এক সময়ে নাগরমলকে লক্ষ টাকার মাল দিয়েছে লালু। সেটা নাগরমল ভোলেনি। বলল –কিছু ক্যাশকড়ি দরকার থাকে বলুন না? আপনার সঙ্গে তো অনেক বিজনেস করেছি। এসব ছিনতাই কি ভালো লালুবাবু? আপনার নামে পাড়া কাঁপত এক সময়ে
তিনটে লাশ ফেলার জন্য ট্রিগারে হাত রেখেছিল শানু। কিন্তু বয়সকালে নানা চিন্তা ভাবনা এসে যায়। বেপরোয়া হওয়া যায় না কিছুতেই। তারা দুজনেই ঘরপোড়া গরু।
লালু হতাশ হয়ে বলল –কিছু ছাড়ো নাগরমল, ব্যাবসা করব।
–কত?
–দু-হাজার করে দুজন।
–নাগরমল ভাবতে লাগল।
–ভেবো না। সময় নেই। শানু বলল । নাগরমল শ্বাস ফেলে বলল –কাল দেব। বাড়িতে বসে পেয়ে যাবেন। আজকের ক্যাশ গোনা আছে।
–না দিলে কিন্তু—
নাগরমল হাসে-আপনার সঙ্গে বেইমানী? আমার প্রাণের ভয় নেই?
পরদিন নাগরমল নিজেই টাকাটা পৌঁছে দিল। বলল –কাল আমার ড্রাইভার, ক্লিনার আর কর্মচারীরা দেখেছে আপনাদের। তারাই বলেছে ওয়াগন ব্রেকারদের। খুব হইহই হচ্ছে ওদের মধ্যে। একটু দেখবেন দাদা–ওরা ভালো না। নীলুবাবু মরল, শানুবাবু পালাল; আমাকেও ব্যাবসা গুটোতে হবে।
লালু বুঝল। নাগরমল ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক হচ্ছে। আর যেন লালু হানা না দেয়।
লালু টাকা নিয়ে বলল –এটা ধার হিসেবে নিলাম নাগরমল। শোধ দেব ব্যাবসা করে।
নাগরমল মুখের একটা ভঙ্গি করে বলল –যা বোঝেন। আপনার সঙ্গে তো অনেক বিজনেস করেছি! আপনি ভালো লোক।
দু-হাজার নিয়ে শানু কাটল। বাকি দুই হাজারে দত্তদের গ্যারাজটা ভাড়া নিয়ে মনোহারি দোকান খুলল লালু। দোকানে তার লজেন্স, বিস্কুট, চানাচুর, বেলুন আর খেলনাই বেশি। পাড়ার বাচ্চারাই তার প্রধান খদ্দের।
লাভালাভের হিসেব রাখতে পারে না লালু। বেচে যায়। পাড়ার লোকে যাতায়াতের পথে লালুর দোকান দেখে থমকে দাঁড়ায় দোকান দিলে নাকি হে?
এক গাল হাসে লালু–দিলাম। আমাকে একটু দেখবেন, কাকা।
বেবি ফুড কোথাও পাই না, এনে দেবে নাকি। ব্ল্যাকের দামই না হয় দেব।
–দেখব।
লালু এইরকমভাবে ব্যাবসা শুরু করল। মাল বেশি রাখে না, কিন্তু দুষ্প্রাপ্য জিনিস ঠিক এনে দেয়। ব্ল্যাকের দাম নেয়। খুব আস্তে-আস্তে সে টাকাপয়সার হিসাব বুঝতে শুরু করল। এখন বাচ্চারা দশ পয়সার চানাচুর চাইলে ঠোঙা ভরতি করে দেয় না। ছোট মাপের ঠোঙা বের করে। ফাউ দেয় না। পয়সা গোনে। মাসের শেষে স্টক মেলায়। পাড়ার মধ্যে পান–সিগারেটের একটা মাত্র দোকান, তার মালিক মদনা, কিন্তু মদনার ব্যবহার ভালো না, একটা মাত্র দোকান বলে দোকানটা চলে ভালো। দেখেশুনে লালু সিগারেটের একটা কাউন্টার খুলল, মুদির দোকানের সওদা রাখল কিছু কিছু, অনেক কষ্টে বের করল বেবি ফুডের লাইসেন্স। ফলে দত্তদের গ্যারাজ ঘরে তার দোকানটা হুহু করে চলতে থাকে। মাসে শ–তিনেক টাকা আয়।
