে। ছত্রিশে পা দিল সে। চোখে চশমা। মিলুর বিয়ের পরপরই। প্রথমে বাবা গেল এক সকালে। সামনের বারান্দায় বসে ইজিচেয়ারে খবরের কাগজ মুখে ঘুমিয়ে পড়েছিল, আর উঠল না। দু-বছর পর মা। ফাঁকা ঘরে একা থাকে লালু। ভালো লাগে না। দিন। কেটে যায়।
লালু এখন পাড়ার ভালো লোক। লোকে বাকিতে জিনিস পায়, প্রশংসা করে। দোকানটা বিলেত বাকি পড়ে ঝাঁঝরা হয়ে আসছে। লালুর তাতে কিছু যায় আসে না। সে একা। চলে যাবে।
বিকেলের ডাকে মিলুর একটা চিঠি পেল লালু। তাতে লেখা–একবার এসো। খুব জরুরি দরকার।
বুকটা কেঁপে উঠল। মিলু বিয়েটা ভালো করেনি। নিজের পছন্দমতো বর বেছেছিল। ছেলেটা চোখা, চালু। কিন্তু মিলুর সঙ্গে মানায় না। গোত্র কিংবা ঘর ঠিকই ছিল তবু ছেলেটা বড় বেশি। চালু। বহু মেয়েকে বাঁদর নাচ নাচিয়েছে। বিলাসকে তাই পছন্দ হয় না লালুর। কিন্তু মিলুর বর বলে সমীহ করে চলে। সবসময়ে তার বুকের ভিতর খাঁখাঁ করে–মিলুকে নিয়ে থাকবে তো বিলাস? অন্য দিকে ঝুঁকবে না তো?
দোকানের সামনে একটা টুল পেতে শানু বসে থাকে আজকাল। পঞ্চাশ প্রায় ছুঁল সে। তার অর্ডার সাপ্লাইয়ের ব্যাবসাটা জমেনি। জোড়াতাড়া দিয়ে চালিয়ে নিচ্ছে। বয়সের জন্য নয় চিন্তার ভারেই কুঁজো হয়ে গেছে একটু। বয়সের তুলনায় বেশ বুড়ো দেখায়। লালুর সঙ্গে বসে দুরন্ত যৌবনকালের নানা গল্প করে। মাঝে-মাঝে বলে–এসব ঝিমোনো ব্যাবসা কি আমাদের লাইন? চল লালুদা আর-একবার হুজ্জত বাধাই, লুটেপুটে আনি। শেষজীবনটা সুখে কাটিয়ে দিই চলো। আমাদের আমলে এমন সোনার দিন আর আসেনি।
লালু হাসে। চুপ করে থাকে।
চিঠি যেদিন পেল সেদিনও শানু বসে আছে বাইরের টুলে। চিঠিটা ভাঁজ করে বুকপকেটে রেখে লালু উঠল, শানুকে বলল –দোকানটা একটু দেখিস শানু, আমি ঘুরে আসছি।
–চললে কোথায়?
–মিলুটা চিঠি দিয়েছে, কী আবার গোলমাল ওদের। শানু উদাস গলায় বলে–ওসব ছেড়ে দাও, লালুদা, যে যার মতো চলুক। সংসারের কোনও জ্ঞানই তো তোমার নেই।
–তা ঠিক। কিন্তু শানু সারা পৃথিবীতে ওই আমার একটা আপনজন।
শানু ভাবে। ভেবে বলে–সেটা সত্যি। ঠিক আছে। যাও।
.
বাইরের ঘরে উদাস শুকনো মুখে মিলু বসে আছে। তার হাঁটুর কাছে দু-বছরের বাচ্চা মেয়ে জুলেখা। লালুকে দেখে হরিণীর মতো সচকিত তাকাল মিলু।
–কী হয়েছে মিলু।
মিলু ঠোঁটে আঙুল ছুঁইয়ে সতর্ক করে দিল, ইঙ্গিতে শোওয়ার ঘর দেখিয়ে বলল –ও আছে।
হাত ধরে বারান্দায় নিয়ে এল লালুকে। পায়ে-পায়ে ঘুরছে ছোট্ট জুলেখা। তাকে কোলে নিয়ে গায়ের শিশুগন্ধ বুক ভরে নেয় লালু। তার শৈশব ফিরে আসতে থাকে।
–কী হয়েছে?
