লালু সেই টর্চের আলোর দিকে চেয়ে বলল –কিন্তু নীলু যে বলেছিল।
–নীলুও যাবে। তুমি পুরোনো লোক, দলটা তোমার হাতেই তৈরি–আমরা জানি। তাই তোমাকে জান–এ মারলাম না। পুরোনোলোক আমরা পছন্দ করি না। কেটে পড়ো।
লালু তার অন্ধকার মাথা দিয়েও ব্যাপারটা বুঝল। উঠে দাঁড়িয়ে বলল –কিন্তু আমার হিস্যা?
–যে গমের বস্তাটা নামিয়েছ ওটা নিয়ে যাও। বস্তাটা অবশ্য নিল না লালু। কিন্তু ফিরে গেল। আস্তে-আস্তে ইয়ার্ড পার হল, টপকাল রেলের লোহার বেড়া। অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে ফিরে এল বাড়িতে।
পরদিন আবার শিশুর মতো মুখ নিয়ে ঘুম থেকে উঠল সে। খেলতে শুরু করল ছোট বোনের সঙ্গে।
দিনসাতেক বাদে খবর পেল, রেলে কাটা পড়ে নীলু মারা গেছে। শুনে একটু শিউরে উঠল সে। ছোট বোন মিলু পাড়ার রাজ্যের ছেলেমেয়ে জুটিয়ে আনে, তাদের নিয়ে সারাদিন খেলে লালু। নীলু মারা যাওয়ার খবর পেয়ে সে সেইদিন তাদের নিয়ে বাড়ির উঠোনের করবী গাছের নীচে বনভোজন করল। বাচ্চাদের হুল্লোড়ে ডুবে রইল সারাদিন।
কিন্তু এভাবে চলে না।
দত্তদের গাড়িটা গতবছর বেচে দিয়েছে। গ্যারাজটা খালি পড়ে আছে। লালুর খুব ইচ্ছে ওখানে একটা দোকান দেয়। মনোহারি দোকান। সামান্য কিছু থোক টাকা হলে চলে যায়।
সে বাবার কাছে টাকাটা চাইল প্রথমে। বাবা অবাক হয়ে বললেন–আমার প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা ভাঙব? তোমার কি মাথা খারাপ! বুড়ো বয়সে আমাদের খাওয়াবে কে? তার ওপর তোমার বোনের বিয়ের জন্যও কিছু রাখতে হবে। কেরানির প্রভিডেন্ট ফান্ড তো বাপু রিজার্ভ ব্যাঙ্ক নয়। সামান্য দশ-পনেরো হাজার টাকা–
লালু বুঝল। বাবাকে সে এখনও ভালোবাসে। যাদের সে ভালোবাসে তাদের বিপন্ন মুখ দেখতে তার ভালো লাগে না।
একদিন সন্ধে পেরিয়ে শানু এসে হাজির। চুপিচুপি ডেকে নিয়ে বলল –লালুদা, কী করি বলো তো?
–কেন, কী হয়েছে?
–শোনোনি নীলু সাফ হয়েছে।
–শুনেছি।
–নতুন ছেলেরা আমাদের আর চাইছে না। নীলুকে রড মেরে লাইনে ফেলে রেখে সরেছে। আমি পালিয়ে আছি।
লালু একটু ভাবল। বলল –শানু, আয় তোতে আমাতে একটা মনোহারি দোকান দিই।
শানু হাসল তিন পয়সায় মাল কিনে পাঁচ পয়সায় বেচে দু-পয়সা লাভ? দূর, ওসব কি আমাদের পোষায়! অন্য কিছু বললো।
লালু কী বলবে ভেবে পেল না। কিন্তু সে দেখতে পাচ্ছিল, শানুর মাথার চুলে পাক ধরেছে, জুলপি বেশ সাদা। যখন দাঁড়ায় তখন একটু কুঁজো দেখায় ওকে। শানুর বয়স বেশি, লালুর চেয়ে অনেক বড়, লালু ওস্তাদ ছিল বলে তাকে দাদা বলে ডাকে।
লালু মাথা নেড়ে বলল –লাইন আমার নয়। কিছু টাকা পেলে আমি দোকান দেব।
শানু বলে–টাকা পাচ্ছ কোথায়?