মিলু এখন ইস্কুলে যায়। বাবা রিটায়ার করে বসে আছেন। বাইরের দিকের বারান্দায় পাতা ইজিচেয়ারে বসে সারাদিন খবরের কাগজটা উলটেপালটে পড়েন। মায়ের চোখে ছানি আসছে।
তবু মা সারাদিন ঘরের কাজ নিয়ে ব্যস্ত। লালু মাঝে-মাঝে বলে,–মা, তোমাকে একজন রান্নার লোক দেখে দিই।
মা হাসে, বলে রান্নার জন্যে পাকা লোক চাই। স্বঘর, ভিন্ন গোত্রের একটা মেয়ে। এনে দে দেখি।
লালু বড় লজ্জা পায়। গলার বাঘনখটা মুখে পুরে ভাবে।
পাড়ার গিন্নিবান্নিরা আগে লালুর দোকানে আসত না। তারা সভয়ে বলত বাব্বাঃ, লালু গুন্ডার দোকান? ওখানে মেয়েমানুষ যায় কখনও? কিন্তু ধীরে-ধীরে তাদের মত পালটায়। এখন পাড়ার বউ–ঝিরা আসে, আসে প্রৌঢ়ারা। লালু সবাইকে দিদি, মা, মাসি বলে ডেকে খুব খাতির করে।
সবচেয়ে বেশি ঝামেলা চাটুজ্জে খুড়িকে নিয়ে। লালুকে তার আফিং এনে দিতে হয়। আফিং নিতে এসে চাটুজ্জে খুড়ি পাড়া জানান দিয়ে চেঁচামেচি শুরু করে বিয়ে করছিস না কেন? তোর বাপ-দাদা বিয়ে করেছে, সংসারসুদ্ধ লোক করছে, তুই করবি না কেন? ত্রিশ বছর বয়স হল না। তোর! এরপর কি পাকা চুলে টোপর পবি? বিয়ে না করলে বুড়ো বয়সে পাগলামিতে ধরে, জানিস না?
–বিয়ে করব খুড়িমা, সময় পাচ্ছি কোথায়? একটু স্থিতু হয়েনি।
–হ্যাঁ, ঢেউ সরে গেলে ডুব দিবি। বয়সকালটা মামদোবাজিতে কাটালি, এখন বুদ্ধিশুদ্ধি একটু হয়েছে–এইবারে কোথায় পাকাঁপাকি বন্দোবস্ত করে বসবি তা নয়, কেবল উড়বার মতলব। বউ না থাকলে মামদোদের খপ্পরে পড়বি কবে।
ভারী বিব্রত হয়ে সে তাড়াতাড়ি বলে–করব শিগগিরই করে ফেলব বিয়ে। আর ক’টা বছর –মিলুটার একটা বিয়ে দিয়েনি–
–ও মা, ও তো গুয়ের গ্যাংলা মেয়ে–ওর বিয়ে হতে-হতে তোর বয়স বসে থাকবে? পুলিপিঠের ন্যাজ বেরুবার আশায় বসে থাক। তবে–
কিন্তু সময় বাস্তবিক বসে থাকে না। মিলু স্কুল ডিঙিয়ে কলেজে ঢুকল, দেখতে-না-দেখতে ধাঁ করে বড় হয়ে গেল। চোখে চশমা, শাড়ি পরা মিলু দোকানের সামনে দিয়ে কলেজে যায়। বিক্রিবাটার ব্যস্ততার মধ্যেও চোখ তুলে লালু এক-এক সময়ে দেখে মিলুকে। লালুর বোনটা ফরসা আর ছিপছিপে হয়েছে। চেহারায় অমিল, কিন্তু বড় ভাব দুজনে। দাদার ওই বিশাল শরীরটা যে খাটাখাটনিতে রোগা হয়ে যাচ্ছে তা একমাত্র মিলুই লক্ষ্য করে। গম্ভীর মুখে শাসন করে দাদাকে।
লালু ভাবে–এইবার মিলুর একটা বিয়ে দিতে হবে।