–সেই একই ব্যাপার। আমাকে ওর পছন্দ নয়। পরশু রাতে মেরেছে।
–মেরেছে?
–হ্যাঁ। এই প্রথম। কিন্তু এখন মারটা চলবে। হাত এসে গেছে।
রাগে বোবা হয়ে গেল লালু, কষ্টে বলল –মিলু তোকে কেউ কখনও মারেনি।
মিলুর ঠোঁট কাঁপতে থাকে। চোখ ভরে জলে আসে।
–খুব লেগেছিল?
মিলু মাথা নাড়ে। লেগেছিল।
–ও কী চায়?
–কী জানি। বলে মিলু কাঁদতে থাকে।
–ও, তোকে চায় না।
–না।
–তবে আমার কাছে চল মিলু। বেশ থাকব ভাইবোনে।
–না। মাথা নাড়ে মিলু।
–তবে কী করবি?
–সেজন্যই তো তোমাকে ডেকেছি। কী করব বলো?
লালু, একটা শ্বাস ছাড়ে। বলে–ওর সঙ্গে একটু কথা বলি।
জুলেখাকে নামিয়ে দিয়ে লালু ঘরে আসে।
বিলাস বিছানায় শুয়ে আছে। ভারী ক্লান্ত আর রোগা দেখাচ্ছে তাকে। বিমর্ষ মুখ।
–বিলাস।
–উঁ!
–কী হয়েছে?
–বিলাস চোখে চায়। আস্তে করে বলে–ওকে জিজ্ঞাসা করুন।
–করেছি। তুমি ওকে মেরেছ। কেন?
বিলাস ঠোঁট উলটে বলে–ইচ্ছে।
–কেন মারবে? ওকে কেউ কখনও মারেনি।
–আমি মেরেছি। আমার ইচ্ছে। কার বাবার কী?
লালু ধমকায়। সমস্ত শরীর থরথর করে কাঁপে।
–তার মানে?
বিলাস উঠে বসে, একটা সিগারেট ধরায়। তারপর আস্তে-আস্তে বলে, শোধ নেবেন? নিন না! কিন্তু বলে রাখছি, ও আবার মার খাবে।
–না খাবে না।
–খাবে। কোনও শুয়োরের বাচ্চা ঠেকাতে পারবে না-
পলকে সব ভুল হয়ে যায়। ছত্রিশ বছর বয়স, চোখের চশমা–সব ভুল হয়ে যায়। পনেরো যোলো বছর আগেকার এক জ্যোৎস্নায় আলোকিত নির্জন চাতাল মনে পড়ে কেবল। আর শরীরের মধ্যে ঝড় ওঠে বহুকাল বাদে।
প্রকাণ্ড হাতখানা বাড়িয়ে বিলাসকে শূন্যে তুলে নেয় লালু। অন্য হাত আঘাতের জন্য উদ্যত।
মিলু ছুটে আসে, চিৎকার করে বলে–দাদা, মেরো না। মরে যাবে।
হকচকিয়ে যায় লালু। ঠিক তো! এইভাবে একদিন ননী গিয়েছিল তার হাতে। তারপরও পটা ওস্তাদের কাছে শেখা মার। কাজটা ঠিক হবে না। শিশুর মতো দু-হাতে ধরে বিলাসকে আবার মেঝের ওপর ছেড়ে দেয় লালু।
কিন্তু বিলাস ছাড়ে না। পয়সা জমানোর একটা মাটির ঘট রাখা আছে তাকে। বিলাস প্রথমে পাগলের মতো সেইটে ছুঁড়ে মারে।
ভারী ঘটটা মাথায় লেগে চৌচির হয়ে ভেঙে যায়। লালুর সমস্ত শরীর বেয়ে পয়সার ধারা নেমে ঘরময় ছড়ানো থাকে। ক্ষীণ একটা রক্তের ধারা সেই সঙ্গে। বিলাস ছুঁড়ে মারে জুলেখার খেলনা, কালির দোয়াত, পেপারওয়েট। তাতে খুশি হয় না। দু-হাতে ঘুষি মারে লালুর মুখে, পেটে মারে লাথি। বিলাসের বাবার একটা ভারী বাঁধানো ফটোগ্রাফ ছিল দেওয়ালে। রাগে পাগল হয়ে সেইটে টেনে আনে সে। কানা দিয়ে উপর্যুপরি মারতে থাকে মাথায় মুখে। কাঁচ ভেঙে ঢুকে যায় লালুর চামড়ায়।