এই প্রশ্নটার উত্তর সহজে দিতে পারে না লালু। ভাবে।
শানু বলে–তুমি এখনও ওস্তাদ আছ। চলো, কিছু ক্যাপিটাল জোগাড় করি। পেলে আমিও ব্যাবসাতে নামব, অর্ডার সাপ্লাইয়ের।
বলতে-বলতে শানু তার কোমর থেকে একটা রিভলভার বার করে দেখিয়ে একটু চোখ টিপল।
রিভলভার বিস্তর দেখেছে লালু, নেড়েছেও অনেক। তবু এখন দেখে তার বুক কেঁপে উঠল। বলল –রেখে দে। মিলুটা দেখলে ভয় পাবে।
চোখের পলকে যন্ত্রটা লুকিয়ে শানু বলল –একটা কি দুটো কে করব তার বেশি না। বিশ্বাস কর, ক্যাপিটাল হলেই কেটে পড়ব।
একটা শ্বাস ফেলে লালু বলল –তাই চল তবে।
.
নাগরমল ওয়াগান ভাঙিয়েদের পুরোনো খদ্দের। তার গদিতে রাতবিরেতে মাল পৌঁছোয়। সকাল হতে–না-হতে বড় বাজারে তার পাইকারি আড়তে চলে আসে মাল। নগদ কারবার। স্টেশনের কাছাকাছি তাই তার একটা গদি আছে। সারাদিন ফাঁকা গদিতে একটা বাচ্চা ছেলে বসে মাছি তাড়ায়। ব্যাবসা শুরু হয় রাতে। অনেক রাত পর্যন্ত গদিতে আলো জ্বলে, ভিতরে নাড়াচড়া করে লোকজন। বাইরে অন্ধকারে বাতি নিবিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে দু-তিনটে লরি। ওয়াগন ভাঙিয়েদের দলে আছে বলে নাগরমলের তেমন ভয়ডর নেই। বাঁধা রেট-এর ব্যাবসা, টাকাপয়সা নিয়েও বড় একটা গোলমাল হয় না। আটটা–সাড়ে আটটা নাগাদ গদিতে ক্যাশ পৌঁছে যায়। ক্যাশের জন্য দারোয়ানও থাকে না। এগারোটা–বারোটার মধ্যে টাকা হাত বদল হয়ে যায়।
লালু আর শানু এক রাত্রে হানা দিল গদিতে। শানুর হাতে রিভলভার, লালুর হাতে রড। দুজনেই মুখে কালি মেখেছে, রুমালে বেঁধেছে মুখ। এতকাল পরে এইসব হুজ্জত করতে লালুর খুব ভয় করছিল বলে একটা দিশি মদের পাঁইট ভেঙে খেয়েছে দুজন।
নাগরমল একদম তৈরি ছিল না। লরির ড্রাইভাররা এ সময়টা কাছে পিঠে থাকে না, লরি ভিড়িয়ে মাল টানতে খাল ধারে যায়। গদিতে নাগরমল নিজে আর দুজন নিরীহ কর্মচারী।
এসময়ে ঝাঁপ ঠেলে দুজন ঢুকল। নাগরমল দৃশ্য দেখে হাঁ করে রইল।
রিভলভারটা নেড়ে শানু ক্যাশবাক্সটা দেখাল শুধু মুখে কিছু বলল না। নাগরমল হাঁ করে বাতাস গিলে ফেলল। তারপর লালুর বুকের সোনার চেনে বাঁধা বাঘনখটা দেখল সে। লালুর বিশাল চেহারাটার সঙ্গে বাঘনখটা মিলিয়ে দেখতেই কয়েক বছর আগেকার লালুকে মনে পড়ে গেল তার। বলল –আরে রাম-রাম লালুবাবু, কী খবর? এসব কী হচ্ছে? যাত্রাপার্টি নাকি।
লালুর বুকটা বড় চমকে ওঠে। চিনে ফেলেছে নাগরমল। এখন আর উপায় কী? হয় এখন তিনটে লাশ ফেলে যেতে হয় নইলে নাগরমলের সঙ্গে একটা বন্দোবস্ত আসা যায়।
